সেপ্টেম্বর ৩০, ২০২৬, ০৯:৩৮ পিএম
পারিবারিক জীবনে মনোমালিন্য বা ক্ষোভের বশে স্ত্রীকে উদ্দেশ্য করে ডিভোর্স দিলাম বললে শরিয়তের বিধান অনুযায়ী তালাক সংঘটিত হয়ে যায়। তালাক একটি আরবি শব্দ যা বাংলা ভাষাতেও বহুল প্রচলিত এবং ডিভোর্স ইংরেজি শব্দ হলেও উভয়টিই বৈবাহিক সম্পর্ক ছিন্ন করার ক্ষেত্রে স্পষ্ট শব্দ হিসেবে গণ্য হয়। স্বামী যদি স্ত্রীকে উদ্দেশ্য করে সরাসরি এ ধরনের শব্দ উচ্চারণ করেন, তবে তালাক কার্যকর হবে। একবার উচ্চারণ করলে এক তালাক, দুইবার উচ্চারণ করলে দুই তালাক এবং তিনবার উচ্চারণ করলে তিন তালাক হিসেবে ধর্তব্য হয়। কোনো স্বামী যদি স্ত্রীকে একবার ডিভোর্স দিলাম বলেন, তবে সে ক্ষেত্রে তালাকে রাজঈ কার্যকর হবে।
স্ত্রীকে বিবাহবন্ধনে পুনরায় ফিরিয়ে নেওয়ার বৈধতা ও নিয়ম তালাকের প্রকারভেদের ওপর নির্ভর করে। প্রথম প্রকার হলো তালাকে রাজঈ। স্বামী যদি স্ত্রীকে এক বা দুইবার ডিভোর্স দিলাম বলেন এবং সেই তালাক বায়েন না হয়, তবে ইদ্দত চলাকালীন নতুন করে বিয়ে ছাড়াই স্ত্রীকে ফিরিয়ে নেওয়া যায়। মৌখিকভাবে স্ত্রীকে পুনরায় গ্রহণ করার ঘোষণা দিলে অথবা ফিরিয়ে নেওয়ার উদ্দেশ্যে শারীরিক সম্পর্ক স্থাপন করলে বৈবাহিক সম্পর্ক পূর্বের মতো বহাল হয়ে যায়। তালাকে রাজঈর ক্ষেত্রে স্ত্রীকে ফিরিয়ে নেওয়া সম্পূর্ণভাবে স্বামীর ইচ্ছার ওপর নির্ভরশীল এবং এ পর্যায়ে স্ত্রীর সম্মতির বাধ্যবাধকতা থাকে না।
দ্বিতীয় প্রকার হলো তালাকে বায়েন। স্বামী যদি এক বা দুই তালাকে বায়েন দেন, তবে ইদ্দতের ভেতর কিংবা ইদ্দত শেষ হওয়ার পর স্ত্রীর সম্মতিতে নতুন মোহর নির্ধারণ করে পুনরায় বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হতে হবে। তালাকে বায়েন কার্যকর হওয়ার পর স্ত্রীর সম্মতি ছাড়া বা নতুন বিয়ে ছাড়া তাকে ফিরিয়ে নেওয়ার কোনো অবকাশ থাকে না। প্রাথমিকভাবে এক বা দুইবার ডিভোর্স দিলাম বললে তালাকে রাজঈ হলেও স্বামী যদি ইদ্দত শেষ হওয়ার আগে কোনো ঘোষণা না দেন বা সম্পর্ক পুনঃস্থাপন না করেন, তবে তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে তালাকে বায়েনে রূপান্তরিত হয়। তখন পুনরায় সংসার শুরু করতে হলে স্ত্রীর সম্মতি ও নতুন মোহরানায় পুনরায় বিয়ে করা অপরিহার্য।
তৃতীয় প্রকার হলো তালাকে মুগাল্লাযা। কোনো স্বামী যদি স্ত্রীকে একসাথে বা ভিন্ন সময়ে তিনবার ডিভোর্স দিলাম বলেন কিংবা অন্য যেকোনো স্পষ্ট শব্দে তিন তালাক দেন, তবে সেই স্ত্রীকে সরাসরি ফিরিয়ে নেওয়া বা পুনরায় বিয়ে করার কোনো সুযোগ আর অবশিষ্ট থাকে না। এমন পরিস্থিতিতে ওই নারী যদি স্বাভাবিক নিয়মে অন্য কোনো পুরুষের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন, তাদের মধ্যে স্বাভাবিক দাম্পত্য সম্পর্ক স্থাপিত হয় এবং পরবর্তী সময়ে সেই দ্বিতীয় স্বামীর মৃত্যু ঘটে অথবা তিনি স্বেচ্ছায় তালাক দেন, কেবল তখনই প্রথম স্বামী সেই নারীকে তাঁর সম্মতিক্রমে নতুন মোহর ধার্য করে পুনর্বিয়ে করতে পারেন।
পবিত্র কোরআনের সুরা বাকারার ২২৯ ও ২৩০ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তাআলা নির্দেশ দিয়েছেন যে তালাক দুইবার, এরপর স্ত্রীকে হয় মর্যাদার সাথে রাখতে হবে অথবা সুন্দরভাবে বিদায় দিতে হবে। আয়াতে আরও সুস্পষ্ট করা হয়েছে যে স্বামী যদি স্ত্রীকে তৃতীয়বার তালাক দেয়, তবে অন্য স্বামীর সঙ্গে বৈধ বিয়ে ও বিচ্ছেদ ব্যতীত সে আর আগের স্বামীর জন্য বৈধ হবে না। পারিবারিক বিরোধের সময় রাগের বশে তালাক উচ্চারণ করার বিষয়ে সচেতন থাকা প্রয়োজন। ইসলামি শরিয়তের নির্দেশনা অনুযায়ী রাগের মাথায়, উপহাস করে কিংবা তালাকের উদ্দেশ্য ছাড়া বললেও তা কার্যকর হয়ে যায়। সুনানে আবু দাউদ ও সুনানে তিরমিজিতে বর্ণিত হাদিসে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উল্লেখ করেছেন যে বিয়ে, তালাক ও তালাক প্রত্যাহার এই তিন বিষয়ে কৌতুকচ্ছলে বলা কথাও যথার্থভাবে বলা কথার মতোই ধর্তব্য হয়।

দিনাজপুর টিভির সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন