সোমবার, ২৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬,

জুলাই সনদকে আইনি রূপ দিতে হবে আদেশে:প্রধান উপদেষ্টার

দিনাজপুর টিভি ডেস্ক

অক্টোবর ২২, ২০২৫, ০৮:১০ পিএম

জুলাই সনদকে আইনি রূপ দিতে হবে আদেশে:প্রধান উপদেষ্টার

ছবি - সংগৃহীত

আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন এবং ‘জুলাই সনদ’ বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে অন্তর্বর্তী সরকারের যে সংলাপ চলছে, তা নতুন মাত্রা পেয়েছে। জুলাই সনদে স্বাক্ষরকারী অন্যতম প্রধান দল বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী এই সনদের আইনি ভিত্তি নিশ্চিত করার জন্য সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব দিয়েছে। দলটি বলেছে, ‘প্রধান উপদেষ্টার আদেশের’ মাধ্যমে জুলাই সনদকে অবিলম্বে আইনি রূপ দিতে হবে এবং এই সনদের নির্বাচন-সংশ্লিষ্ট ধারাগুলো অবশ্যই জাতীয় নির্বাচনের আগেই পাস করতে হবে।

বুধবার সন্ধ্যায় রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে অনুষ্ঠিত এক রুদ্ধদ্বার বৈঠক শেষে প্রেস ব্রিফিংয়ে জামায়াতের নেতারা এই সুস্পষ্ট দাবি তুলে ধরেন। একই সঙ্গে, গণভোটের সময়সূচি নিয়ে জুলাই সনদে স্বাক্ষরকারী দল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-এর প্রস্তাবেরও কড়া সমালোচনা করেছে জামায়াত। এই ঘটনা জুলাই সনদ বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া নিয়ে প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যকার মতপার্থক্যকে প্রকাশ্যে নিয়ে এলো।

বুধবার সন্ধ্যায় জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির ও সাবেক সংসদ সদস্য ডা. সৈয়দ আব্দুল্লাহ মো. তাহেরের নেতৃত্বে চার সদস্যের একটি প্রতিনিধিদল প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে বৈঠকে অংশ নেয়। প্রতিনিধিদলে আরও ছিলেন দলের সেক্রেটারি জেনারেল ও সাবেক সংসদ সদস্য অধ্যাপক মিয়া গোলাম পরওয়ার, সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা এটিএম মাছুম এবং সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা রফিকুল ইসলাম খান। বৈঠক শেষে ডা. তাহের সাংবাদিকদের বলেন, জুলাই সনদের আইনি রূপ দেওয়া এখন সবচেয়ে জরুরি।

তারা প্রধান উপদেষ্টাকে জানিয়েছেন যে, এই সনদকে কেবল একটি রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি হিসেবে রাখলে চলবে না, বরং প্রধান উপদেষ্টার একটি বিশেষ আদেশের মাধ্যমে এটিকে একটি আইনগত ও সাংবিধানিক ভিত্তি দিতে হবে, যাতে এর বাস্তবায়ন কোনোভাবেই বাধাগ্রস্ত না হয়। জামায়াত মনে করে, সংবিধান সংস্কার বা গণপরিষদ নির্বাচনের মতো মৌলিক বিষয়গুলো বাস্তবায়নের জন্য এমন একটি আইনি সুরক্ষা অপরিহার্য।

এই বৈঠকের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকটি ছিল গণভোট নিয়ে জামায়াতের অবস্থান। ডা. তাহের বলেন, ‘জাতীয় নির্বাচনের দিন গণভোট চেয়ে জটিলতা তৈরি করছে বিএনপি।’ তিনি বিএনপির এই প্রস্তাবকে অবাস্তব বলে মনে করেন। জামায়াতের পক্ষ থেকে পাল্টা প্রস্তাব দিয়ে বলা হয়েছে, নির্বাচনের প্রস্তুতির জন্য নির্বাচন কমিশনকে যথেষ্ট সময় দেওয়া প্রয়োজন।

তাই জাতীয় নির্বাচনের সঙ্গে গণভোটের আয়োজন না করে, বরং আগামী নভেম্বর মাসেই এই গণভোট আয়োজন করা যেতে পারে। জামায়াত মনে করে, নভেম্বরে গণভোট অনুষ্ঠিত হলে সাংবিধানিক সংস্কারের বিষয়টি নির্বাচনের আগেই চূড়ান্ত রূপ পাবে, যা নির্বাচন কমিশনের কাজকে সহজ করবে এবং ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠেয় জাতীয় নির্বাচন একটি পরিষ্কার সাংবিধানিক ভিত্তির ওপর অনুষ্ঠিত হতে পারবে।

প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের এই রাজনৈতিক সংলাপ প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে মূলত জুলাই সনদ বাস্তবায়ন নিয়ে সৃষ্ট জটিলতা নিরসনের লক্ষ্যেই। গতকাল মঙ্গলবার (২১ অক্টোবর) বিএনপির তিন সদস্যের একটি প্রতিনিধিদলও প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে বৈঠক করেছিল। বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের নেতৃত্বে সেই বৈঠকে দলটি অন্তর্বর্তী সরকারকে অবিলম্বে একটি নির্দলীয় ‘তত্ত্বাবধায়ক সরকারের’ পূর্ণাঙ্গ চরিত্র ধারণ করার এবং প্রশাসন থেকে ‘দলীয় লোকজনকে’ সরিয়ে ফেলার জোরালো দাবি জানিয়েছিল।

অন্যদিকে, বুধবার বিকেলেই প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে বৈঠক করে জুলাই বিপ্লবের মূল শক্তি জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। এনসিপি এখন পর্যন্ত জুলাই সনদে স্বাক্ষর করা থেকে বিরত রয়েছে। তাদের বৈঠকের মূল দাবিও ছিল সনদের আইনি ভিত্তি স্পষ্ট করা। এনসিপি আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম বৈঠক শেষে জানিয়েছেন, সনদ বাস্তবায়নের ‘সুনির্দিষ্ট নিশ্চয়তা’ পেলেই কেবল তারা এতে স্বাক্ষর করবেন।

এই পরিস্থিতিতে প্রধান উপদেষ্টা একটি জটিল রাজনৈতিক সমীকরণের মুখোমুখি হয়েছেন। একদিকে এনসিপির মতো দল সনদের আইনি ভিত্তি ছাড়া স্বাক্ষর করতে নারাজ, অন্যদিকে সনদে স্বাক্ষরকারী জামায়াতের মতো দলও এখন সেই আইনি ভিত্তির জন্য ‘প্রধান উপদেষ্টার আদেশ’ দাবি করছে। আবার গণভোটের সময়সূচি নিয়ে বিএনপির সঙ্গে জামায়াতের মতো মিত্র দলগুলোর মধ্যেই তৈরি হয়েছে সুস্পষ্ট মতপার্থক্য।

প্রধান উপদেষ্টাকে এখন এই পরস্পরবিরোধী দাবি এবং সাংবিধানিক জটিলতার মধ্যে একটি সর্বজনগ্রাহ্য পথ খুঁজে বের করতে হবে। জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকে ‘প্রধান উপদেষ্টার আদেশ’-এর যে সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব দেওয়া হলো, তা এখন অন্তর্বর্তী সরকারের জন্য একটি নতুন বিবেচনার বিষয়। এই আদেশের মাধ্যমে জুলাই সনদের আইনি রূপ দেওয়া হবে কিনা, তার ওপরই নির্ভর করছে আগামী দিনের রাজনৈতিক গতিপ্রকৃতি এবং একটি অবাধ ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের ভবিষ্যৎ।