জুলাই ২২, ২০২৬, ১১:১৯ এএম
ইতিহাসের এক চিরন্তন ও নির্মম সত্য হলো, বিপ্লবের রক্তকে যেমন স্বর্ণাক্ষরে স্মরণে রাখা হয়, তেমনি পরবর্তী প্রতিশ্রুতিভঙ্গ বা আদর্শের বিচ্যুতিকেও ক্ষমা করা হয় না। ফরাসি বিপ্লবের উত্তাল দিনগুলোর পর ম্যাক্সিমিলিয়ান রোবসপিয়েরের রক্তক্ষয়ী ফ্রান্স থেকে শুরু করে আরব বসন্তের ভগ্নস্বপ্ন পর্যন্ত প্রতিটি বাঁক আমাদের একটি সত্য স্মরণ করিয়ে দেয়। রাজপথে বুক পেতে স্বৈরাচারী শাসন উৎখাত করা যতখানি কঠিন, উৎখাত-পরবর্তী শূন্যতায় সেই গণআকাঙ্ক্ষাকে ধারণ করে একটি টেকসই ও ন্যায়ভিত্তিক প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া তার চেয়েও বহুগুণ কঠিন।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের দুই বছর পূর্তির এই ঐতিহাসিক মুহূর্তে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশ আজ ঠিক তেমনি এক অগ্নিপরীক্ষার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছে।প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির হিসাব মেলাতে বসেছে পুরো জাতি।দুই বছর আগের দেড় হাজার তরুণের তাজা রক্ত ও অগণিত ছাত্র-জনতার অশ্রুর বিনিময়ে সংঘটিত ওই অভ্যুত্থানের লক্ষ্য নিছক ব্যক্তিবদল ছিল না। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের দাবিগুলো ছিল রাষ্ট্রকাঠামোর আমূল সংস্কার ও জবাবদিহি প্রতিষ্ঠার পক্ষে।
সম্প্রতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অনুষ্ঠিত দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক সম্মেলনেও সেই সত্যটি জোরালোভাবে উচ্চারিত হয়েছে। কিন্তু দুই বছর পর প্রশ্ন জাগে, সেই স্বপ্নযাত্রা কতদূর এগোল? অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে বাংলাদেশ কিছু দৃশ্যমান অর্জন দেখলেও, শহীদ পরিবারগুলোর বিচারপ্রক্রিয়ার শ্লথগতি এবং জুলাই সনদ বাস্তবায়ন নিয়ে নানামুখী কালক্ষেপণ রাজনৈতিক অঙ্গনকে উত্তপ্ত করে তুলছে।
ক্ষমতাসীন দল ও বিরোধী শিবিরের পরস্পরবিরোধী অবস্থান সংকটকে আরও ঘনীভূত করেছে। এনসিপি ও জামায়াতের পক্ষ থেকে জুলাই সনদ বাস্তবায়নে গড়িমসির অভিযোগ তোলা হয়েছে, অন্যদিকে সরকার পক্ষ বলছে তারা প্রতিটি প্রতিশ্রুতি রক্ষায় বদ্ধপরিকর। রাজনীতির এই টানাটানির মাঝে সাধারণ মানুষের মৌলিক অধিকার এবং দ্রব্যমূল্যের মতো বিষয়গুলো চাপা পড়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, শহীদদের রক্তের ঋণ শোধ করতে হলে শুধু আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং কাজের মাধ্যমে সুনির্দিষ্ট রোডম্যাপ দেখাতে হবে।
জুলাই গণঅভ্যুত্থান কোনো একক দল বা গোষ্ঠীর সম্পত্তি নয়, এটি সমগ্র জাতির যৌথ অর্জন। এই পবিত্র স্মৃতিকে ক্ষমতার দর-কষাকষির মুদ্রায় পরিণত করা হলে তা শহীদের রক্তের অবমাননা হবে। সমস্ত উত্তাপ সংসদের অভ্যন্তরে গঠনমূলক বিতর্কে রূপান্তর করা এবং সাধারণ মানুষের জীবনমানের উন্নয়ন ঘটানোই এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।

দিনাজপুর টিভির সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন