শুক্রবার, ০৬ নভেম্বর, ২০২৬,

ব্যাংকের চাকরি ছেড়ে সমন্বিত খামার: মোশারফের সাফল্য

দিনাজপুর টিভি ডেস্ক

সেপ্টেম্বর ১৪, ২০২৬, ১০:০৭ পিএম

ব্যাংকের চাকরি ছেড়ে সমন্বিত খামার: মোশারফের সাফল্য

সংগৃহীত ছবি

ব্যাংকের চাকরি ছেড়ে সমন্বিত খামার গড়ে তুলে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন উদ্যোক্তা মোশারফ হোসেন। অর্থনীতিতে উচ্চশিক্ষা শেষ করে একটি বেসরকারি ব্যাংকে দায়িত্বশীল পদে কর্মরত থাকলেও প্যারালাইসিসে আক্রান্ত শয্যাশায়ী মায়ের সার্বক্ষণিক সেবা নিশ্চিত করতে তিনি নিজ গ্রামে ফিরে আসেন। শিকড়ের টানে এবং পারিবারিক কৃষি ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতায় তিনি গড়ে তুলেছেন ‘দিশারি এগ্রো ফার্ম লিমিটেড’।

মায়ের সেবা করার পাশাপাশি স্থানীয় অর্থনীতি বদলে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে শুরু হয় তার পথচলা। বরগুনা জেলায় বর্তমানে প্রায় ১৫ একর বিস্তৃত জমিতে গড়ে উঠেছে এই সমন্বিত কৃষি প্রকল্প। এর বাইরে কলাপাড়া ও সোনাখালি এলাকায় ফলের বাগান সম্প্রসারণ করেছেন তিনি। প্রায় দুই দশক আগে ২০০৪ সালে যখন তিনি কাজ শুরু করেন, তখন এলাকাটি ছিল কচুরিপানায় ভরা এক নিচু জলাশয়। প্রাথমিক পর্যায়ে সেই জলাভূমি পরিষ্কার করতে প্রায় দুই লাখ টাকা খরচ হয় এবং প্লাবনের কারণে বারবার লোকসানের মুখে পড়তে হয়। পরবর্তীতে ভারী খননযন্ত্র দিয়ে নিচু জমি ভরাট করে প্রায় ১৫ লাখ টাকা ব্যয়ে অভ্যন্তরীণ যাতায়াত সড়ক নির্মাণ করেন তিনি, যার ফলে পুরো এলাকাটি একটি বহুমুখী উৎপাদন কেন্দ্রে রূপান্তরিত হয়।

এক সময় প্লাবনে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া সেই জমি থেকেই এখন বরগুনার সিংহভাগ সবজি উৎপাদিত হয়। অতীতে প্রাকৃতিক দুর্যোগে এক মৌসুমে পুরো বিলের ধান নষ্ট হয়ে গেলে তিনি কৃষকদের পাশে দাঁড়ান। বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনের (বিএডিসি) প্রকৌশলীদের সহযোগিতায় বরিশাল ও স্থানীয় কার্যালয় থেকে ১৫টি সেচ পাম্প এনে, কৃষকদের বাকিতে সার ও বীজ দিয়ে পুরো মাঠকে পুনরায় চাষাবাদের আওতায় নিয়ে আসেন। সেই সংকট কাটিয়ে কৃষকরা ভালো ফলন পান এবং লাভবান হয়ে তাদের বিনিয়োগের অর্থ ফেরত দেন।

আন্তর্জাতিক কৃষি ব্যবস্থা পর্যবেক্ষণে থাইল্যান্ড ও ভিয়েতনাম সফর করা এই উদ্যোক্তা উন্নত প্রযুক্তি যুক্ত করেছেন নিজের খামারে। তার ফলবাগানে উচ্চফলনশীল জি-নাইন জাতের কলার পাশাপাশি সাথী ফসল হিসেবে চাষ হচ্ছে বারোমাসি আঠাহীন ভিয়েতনামী কাঁঠাল ও পেঁপে। টিস্যু কালচারের মাধ্যমে লাগানো এই বিশেষ জাতের কলার প্রতিটি ছড়িতে প্রায় ৩০০টি পর্যন্ত ফল ধরে এবং এক-একটি ছড়ির ওজন দেড়শ কেজি পর্যন্ত পৌঁছে থাকে। যেখানে প্রতি গাছে উৎপাদন খরচ পড়ে প্রায় ১০০ টাকা, সেখানে প্রতিটি ছড়ি বিক্রি হয় গড়ে ৪০০ টাকায়, যা প্রায় ৭৫ শতাংশ মুনাফা নিশ্চিত করে।

খামারের প্রায় ছয় একর আয়তনের একটি দীর্ঘায়িত জলাশয়ে আধুনিক পদ্ধতিতে মাছের চাষ করা হচ্ছে। রুই, কাতল ও বিভিন্ন কার্পের পাশাপাশি স্থানীয় চাহিদার কথা বিবেচনায় রেখে প্রতিদিন জীবন্ত পাঙ্গাশ মাছ বাজারে সরবরাহ করা হয়। মাছ চাষ থেকে বাৎসরিক প্রায় ৫০ লাখ টাকা আয় হলেও খাদ্য ও পরিচর্যা বাবদ এক কোটি টাকার বেশি ব্যয় করতে হয় বলে জানান তিনি।

ভবিষ্যতে এক বিঘা জমিতে গলদা চিংড়ি চাষের পরিধি বাড়ানোর পাশাপাশি স্থানীয় বাজারের ফল ও মাছের প্রধান সরবরাহকারী হিসেবে নিজের প্রতিষ্ঠানকে রূপ দেওয়াই তার চূড়ান্ত লক্ষ্য।