অক্টোবর ১১, ২০২৬, ০৮:৫৪ পিএম
মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক সংঘাতের জেরে জীবনযাত্রার ব্যয় অস্বাভাবিক হারে বেড়ে যাওয়ায় অর্থনীতি নিয়ে চরম হতাশায় ভুগছেন যুক্তরাষ্ট্রের সাধারণ নাগরিকরা। ফলে অক্টোবরের শুরুর দিকে মার্কিন ভোক্তাদের সামগ্রিক আস্থার সূচক টানা কমে সর্বকালের সর্বনিম্ন রেকর্ডের কাছাকাছি নেমে এসেছে। আগামী ৩ নভেম্বরের গুরুত্বপূর্ণ মধ্যবর্তী নির্বাচনের ঠিক আগে এই অর্থনৈতিক অচলাবস্থা প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জন্য বড় ধরনের রাজনৈতিক অস্বস্তি তৈরি করেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের মিশিগান বিশ্ববিদ্যালয়ের সাম্প্রতিক ভোক্তা জরিপে এই উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে। উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং ব্যাংক ঋণের চড়া সুদের কারণে মার্কিন পরিবারগুলোর ভেতর অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে তীব্র অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে।
জরিপ অনুযায়ী, অর্থনৈতিক সংকট ও লাগামহীন ব্যয়ের কারণে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা তার পুরো রাজনৈতিক জীবনের সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে। এই পরিস্থিতিতে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া আগামী মাসের মধ্যবর্তী নির্বাচনেই নির্ধারিত হবে মার্কিন কংগ্রেসের আইনসভার নিয়ন্ত্রণ শেষ পর্যন্ত কার হাতে থাকবে।
ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক সংঘাত বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম বাড়িয়ে দিয়েছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়েছে মার্কিন অভ্যন্তরীণ বাজারে। এই মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আনতে গত সেপ্টেম্বরে তিন বছরের মধ্যে প্রথমবারের মতো নীতিগত সুদের হার বাড়িয়েছে দেশটির কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভ।
মিশিগান বিশ্ববিদ্যালয়ের পর্যালোচনায় দেখা গেছে, চলতি মাসে স্বল্প আয়ের ভোক্তা এবং সাধারণ বিনিয়োগকারীদের আস্থার সূচকে ব্যাপক পতন ঘটেছে। কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের সাথে যুক্ত নন এমন স্বতন্ত্র ভোটারদের মধ্যেও আস্থার ঘাটতি দেখা দিয়েছে। দলীয় সমর্থকদের মধ্যে কিছুটা ভিন্নতা থাকলেও সামগ্রিক জাতীয় আস্থা এ বছরের শুরুর তুলনায় অনেক নিচে অবস্থান করছে।
প্ল্যান্ট মোরান ফিন্যান্সিয়াল অ্যাডভাইজারসের প্রধান বিনিয়োগ কর্মকর্তা জিম বেয়ার্ড জানিয়েছেন, রাজনৈতিক মতাদর্শ নির্বিশেষে সব শ্রেণির সাধারণ মানুষ লাগামহীন দ্রব্যমূল্য ও স্থবির আর্থিক অবস্থার কারণে হতাশ। মোট দেশজ উৎপাদনের তথ্যে বিষয়টি তাৎক্ষণিকভাবে পুরোপুরি স্পষ্ট না হলেও নির্বাচনের সময় ব্যালট বাক্সে এই অসন্তোষের জোরালো প্রতিফলন দেখা যেতে পারে।
মিশিগান বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকাশিত ভোক্তা আস্থার সূচক সেপ্টেম্বর মাসের ৪৮ দশমিক ১ পয়েন্ট থেকে কমে অক্টোবরে ৪৬ দশমিক ৩ পয়েন্টে দাঁড়িয়েছে। এটি টানা তৃতীয় মাসের মতো পতনের ঘটনা। ফলে ভোক্তাদের মনোভাব আবারও মে মাসের সর্বকালের সর্বনিম্ন রেকর্ডের দ্বারপ্রান্তে চলে গেছে, যদিও আন্তর্জাতিক অর্থনীতিবিদরা সূচকটি অন্তত ৪৭ দশমিক ৮ পয়েন্টে থাকবে বলে ধারণা করেছিলেন।
বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতি পরিমাপক সূচকটিও সেপ্টেম্বরের ৫০ দশমিক ৯ পয়েন্ট থেকে নেমে সর্বকালের সর্বনিম্ন ৪৪ দশমিক ৭ পয়েন্টে ঠেকেছে। ঋণের চড়া সুদ ও উচ্চমূল্যের কারণে সাধারণ মানুষের গাড়ি বা বড় গৃহস্থালি সরঞ্জাম কেনার সক্ষমতা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
শেয়ারবাজারের চাঙ্গাভাব উচ্চ আয়ের পরিবারগুলোকে কিছুটা সুবিধাজনক অবস্থানে রাখলেও মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্তদের পারিবারিক বাজেটে টানাপোড়েন চরম আকার ধারণ করেছে।
জরিপের পৃথক বিশ্লেষণে প্রকাশ পেয়েছে, অতিরিক্ত দাম বেড়ে যাওয়া পণ্যগুলোর পেছনে আগের মতো খরচ অব্যাহত রাখতে পারবেন এক-তৃতীয়াংশের কম ভোক্তা। অন্যদিকে ৫৪ শতাংশ মানুষ এসব পণ্যের কেনাকাটা কমিয়ে দিয়েছেন এবং প্রায় ১৬ শতাংশ ভোক্তা অতিরিক্ত দামের পণ্য কেনা পুরোপুরি বন্ধ করে দিয়েছেন।
আন্তর্জাতিক আর্থিক সেবা প্রতিষ্ঠান আইএনজির প্রধান আন্তর্জাতিক অর্থনীতিবিদ জেমস নাইটলি জানান, শেয়ারবাজার স্থিতিশীল থাকলে ভোক্তারা কিছুটা খরচ অব্যাহত রাখতে পারেন, যা হয়তো সংকট সামাল দিতে কিছুটা সময় দেবে। তবে বাজারে দরপতন শুরু হলে এই সামগ্রিক পরিস্থিতি আরও দ্রুত ভয়াবহ আকার নিতে পারে।
ভোক্তা জরিপ বলছে, আগামী এক বছরে মূল্যস্ফীতি ৪ দশমিক ৭ শতাংশে পৌঁছাতে পারে বলে সাধারণ মানুষ আশঙ্কা করছেন, যা সেপ্টেম্বর মাসে ছিল ৪ দশমিক ৬ শতাংশ। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে সংঘাত শুরুর আগে এই হার ছিল মাত্র ৩ দশমিক ৪ শতাংশ। অর্থাৎ কয়েক মাসের ব্যবধানে মূল্যস্ফীতির প্রত্যাশা ১ দশমিক ৩ শতাংশ বেড়েছে। একই সাথে আগামী পাঁচ বছরের দীর্ঘমেয়াদি মূল্যস্ফীতির প্রত্যাশাও ৩ দশমিক ৪ শতাংশ থেকে বেড়ে ৩ দশমিক ৫ শতাংশ হয়েছে।
ফেডারেল রিজার্ভ সেপ্টেম্বর মাসে নীতিসুদ ২৫ বেসিস পয়েন্ট বাড়িয়ে ৩ দশমিক ৭৫ থেকে ৪ দশমিক শূন্য শতাংশের মধ্যে নির্ধারণ করেছে। তিন বছরের মধ্যে এটিই ছিল সুদের হার বৃদ্ধির প্রথম ঘটনা। যদিও কর্মসংস্থান ও সাময়িক তথ্যের কারণে অক্টোবরে নতুন করে সুদের হার বৃদ্ধির সম্ভাবনা কমেছে, তবে আগামী ডিসেম্বরে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফের সুদের হার বাড়াতে পারে বলে সতর্ক করেছেন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা।

দিনাজপুর টিভির সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন