অক্টোবর ১১, ২০২৬, ০৮:৩৯ পিএম
টানা ২৬৪ ঘণ্টারও বেশি সময়, অর্থাৎ পুরো ১১ দিন না ঘুমিয়ে বিশ্ব রেকর্ড গড়েছিলেন র্যান্ডি গার্ডনার। ঘটনাটি ঘটেছিল ১৯৬৩ সালে। তৎকালীন ১৭ বছর বয়সী ওই মার্কিন কিশোরের ঝুঁকিপূর্ণ এই পরীক্ষার ভয়াবহ শারীরিক ও মানসিক প্রভাব কেবল সেই কয়েক দিনেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, বরং বহু বছর ধরে তাকে চরম ভোগান্তিতে ফেলেছিল। দীর্ঘ সময় টানা জেগে থাকার সেই খেসারত হিসেবে পরবর্তী জীবনে তিনি মারাত্মক ক্রনিক অনিদ্রা বা ইনসোমনিয়ার শিকার হন।
স্কুলের বিজ্ঞান মেলার একটি প্রকল্পকে কেন্দ্র করে শুরু হয়েছিল এই বিপজ্জনক পরীক্ষা। গার্ডনার এবং তার সহপাঠী ব্রুস ম্যাকঅ্যালিস্টার নিশ্চিত হতে চেয়েছিলেন, মানুষ একটানা না ঘুমালে তার শরীরে ও মস্তিষ্কে ঠিক কী ধরনের প্রভাব পড়ে। দুজনের মধ্যে কে নিজে এই পরীক্ষায় অংশ নেবেন, তা নির্ধারণ করা হয়েছিল মুদ্রা ছুড়ে টসের মাধ্যমে। ভাগ্যের ফেরে গার্ডনারকেই বেছে নেওয়া হয়।
পরবর্তীকালে ব্রিটিশ গণমাধ্যম বিবিসির কাছে স্মৃতিচারণ করে ম্যাকঅ্যালিস্টার উল্লেখ করেন, সেই বয়সে তারা চরম নির্বুদ্ধিতার পরিচয় দিয়েছিলেন। বন্ধুকে সতর্ক ও সজাগ রাখতে ম্যাকঅ্যালিস্টার নিজেও যথাসম্ভব রাত জেগে পর্যবেক্ষণ চালাতেন। তিনি জানান, নিজে টানা তিন রাত না ঘুমানোর পর একবার ঘুম ভেঙে দেখেন তিনি দেয়ালে হেলান দিয়ে আছেন এবং অবচেতনভাবেই দেয়ালে নোট লিখে চলেছেন।
পরবর্তীতে এই ব্যতিক্রমী পরীক্ষাটি নিবিড় পর্যবেক্ষণে নেন স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশিষ্ট ঘুমবিষয়ক গবেষক ড. উইলিয়াম ডিমেন্ট এবং মার্কিন নৌবাহিনীর চিকিৎসক লেফটেন্যান্ট কমান্ডার জন জে রস।
আন্তর্জাতিক বিজ্ঞানবিষয়ক গবেষণা পর্যালোচনায় জানা যায়, পরীক্ষা শুরুর মাত্র দুই দিন পর থেকেই গার্ডনারের শারীরিক আচরণে স্পষ্ট বিকৃতি দেখা দেয়। কথা বলার সময় তার জিভ জড়িয়ে যেতে থাকে এবং স্বাভাবিক বাক্য উচ্চারণ কঠিন হয়ে পড়ে। জটিল কোনো শব্দগুচ্ছ বারবার আওড়াতে বললে তিনি পুরোপুরি হোঁচট খাচ্ছিলেন।
টানা তিন দিন পার হওয়ার পর গার্ডনারের মেজাজ মাত্রাতিরিক্ত খিটখিটে হয়ে ওঠে। তার মনোযোগ ধরে রাখার ক্ষমতা নষ্ট হয়ে যায় এবং স্বল্পমেয়াদি স্মৃতিশক্তি প্রায় শূন্যের কোঠায় নেমে আসে। সেই সঙ্গে তীব্র সন্দেহপ্রবণতা এবং বাস্তবতাহীন হ্যালুসিনেশনের মতো ভয়াবহ মনস্তাত্ত্বিক উপসর্গ দেখা দেয়।
গবেষক ড. ডিমেন্ট জানান, শারীরিকভাবে তরুণ গার্ডনার যথেষ্ট সুস্থ ছিলেন বলেই তাকে জাগিয়ে রাখতে বাস্কেটবল বা বোলিংয়ের মতো শরীরচর্চামূলক খেলায় মাতিয়ে রাখা হতো। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে চোখের পাতা এক করলেই তিনি গভীর ঘুমে তলিয়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে পড়তেন।
শেষ পর্যন্ত ২৬৪ দশমিক ৪ ঘণ্টা নির্ঘুম কাটিয়ে গার্ডনার তার পরীক্ষা শেষ করেন। এরপর তিনি টানা ১৪ ঘণ্টা গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন থাকেন এবং স্বাভাবিকভাবে জেগে ওঠেন। তাৎক্ষণিকভাবে জেগে ওঠার পর তিনি খুব বেশি ঝিমুনি অনুভব করেননি।
কিন্তু এই আপাত স্বাভাবিকতা দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। কয়েক দশক পার হওয়ার পর প্রৌঢ় বয়সে তিনি ভয়াবহ অনিদ্রায় আক্রান্ত হন, যার কোনো সহজ চিকিৎসা মেলেনি। গার্ডনার নিজেই প্রকাশ করেছিলেন যে তার জীবনের এই দুরবস্থা কিশোর বয়সে করা সেই কাণ্ডজ্ঞানহীন পরীক্ষারই সরাসরি ফল।
নিজের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে গার্ডনার আক্ষেপ করে বলেছিলেন, পরবর্তী জীবনে তার আশপাশে সাধারণ মানুষের টিকে থাকাই কঠিন হয়ে পড়েছিল। তিনি সব কিছুতেই মেজাজ হারিয়ে ফেলতেন এবং মনে হতো ৫০ বছর আগের সেই দুঃস্বপ্নের ধারাবাহিকতাই তিনি বয়ে বেড়াচ্ছেন।
চিকিৎসাবিজ্ঞান স্পষ্টভাবেই যেকোনো সুস্থ মানুষকে টানা দীর্ঘ সময় ঘুম থেকে বিরত থাকার মতো বিপজ্জনক কর্মকাণ্ড থেকে সম্পূর্ণ দূরে থাকার কঠোর নির্দেশ দেয়।
চিকিৎসকদের মতে, অনিদ্রার জটিলতা এড়াতে প্রতিদিন একটি নির্দিষ্ট সময় মেনে ঘুমাতে যাওয়া ও ঘুম থেকে ওঠার অভ্যাস গড়ে তোলা প্রয়োজন। এছাড়া রাতে ঘুমানোর অন্তত এক ঘণ্টা আগে আরামদায়ক পরিবেশ তৈরি করা, বই পড়া, কুসুম গরম পানিতে গোসল করা এবং দিনের বেলায় নিয়মমাফিক শারীরিক ব্যায়াম করা নিয়মিত ঘুমের জন্য সহায়ক।

দিনাজপুর টিভির সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন