সোমবার, ২১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬,

প্রবাসীদের ডেইরি খামার: দোহারে ১১০ গরুর সাফল্য

কৃষি ডেস্ক

সেপ্টেম্বর ২১, ২০২৬, ১১:২৯ এএম

প্রবাসীদের ডেইরি খামার: দোহারে ১১০ গরুর সাফল্য

সৌদি আরবে মেটাল ও ইঞ্জিনিয়ারিং ওয়ার্কশপে কর্মরত থেকে ঢাকার দোহার উপজেলার বিলাসপুর গ্রামে আধুনিক সমন্বিত ডেইরি খামার গড়ে তুলেছেন তিন প্রবাসী ভাই। শুরুতে বড় ধরনের রোগব্যাধি ও বাজারজাতকরণে লোকসানের মুখে পড়লেও প্রযুক্তি ও সঠিক ব্যবস্থাপনায় বর্তমানে ১১০টি গরু এবং অর্ধশতাধিক ছাগল, ভেড়া ও গাড়ল নিয়ে ব্যবসায়িক সাফল্য পাচ্ছেন তারা।

খামারে প্রতিদিন গড়ে ৪০০ লিটার দুধ উৎপাদিত হচ্ছে। উদ্যোক্তা আলম খান জানান, তাদের সাত ভাইয়ের সবাই সৌদি আরব প্রবাসী। ২০১৮ সালে বাবার মৃত্যুর পর দেশে এসে কৃষির প্রতি পারিবারিক টান ও টেলিভিশনের অনুপ্রেরণামূলক অনুষ্ঠান দেখে খামার করার সিদ্ধান্ত নেন। মেজো ভাইয়ের বিশেষ আগ্রহ ও আর্থিক জোগানে শুরুতে একটি গরু কেনেন এবং ছয় মাসের মধ্যে তা ১৩টিতে উন্নীত করেন। ২০১৯ সালের শেষদিকে বাণিজ্যিকভাবে খামার সম্প্রসারণ করে প্রায় ৪০টি গাভী আনা হয়। নিজস্ব ইঞ্জিনিয়ারিং অভিজ্ঞতার কারণে ঢাকা থেকে স্টিল ও শেডের মালামাল কিনে এনে নিজেরাই আধুনিক কাঠামোর খামার ঘর নির্মাণ করেন।

২০২১ ও ২০২২ সালে ষাঁড় মোটাতাজাকরণে বড় ধাক্কা খায় খামারটি। ওই সময় কোরবানির হাটে ষাঁড় বিক্রি না হয়ে ফেরত আসে এবং একই সঙ্গে খুরে রোগ বা এফএমডিতে আক্রান্ত হয়ে বেশ কিছু গবাদিপশু মারা যায়। তবে উদ্যোক্তারা হাল ছাড়েননি। খামারে আধুনিক সিসি ক্যামেরা স্থাপন করে মধ্যপ্রাচ্যে বসেই প্রতিদিনের ব্যবস্থাপনা ও খাবারের তদারকি নিশ্চিত করেন। বর্তমানে সার্বক্ষণিক খামার দেখাশোনার দায়িত্বে রয়েছেন ম্যানেজার জাহাঙ্গীর এবং প্রতিদিনের দুধ বিক্রি ও বাজার হিসাবের তদারকিতে আছেন জসিম নামের এক আত্মীয়। বর্তমানে খামারে থাকা মোট ১১০টি গরুর মধ্যে ৮০টি পূর্ণবয়স্ক গাভী। সকালের ধাপে সাত মণ বা ২৮০ লিটার এবং বিকেলের ধাপে ১২০ লিটার দুধ সংগ্রহ করা হয়, যার বাজারমূল্য আসে প্রায় ৩২ হাজার টাকা। বেশিরভাগ গাভী বর্তমানে গর্ভবতী হওয়ায় বছরজুড়ে ৫০ থেকে ৬০টি বাছুরের প্রত্যাশা করছেন তারা। প্রতিটি উন্নত জাতের বাছুর বিক্রি থেকে বছরে ৩০ থেকে ৪০ লাখ টাকা এবং আনুষঙ্গিক মিলিয়ে বছরে প্রায় ৫০ লাখ টাকা পর্যন্ত মোট মুনাফা অর্জন সম্ভব বলে আশাবাদ প্রকাশ করেন আলম খান। এর আগে খামারের ২০টি অতিরিক্ত বাছুর বিক্রি করে তারা ২৬ লাখ টাকা আয় করেছিলেন। গাভীর জাত নির্বাচনের ক্ষেত্রে সিরাজগঞ্জের সুপরিচিত ডেইরি বেল্ট থেকে হলস্টেইন ফ্রিজিয়ান ও জার্সি ক্রসের গরু নির্বাচন করেছেন উদ্যোক্তারা। একটি ভালো জার্সি ক্রস গাভী থেকে দৈনিক সর্বোচ্চ ২৪ লিটার পর্যন্ত দুধ পাওয়া যাচ্ছে। গাভী নির্বাচনের ক্ষেত্রে সরু গলা, সাদা খুর, গোলাকার চোখ ও সুষম স্তনবৃন্তের গঠনকে প্রাধান্য দেওয়া হয়। এছাড়া কৃত্রিম প্রজননের ক্ষেত্রে গাভী ডাক বা হিটে আসার ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা পর শুক্রাণু প্রয়োগ করার নিয়ম কঠোরভাবে মেনে চলা হয়।

গরুর পাশাপাশি খামারে ২০টি ছাগল, ২২টি গাড়ল এবং ১০টি ভেড়া নিয়ে গড়ে উঠেছে সমন্বিত পশুপালন। ছাগলের ওজন দ্রুত বাড়ানোর জন্য তোতাপুরি ক্রসের উন্নত পাঠা দিয়ে প্রজনন করানো হচ্ছে, যার ফলে ৪২ দিন বয়সের বাচ্চার ওজন দাঁড়াচ্ছে প্রায় সাড়ে সাত কেজি। এছাড়া ছাগলের পশম ছেঁড়া সমস্যা দূর করতে খামারে পর্যাপ্ত জিংক ও খনিজ লবণের জোগান দেওয়া হয়।

উপজেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তরের পরামর্শ অনুযায়ী, ডেইরি খামারে লাভবান হতে হলে প্রতিটি গাভী থেকে দৈনিক কমপক্ষে ১০ লিটার দুধ উৎপাদন নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি খামারের কাঁচা ঘাসের নিজস্ব সংস্থান থাকা এবং বছরে অন্তত দুবার কৃমিনাশক প্রয়োগ ও নিয়মিত তড়কা, ক্ষুরারোগ ও লাম্পি স্কিন ডিজিজ বা এলএসডির টিকা দেওয়া খামারকে রোগমুক্ত রাখার মূল শর্ত।