রবিবার, ১১ অক্টোবর, ২০২৬,
রোহিঙ্গা সংকট কূটনীতি

রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন জোরদারে নানামুখী কূটনৈতিক উদ্যোগের ঘোষণা

জাতীয় ডেস্ক

অক্টোবর ১১, ২০২৬, ০৮:০০ পিএম

রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন জোরদারে নানামুখী কূটনৈতিক উদ্যোগের ঘোষণা

বলপূর্বক বাস্তুচ্যুত মিয়ানমারের নাগরিকদের নিজ দেশে নিরাপদ, স্বেচ্ছায়, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করতে আঞ্চলিক এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সমন্বিত কূটনৈতিক প্রচেষ্টা আরও জোরদার করছে সরকার। রোববার (১১ অক্টোবর) রাজধানীর হোটেল রেডিসন ব্লু ওয়াটার গার্ডেনের অন্তরা হলে আয়োজিত এক জাতীয় সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ এ কথা জানান।

এফএসডিএসের চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল ফজলে এলাহী আকবর (অব.)-এর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই সেমিনারে বিশেষ অতিথি ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়বিষয়ক উপদেষ্টা মো. ইসমাইল জবিউল্লাহ।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, বাস্তুচ্যুত মিয়ানমারের নাগরিকদের টেকসই প্রত্যাবাসনের জন্য কেবল বাংলাদেশের একক উদ্যোগ যথেষ্ট নয়। চীন, আসিয়ান জোট, জাতিসংঘ, জাপানসহ সংশ্লিষ্ট সব অংশীজনকে সঙ্গে নিয়ে একটি সুদৃঢ় কৌশলগত আঞ্চলিক সমন্বয় গড়ে তোলা জরুরি।

জাপানের সঙ্গে চলমান আলোচনার তথ্য তুলে ধরে তিনি জানান, সম্প্রতি জাপান সরকারের মিয়ানমারবিষয়ক জাতীয় পুনর্মিলন সংক্রান্ত বিশেষ দূত ও নিপ্পন ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান সাসাকাওয়া বাংলাদেশ সফর করেছেন। সফরকালে প্রধানমন্ত্রী ও তিনি নিজে তাঁর সঙ্গে এই সংকট নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন এবং টোকিও থেকে সর্বাত্মক সহযোগিতার আশ্বাস পাওয়া গেছে। এ মাসের শেষের দিকে প্রধানমন্ত্রীর জাপান সফরে প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করার বিষয়ে আরও অগ্রগতি হবে।

রাখাইন রাজ্যের অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা ও পরিবর্তিত পরিস্থিতির কথা তুলে ধরে মন্ত্রী বলেন, সেখানে আইনি সরকারের পাশাপাশি একটি বড় অংশের সরাসরি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে আরাকান আর্মি। এই বাস্তবতায় আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়ার পাশাপাশি অনানুষ্ঠানিক যোগাযোগসহ নানা কূটনৈতিক মাধ্যম ব্যবহার করে সমাধানের পথ খোঁজা হচ্ছে। তবে শান্তিপূর্ণ প্রত্যাবাসনই মূল লক্ষ্য এবং চূড়ান্ত বিকল্প হিসেবে সব পথ উন্মুক্ত রেখেই বাংলাদেশ আলোচনা চালিয়ে যাবে।

সেমিনারে প্রধানমন্ত্রীর জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়বিষয়ক উপদেষ্টা মো. ইসমাইল জবিউল্লাহ বলেন, এই সংকট কেবল একটি দ্বিপক্ষীয় বা মানবিক সমস্যা নয়; বরং এটি আমাদের জাতীয় স্বার্থ, আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা এবং বৈশ্বিক ভূরাজনীতির সাথে সরাসরি যুক্ত। গত কয়েক দশকের সংকট মোকাবিলার অভিজ্ঞতা পর্যালোচনা করে এখন ত্রাণ সহায়তাকেন্দ্রীক অবস্থান থেকে সরে এসে দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত কূটনীতির দিকে নজর দিতে হবে। আন্তর্জাতিক মহল ও মিয়ানমারের ওপর কার্যকর চাপ অব্যাহত রেখে নিজ ভূমিতে তাদের প্রত্যাবর্তন নিশ্চিত করাই এখন মূল অগ্রাধিকার।

সেমিনার শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতি হিসেবে চলতি বছর বাংলাদেশের প্রতিনিধি নির্বাচিত হওয়ায় বৈশ্বিক দরবারে বিষয়টি জোরালোভাবে তুলে ধরার নতুন ক্ষেত্র তৈরি হয়েছে। চীন, জাপান, ভারত, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোর সাথে আলোচনার মাধ্যমে দ্রুত একটি সম্মানজনক প্রত্যাবাসনের পথ বের করা সম্ভব হবে।

সেমিনারে বিষয়ভিত্তিক তিনটি গুরুত্বপূর্ণ প্রবন্ধ উপস্থাপন করা হয়। অধ্যাপক ড. এ. এস. এম. আলী আশরাফ মিয়ানমার ও রাখাইনের পরিবর্তিত ভূরাজনৈতিক ও নিরাপত্তাজনিত প্রেক্ষাপট তুলে ধরেন। অধ্যাপক শাহাব এনাম খান রাখাইনের উন্নয়ন, আঞ্চলিক সংযোগ ও প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ার নানা দিক বিশ্লেষণ করেন। তৃতীয় প্রবন্ধে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল শাফায়াত আহমদ, পিএইচডি (অব.) আঞ্চলিক কূটনীতি ও বাংলাদেশের কৌশলগত করণীয় নিয়ে আলোকপাত করেন।

আলোচকরা একমত পোষণ করেন যে প্রত্যাবাসন কেবল কয়েকজন মানুষের শারীরিক স্থানান্তর নয়; বরং তাদের নিরাপত্তা, নাগরিক অধিকার, বাসস্থান, জীবিকা এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর গ্রহণযোগ্যতা তৈরি করাই টেকসই সমাধানের মূল চাবিকাঠি।

সেমিনারে বিভিন্ন দেশের কূটনীতিক, আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিনিধি, সাবেক সামরিক কর্মকর্তা, গবেষক ও বিভিন্ন গণমাধ্যমের প্রতিনিধিরা অংশ নেন।