সোমবার, ২৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬,

প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে বৈঠক, স্বাক্ষর নিয়ে শর্ত এনসিপির

দিনাজপুর টিভি ডেস্ক

অক্টোবর ২২, ২০২৫, ০৭:০৩ পিএম

প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে বৈঠক, স্বাক্ষর নিয়ে শর্ত এনসিপির

ছবি - সংগৃহীত

জুলাই সনদের আইনি ভিত্তি ও বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া নিয়ে সুনির্দিষ্ট ‘নিশ্চয়তা’ পাওয়ার পরেই কেবল এই সনদে স্বাক্ষর করবে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে এক গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকের পর এনসিপির পক্ষ থেকে এই শর্তমূলক অবস্থানের কথা পুনর্ব্যক্ত করা হয়েছে। বুধবার, ২২ অক্টোবর, সন্ধ্যায় রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় এই বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। জুলাই বিপ্লবের মাধ্যমে বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার প্রতিষ্ঠার পেছনে যে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের মূল ভূমিকা ছিল, সেই আন্দোলন থেকেই এনসিপির জন্ম।

ফলে এই দলটির সনদ স্বাক্ষর থেকে বিরত থাকা নিয়ে যে রাজনৈতিক অচলাবস্থা ও বিতর্ক তৈরি হয়েছিল, তা নিরসনের লক্ষ্যেই প্রধান উপদেষ্টা এই সংলাপের উদ্যোগ নেন। এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম বৈঠকের পর সাংবাদিকদের কাছে তাদের এই সুস্পষ্ট অবস্থানের কথা তুলে ধরেন। তিনি স্পষ্ট জানান, সনদটি ঠিক কীভাবে এবং কোন আইনি কাঠামোর আওতায় বাস্তবায়ন করা হবে, সেই পথনকশা সম্পর্কে সরকার থেকে নিশ্চয়তা পেলেই তারা সনদে স্বাক্ষর করবেন, এর আগে নয়।

গত ১৭ অক্টোবর জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় এক অনাড়ম্বর অনুষ্ঠানে দেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে অন্তর্বর্তী সরকার ‘জুলাই সনদ’ স্বাক্ষর করে। বিএনপি, জামায়াতে ইসলামীসহ অধিকাংশ আমন্ত্রিত দল এই সনদে স্বাক্ষর করলেও এনসিপির অনুপস্থিতি রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। এনসিপির পক্ষ থেকে তখন থেকেই দাবি করা হচ্ছিল যে, এই সনদের কোনো সুস্পষ্ট আইনি ভিত্তি বা ‘জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশ’ জারির উল্লেখ নেই।

তাদের আশঙ্কা, একটি আইনি কাঠামো ছাড়া এই সনদ স্বাক্ষর করা হলে তা কেবল একটি রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি হিসেবেই থেকে যাবে এবং ভবিষ্যতে এটি বাস্তবায়ন নিয়ে আইনি জটিলতা তৈরি হতে পারে বা আদালতে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে। বিশেষ করে সংবিধান সংস্কার, গণভোট আয়োজন বা গণপরিষদ নির্বাচনের মতো মৌলিক বিষয়গুলো বাস্তবায়নের জন্য একটি দৃঢ় আইনি ভিত্তি অপরিহার্য বলে মনে করে দলটি।

এই ভিন্ন অবস্থানের কারণেই সনদ স্বাক্ষরের পর থেকে দলগুলোর মধ্যে যে মতভিন্নতা তৈরি হয়, তা নিরসনের জন্য প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস নিজেই রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে সরাসরি আলোচনার এই উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন।বুধবার বিকেল পাঁচটার কিছু পরে এনসিপি আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামের নেতৃত্বে চার সদস্যের একটি প্রতিনিধিদল রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় পৌঁছান। প্রতিনিধিদলে নাহিদ ইসলাম ছাড়াও ছিলেন দলের উত্তরাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক সারজিস আলম, জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক সামান্তা শারমিন এবং যুগ্ম আহ্বায়ক খালেদ সাইফুল্লাহ।

প্রায় এক ঘণ্টাব্যাপী এই বৈঠকে এনসিপির নেতারা তাদের আপত্তির জায়গাগুলো এবং সনদ বাস্তবায়নের বিষয়ে তাদের সুনির্দিষ্ট প্রস্তাবনাগুলো প্রধান উপদেষ্টার কাছে তুলে ধরেন। বৈঠকে এনসিপি নেতারা স্পষ্ট করেছেন যে, তারা জুলাই সনদের মূল চেতনার সঙ্গে সম্পূর্ণ একমত, কিন্তু এর বাস্তবায়ন পদ্ধতি নিয়েই তাদের মূল প্রশ্ন। তারা চান, গণভোট বা অন্য কোনো সাংবিধানিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে এই সনদকে এমন একটি আইনি সুরক্ষা দেওয়া হোক, যাতে পরবর্তী কোনো সরকার বা কোনো আইনি চ্যালেঞ্জ এই সংস্কার প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করতে না পারে।

প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস বুধবার একটি চরম কর্মব্যস্ত রাজনৈতিক সন্ধ্যা পার করছেন। এনসিপির সঙ্গে বৈঠকের পরপরই তার সঙ্গে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর একটি প্রতিনিধিদলের বৈঠকের সময় নির্ধারিত ছিল। এর আগে, গতকাল মঙ্গলবার সন্ধ্যায় তিনি বিএনপির একটি প্রতিনিধিদলের সঙ্গেও একই স্থানে বৈঠক করেন। বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের নেতৃত্বে সেই বৈঠকে বিএনপি অন্তর্বর্তী সরকারকে অবিলম্বে একটি নির্দলীয় ‘তত্ত্বাবধায়ক সরকারের’ পূর্ণাঙ্গ চরিত্র ধারণ করার আহ্বান জানিয়েছে এবং প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে থাকা

‘দলীয় লোকজনকে’ সরিয়ে দিয়ে নির্বাচনের জন্য শতভাগ নিরপেক্ষ পরিবেশ নিশ্চিত করার জোর দাবি জানিয়েছে। ফলে প্রধান উপদেষ্টাকে এখন একটি জটিল রাজনৈতিক সমীকরণ মেলাতে হচ্ছে। একদিকে বিএনপির মতো সনদে স্বাক্ষরকারী দলগুলো প্রশাসন ঢেলে সাজানো এবং নির্বাচনকালীন সরকারের ‘তত্ত্বাবধায়ক’ ভূমিকা পালনের জন্য চাপ সৃষ্টি করছে। অন্যদিকে, এনসিপির মতো শক্তি, যাদের হাত ধরে এই সরকারের সূচনা, তারাই সনদের আইনি ভিত্তি আগে নিশ্চিত করার পাল্টা শর্ত দিচ্ছে।

এই পরস্পরবিরোধী অবস্থানগুলোর মধ্যে সমন্বয় সাধন করে জুলাই সনদের বাস্তবায়ন এবং একটি অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের দিকে এগিয়ে যাওয়াই এখন ড. ইউনূসের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান চ্যালেঞ্জ। নাহিদ ইসলামের আজকের বক্তব্যের পর এটা স্পষ্ট যে, বল এখন সরকারের কোর্টে। এনসিপির স্বাক্ষর আদায় করতে হলে সনদ বাস্তবায়নের একটি সুনির্দিষ্ট ও বিশ্বাসযোগ্য ‘রোডম্যাপ’ প্রধান উপদেষ্টাকে উপস্থাপন করতে হবে।