অক্টোবর ১১, ২০২৬, ০৯:২১ পিএম
বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের শুরুর দিকের অগ্রণী অভিনয়শিল্পী নাসিমা খান আর নেই। রোববার (১১ অক্টোবর) সন্ধ্যা সাড়ে সাতটার দিকে রাজধানীর উত্তরার একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৮২ বছর। তার মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেছেন বাংলাদেশ চলচ্চিত্র শিল্পী সমিতির সাংগঠনিক সম্পাদক ও অভিনেতা সনি রহমান।
বাংলা ও উর্দু উভয় ভাষার চলচ্চিত্রে দাপুটে অভিনয়ের মাধ্যমে ষাটের দশকে রুপালি পর্দায় ব্যাপক পরিচিতি পেয়েছিলেন নাসিমা খান। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের চলচ্চিত্র যখন সবেমাত্র প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পাচ্ছিল, তখন যে কজন অভিনয়শিল্পী নিজেদের মেধার স্বাক্ষর রেখে পরবর্তী প্রজন্মের জন্য পথ তৈরি করেছিলেন, তিনি ছিলেন তাদের পুরোভাগে।
নাসিমা খানের জন্ম ১৯৪৪ সালের ৬ আগস্ট পুরান ঢাকার লালবাগে। তার পৈতৃক নিবাস মুন্সীগঞ্জের শ্রীনগর উপজেলার রাড়িখাল গ্রামের ঐতিহ্যবাহী উকিলবাড়ি। তার বাবা মোহাম্মদ মাসুদ খান। আর দাদা খান বাহাদুর আবদুল জলিল ব্রিটিশ ভারতের ঢাকার ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। বিশ শতকের চল্লিশের দশকে তার পরিবার লালবাগে স্থায়ী আবাস গড়ে তোলে।
চলচ্চিত্রের জগতে তার আগমনের পেছনে প্রত্যক্ষ অবদান ছিল প্রখ্যাত সংগীতজ্ঞ ও অভিনেতা আনিসের, যিনি সাংস্কৃতিক অঙ্গনে খান আতা হিসেবে সমধিক পরিচিত। তৎকালীন ঢাকার রুপালি পর্দায় সুলতানা জামান, রওশন আরা, সুমিতা দেবী ও চিত্রা সিনহার মতো অভিনেত্রীরা যখন দর্শক মাতাচ্ছিলেন, তখন তাদের পাশাপাশি নতুন প্রতিভার অন্বেষণ চলছিল। নাসিমাদের বাড়ির কাছাকাছি বাস করতেন খান আতা। পারিবারিক সুসম্পর্কের সূত্রে তিনিই নাসিমা খানের বাবাকে তাঁর মেয়েকে চলচ্চিত্রে অভিনয়ের অনুমতি দেওয়ার পরামর্শ দেন। বাবার সবুজ সংকেত পাওয়ার পরই ক্যামেরার সামনে দাঁড়ান নাসিমা।
১৯৫৯ সালে এ জে কারদার পরিচালিত আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন ধ্রুপদী চলচ্চিত্র ‘জাগো হুয়া সাভেরা’র মাধ্যমে রূপালি পর্দায় অভিষেক হয় তার। তৎকালীন ঢাকার দ্বিতীয় সবাক চলচ্চিত্র হিসেবে স্বীকৃত এই চলচ্চিত্রে সহনায়িকার চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন নাসিমা খান। ছবিটি বৈশ্বিক অঙ্গনে পুরস্কৃত হয়ে ঐতিহাসিক মর্যাদা পায়।
একই বছর বেবী ইসলাম পরিচালিত উর্দু সিনেমা ‘তানহা’য় অভিনয় করেন তিনি। এতে তার সহশিল্পী হিসেবে ছিলেন শবনম, সুমিতা দেবী ও লাহোরের বিশিষ্ট অভিনেত্রী শামীম আরা।
পরবর্তীতে ১৯৬১ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘যে নদী মরু পথে’ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে পূর্ণাঙ্গ নায়িকা হিসেবে আত্মপ্রকাশ ঘটে নাসিমা খানের। এই চলচ্চিত্রে তার বিপরীতে নায়ক চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন আনিস। ছবিটি মুক্তির পর দর্শকমহলে ব্যাপক সমাদৃত হন তিনি।
তার দীর্ঘ অভিনয়জীবনে বহু কালজয়ী চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছেন। নাসিমা খানের উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্রের তালিকায় রয়েছে ‘সূর্যস্নান’, ‘ধারাপাত’, ‘কার বউ’, ‘উজালা’, ‘বেগানা’, ‘আপন দুলাল’, ‘উলঝন’, ‘ম্যায় ভি ইনসান হু’, ‘দুই ভাই’, ‘গৌরী’, ‘আমার বৌ’ এবং ‘ঢেউয়ের পরে ঢেউ’।
কর্মজীবনে তিনি আনোয়ার হোসেন, সৈয়দ হাসান ইমাম, আবদুর রহমান, মুস্তফা, আজিম ও হারুনের মতো ঢাকার চলচ্চিত্রের দিকপাল অভিনেতাদের সঙ্গে জুটি বেঁধে কাজ করেছেন। এ ছাড়া ‘আসবন গ্যায়ে মতি’ চলচ্চিত্রে অভিনয় করেও বিপুল প্রশংসা ও খ্যাতি অর্জন করেছিলেন তিনি।
চলচ্চিত্রের বর্ণাঢ্য অধ্যায় পেরিয়ে জীবনের পরবর্তী পর্যায়ে তাকে টেলিভিশনের নাট্যমাধ্যমেও নিয়মিত কাজ করতে দেখা গেছে। দীর্ঘ পরিক্রমায় অভিনয়ের মাধ্যম পরিবর্তিত হলেও অভিনয়শিল্পের সাথে তার আত্মিক যোগাযোগ কখনো বিচ্ছিন্ন হয়নি। প্রবীণ এই গুণী অভিনেত্রীর প্রয়াণে দেশের চলচ্চিত্রের আদি ইতিহাসের এক গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটল।

দিনাজপুর টিভির সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন