বৃহস্পতিবার, ০৫ নভেম্বর, ২০২৬,
কৃষি উদ্ভাবন

উপকূলীয় অঞ্চলে চাষাবাদে নতুন সম্ভাবনা নিয়ে এলো উচ্চ ফলনশীল ব্রি ধান ১১৯

কৃষি ডেস্ক

নভেম্বর ৫, ২০২৬, ০৬:১২ পিএম

উপকূলীয় অঞ্চলে চাষাবাদে নতুন সম্ভাবনা নিয়ে এলো উচ্চ ফলনশীল ব্রি ধান ১১৯

ছবি: সংগৃহীত

দেশের উপকূলীয় লবণাক্ততাপ্রবণ অঞ্চল ও প্রতিকূল পরিবেশে চাষাবাদের উপযোগী ধান আবাদে নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয়েছে বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের উদ্ভাবিত নতুন জাত ব্রি ধান ১১৯-এর মাধ্যমে। সম্প্রতি জাতীয় বীজ বোর্ডের ১১৬তম সভায় রোপা আমন মৌসুমে চাষাবাদের জন্য এই জাতটির চূড়ান্ত অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। মঙ্গলবার ব্রির প্রকাশনা ও জনসংযোগ বিভাগের কর্মকর্তা মো. আল আমিন এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন।

ব্রির উদ্ভিদ প্রজনন বিভাগের মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মোহাম্মদ এখলাছুর রহমানের নেতৃত্বে একটি গবেষক দল নতুন এই জাতটি উদ্ভাবন করেছেন। লোকেশন স্পেসিফিক টেকনোলজি ডেভেলপমেন্ট প্রকল্পের অর্থায়নে পরিচালিত এই গবেষণায় আরও যুক্ত ছিলেন ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা হাসিনা খাতুন, সিনিয়র প্ল্যান্ট ব্রিডার নুসরাত জাহান, বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা আরমিন আক্তার সেতু এবং বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা রিবেত ফারজানা দিশা।

উদ্ভাবিত এই জাতটির জীবনকাল প্রায় ১১৫ দিন। লবণাক্ত উপকূলীয় অঞ্চল ছাড়াও দেশের অলবণাক্ত অঞ্চলেও এটি চাষ করা সম্ভব। এর ফলে রোপা আমন কেটে নেওয়ার পর একই জমিতে সরিষা কিংবা সূর্যমুখীর মতো রবি ফসল ফলানোর সুযোগ তৈরি হবে। গবেষকদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, রোপা আমন মৌসুমে এক থেকে ৩০ জুলাইয়ের মধ্যে এর বীজ বপন করতে হবে। মাঝারি উঁচু থেকে উঁচু জমিতে ২৫ থেকে ৩০ দিন বয়সের চারা সারি ও গোছার নির্দিষ্ট দূরত্ব বজায় রেখে প্রতি গর্তে দুই থেকে তিনটি করে রোপণ করার পরামর্শ দিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

এছাড়া বীজ প্রত্যয়ন এজেন্সির তত্ত্বাবধানে দেশের ২০টি ভিন্ন ভিন্ন স্থানে লবণাক্ত ও অলবণাক্ত পরিবেশে পরীক্ষা সম্পন্ন করার পর বোরো মৌসুমে চাষাবাদের লক্ষ্যে ইতোমধ্যে জাতীয় কারিগরি কমিটির সুপারিশও লাভ করেছে এই জাতটি। জাতীয় বীজ বোর্ডের চূড়ান্ত অনুমোদন মিললে আমন ও বোরো উভয় মৌসুমেই এটি চাষ করা যাবে। কৃষি তথ্য অনুযায়ী, উপযুক্ত পরিচর্যা পেলে এই ধানের গড় ফলন হেক্টরপ্রতি পাঁচ দশমিক সাত টন পর্যন্ত হয়ে থাকে, যেখানে পরিবেশ ও লবণাক্ততার তারতম্য ভেদে ফলন চার দশমিক আট থেকে সাত দশমিক ছয় টন পর্যন্ত হতে পারে। প্রচলিত ব্রি ধান ৭৩-এর তুলনায় এই জাতের ফলন হেক্টরপ্রতি প্রায় এক টন বেশি।

এই জাতের গাছগুলোর গড় উচ্চতা ১১৩ সেন্টিমিটার এবং কাণ্ড বেশ শক্ত হওয়ায় এগুলো সহজে হেলে পড়ে না। বিশেষ করে চারা অবস্থায় একটানা তিন সপ্তাহ পর্যন্ত প্রতি মিটারে ১২ ডেসিসিমেন্স এবং অঙ্গজ থেকে প্রজনন পর্যন্ত সংবেদনশীল বিভিন্ন ধাপে আট থেকে ১০ ডেসিসিমেন্স মাত্রার লবণাক্ততা সহ্য করার বিশেষ ক্ষমতা রয়েছে এই জাতটির। ব্রি ধান ১১৯-এর প্রতিটি শীষে প্রায় ২১৫টি পুষ্ট ধান পাওয়া যায়, যা প্রচলিত জাতের তুলনায় ৭০ থেকে ৮০টি বেশি। পাশাপাশি শীষ থেকে ধান সহজে ঝরে যায় না। এর চাল মাঝারি চিকন ও সাদা রঙের হয়ে থাকে এবং রান্নার পর ভাত ঝরঝরে হয়।

নতুন এই জাতটির বিষয়ে ব্রির মহাপরিচালক মো. রফিকুল ইসলাম জানান যে ব্রি ধান ১১৯ জাতটির উদ্ভাবন দেশের কৃষি গবেষণাক্ষেত্রে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সাফল্য এবং এটি উপকূলীয় অঞ্চলের কৃষকদের ধান উৎপাদনে সহায়তা করার পাশাপাশি দেশের খাদ্যনিরাপত্তা সুদৃঢ় করতে বড় ধরনের ভূমিকা রাখবে। অন্যদিকে, দীর্ঘ গবেষণার প্রতিটি স্তরে তাদের পুরো দল অত্যন্ত নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেছে উল্লেখ করে প্রধান গবেষক মোহাম্মদ এখলাছুর রহমান জানান যে কৃষকদের মাঠে এই জাতের সুফল পৌঁছে যাওয়াটাই তাদের কাজের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।