সেপ্টেম্বর ২১, ২০২৬, ১১:৫১ এএম
জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার তথ্যমতে অভ্যন্তরীণ মুক্ত ও বদ্ধ জলাশয়ের মিঠা পানির মাছ উৎপাদনে বিশ্বে বাংলাদেশের অবস্থান দ্বিতীয়। আর দেশের অভ্যন্তরে মাছের শীর্ষ উৎপাদক জেলা হিসেবে পরিচিত ময়মনসিংহ। সেই ঐতিহ্যকে আধুনিক সমন্বিত চাষের রূপ দিয়ে তাক লাগিয়ে দিয়েছেন জেলার ত্রিশাল উপজেলার কানহরি বাজারের উদ্যোক্তা পরিবার।
বর্তমানে তাদের প্রকল্পে পুকুরের সংখ্যা ৬০টি। ২০০০ সালে মরহুম আলহাজ ইদ্রিস আলী মণ্ডলের হাত ধরে পৈতৃক জমিতে স্থানীয় বাংলা মাছের ঐতিহ্যবাহী চাষ শুরু হয়েছিল। পরে থাইল্যান্ড থেকে আমদানি করা উন্নত জাতের মাছের পোনা দিয়ে বৈলর এলাকায় বাণিজ্যিক উৎপাদন ছড়িয়ে পড়ে। সেই অনুপ্রেরণায় ২০০২ সাল থেকে পাঙ্গাস চাষে যুক্ত হন তার ছেলেরা। বড় ভাই মোহাম্মদ ইসরাফিল, মেজো মোহাম্মদ ইলিয়াস ও মোহাম্মদ ইউসুফের পর ২০১০-১১ শিক্ষাবর্ষে ব্যবসায় প্রশাসনে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি শেষ করে খামারে যুক্ত হন ছোট ভাই মোহাম্মদ মুসা। শুরুতে ২০০৫ সালে মাত্র ২৫ শতক আয়তনের একটি জলাশয়ে পাঁচ হাজার পোনা দিয়ে পথচলা শুরু হয়। পরের বছর ২০০৬ সালে এর সঙ্গে দুই হাজার লেয়ার মুরগি যোগ করে যাত্রা শুরু করে তাদের সমন্বিত খামার প্রকল্প।
পুকুর ও পোলট্রির এই সমন্বিত প্রকল্পে বর্তমান বিনিয়োগের পরিমাণ পাঁচ থেকে ছয় কোটি টাকা। সমন্বিত খামারের সবচেয়ে বড় বিশেষত্ব হচ্ছে ক্ষতিকর রাসায়নিক ও অ্যান্টিবায়োটিকমুক্ত খাদ্য ব্যবহার। পাঙ্গাস মাছের ক্ষেত্রে প্রচলিত দুর্গন্ধ ও কালো রঙের দুর্নাম ঘোচাতে সম্পূর্ণ উদ্ভিজ্জ বা ভেজিটেবল বেসড খাদ্য ব্যবহার করা হয়। নিজস্ব ফিডমিলে চালের কুঁড়া বা রাইস পলিশ, সয়াবিন ও ভুট্টার মিশ্রণে এই খাদ্য তৈরি হয়। কোনো ধরনের ক্ষতিকর বর্জ্য ব্যবহার না করায় এখানকার উৎপাদিত পাঙ্গাস বাইরে ও পেটের ভেতরে সাদা থাকে এবং যমুনা নদীর পাঙ্গাসের মতো সুস্বাদু হয়। পানির গুণমান ও পিএইচ মান নিয়মিত পরীক্ষার পাশাপাশি তলার বিষাক্ত গ্যাস দূর করতে প্রতি মাসে একবার ঘন জাল টেনে তলদেশ পরিষ্কার রাখা হয়।
এক বছর পরিচর্যার পর পাঙ্গাস মাছের গড় ওজন দাঁড়ায় দুই থেকে তিন কেজিতে। বর্তমানে খামার পর্যায়ে পাইকারিতে প্রতি কেজি পাঙ্গাস বিক্রি হচ্ছে ১৫০ টাকায়, যা খুচরা বাজারে পৌঁছায় প্রায় ২০০ টাকায়। আগে সান্তাহার থেকে পোনা আনা হলেও এখন স্থানীয় বালিপাড়া ও গৌরীপুরের হ্যাচারি থেকে রেনু সংগ্রহ করা হয়। একটি বড় পুকুর থেকেই বছরে প্রায় ৬০ টন মাছ তোলা সম্ভব হয়, যার বর্তমান বাণিজ্যিক মূল্য প্রায় ৯০ লাখ টাকা। সারা দেশ থেকে আসা পাইকারদের কাছে এক রাতেই ৩০ থেকে ৪০ টন মাছ বিক্রি করা হয়। এই ৬০টি পুকুরে সার্বক্ষণিক কাজ করছেন ৩০ থেকে ৩৫ জন শ্রমিক, যাদের থাকা-খাওয়ার সুব্যবস্থার পাশাপাশি ১২ থেকে ১৫ হাজার টাকা মাসিক বেতন দেওয়া হয়। পাঙ্গাসের পাশাপাশি খামারে রুই, কাতল, মৃগেল, পাবদা, ট্যাংরা ও শিং মাছের সফল মিশ্র চাষ করা হচ্ছে। মৎস্য খামারের পাশাপাশি গড়ে উঠেছে ১২টি আধুনিক শেডের সুবিশাল পোলট্রি ইউনিট, যেখানে বর্তমানে ৩৫ হাজার বাণিজ্যিক লেয়ার মুরগি রয়েছে। একদিন বয়সী বাচ্চা এনে নিজস্ব শেডে ব্রুডিং করে ২০ সপ্তাহ বয়স থেকে ডিম সংগ্রহ শুরু হয় এবং টানা ১১০ সপ্তাহ পর্যন্ত তা অব্যাহত থাকে। প্রতিদিন গড়ে ৯০ শতাংশ হারে প্রায় ২৭ হাজার ডিম উৎপাদন হচ্ছে।
পোলট্রি শেডের ভেতরে শ্রমিকদের সার্বক্ষণিক থাকা ও কঠোর জীবাণুমুক্তকরণের নিয়ম মেনে চলায় গত ১৯ বছরে কোনো বড় মড়ক বা ক্ষতির মুখোমুখি হতে হয়নি। মুরগির খাদ্যে ৫৬ থেকে ৬০ শতাংশ পুষ্টিকর দানাদার ভুট্টা ব্যবহারের পাশাপাশি সয়াবিন, চালের কুঁড়া ও চুনাপাথর ব্যবহার করা হয়। ডিম পরিবহনের প্রতিটি প্লাস্টিক ক্যারেট নিয়মিত ব্লিচিং ও জীবাণুনাশক পানিতে ধুয়ে শেডে ঢোকানো হয়। প্রতিটি প্রাপ্তবয়স্ক লেয়ার মুরগির গড় ওজন হয় ১ হাজার ৯০০ গ্রাম থেকে দুই কেজি। ডিম উৎপাদনের সময়সীমা পার হওয়ার পর সেগুলো মাংসের জন্য বাজারে বিক্রি করে দেওয়া হয়। উৎপাদন সফল হলেও খামারিরা বেশ কিছু কাঠামোগত সংকটের মুখোমুখি হচ্ছেন। বিশেষ করে ২০০৪ সালে ক্ষুদ্র শিল্পের জন্য ঘোষিত ২০ শতাংশ বিদ্যুৎ বিল রিবেট বা প্রণোদনা এখনো মাঠপর্যায়ে কার্যকর হয়নি। এতে সেচ ও ফিডমিল পরিচালনায় উৎপাদন খরচ অনেক বেড়ে যাচ্ছে। পাশাপাশি সরকারিভাবে প্রতি পিস ডিমের যৌক্তিক মূল্য ১০ টাকা ৬০ পয়সা নির্ধারণ করা হলেও মধ্যস্বত্বভোগীদের কারণে খামারিরা ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
নতুন উদ্যোক্তাদের উদ্দেশে বাংলাদেশ পোলট্রি ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যাসোসিয়েশনের নির্বাহী সদস্য মোহাম্মদ ইসরাফিল জানান, প্রশিক্ষণ ছাড়া কোনো অবস্থাতেই খামার শুরু করা যাবে না। সরকারি যুব উন্নয়ন অধিদপ্তর থেকে প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ নিয়ে এবং সফল খামারগুলো সরেজমিনে পরিদর্শন করে অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে কাজে নামলে সাফল্য নিশ্চিত করা সম্ভব। মানসম্মত এই মাছ দেশের চাহিদা মিটিয়ে যাতে বিদেশে রপ্তানি করা যায়, সে জন্য সরকারের নীতিনির্ধারণী নীতি সহায়তা ও রপ্তানি প্রণোদনা চেয়েছেন খামারিরা।

দিনাজপুর টিভির সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন