বৃহস্পতিবার, ০৫ নভেম্বর, ২০২৬,
কৃষি ও উদ্যোক্তা

অক্ষত মনোবল ও দুম্বা পালনে ভাগ্য বদলে নিলেন কুষ্টিয়ার শারীরিক প্রতিবন্ধী রাকিবুল

কৃষি ডেস্ক

নভেম্বর ৫, ২০২৬, ০৯:১৬ পিএম

অক্ষত মনোবল ও দুম্বা পালনে ভাগ্য বদলে নিলেন কুষ্টিয়ার শারীরিক প্রতিবন্ধী রাকিবুল

ছবি: সংগৃহীত

মহিষের খামার করে ভালোই চলছিল সংসার। কিন্তু হঠাৎ মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণে শরীরের বাম পাশ অবশ হয়ে যাওয়ায় বন্ধ হয়ে যায় দীর্ঘদিনের সেই খামার। অসুস্থ শরীর নিয়ে কীভাবে জীবিকা নির্বাহ করবেন, তা নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়েন রাকিবুল ইসলাম।

তবে শারীরিক প্রতিবন্ধকতার কাছে হার মানেননি কুষ্টিয়ার মিরপুর উপজেলার বহলবাড়িয়া ইউনিয়নের সাহেব নগর গ্রামের এই বাসিন্দা। বিকল্প আয়ের পথ খুঁজতে গিয়ে এক জোড়া দুম্বা কিনে গড়ে তোলেন একটি ছোট খামার। আর সেই খামারই এখন তাকে স্বাবলম্বী হওয়ার স্বপ্ন দেখাচ্ছে।

প্রায় ১০ বছর আগে চাকরি বা বিদেশে যাওয়ার পেছনে না ছুটে মহিষ পালন শুরু করেছিলেন ৩৬ বছর বয়সী রাকিবুল ইসলাম। মহিষ পালন ভালোভাবেই চলছিলে, কিন্তু ২০২৩ সালের মার্চে মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণে তার বাঁ পাশ অবশ হয়ে যায়। দীর্ঘ চিকিৎসার পর কিছুটা সুস্থ হলেও আগের মতো পরিশ্রম করা সম্ভব হয়নি, যার ফলে বন্ধ করতে হয় মহিষের খামার।

এ অবস্থায় তুলনামূলক কম পরিশ্রমে আয় করার বিকল্প পথ খুঁজতে থাকেন তিনি। এক বড় ভাইয়ের মাধ্যমে নাটোরের একটি দুম্বার খামারের সন্ধান পান। সেখানে গিয়ে খামার ব্যবস্থাপনা ও দুম্বা পালনের পদ্ধতি সম্পর্কে ধারণা নেন। তারপরেই একটি দুম্বা ও একটি দুম্বী কিনে বাড়িতে শুরু করেন নতুন যাত্রা।

রাকিবুল ইসলাম জানান, অসুস্থ শরীর নিয়ে খুবই চিন্তায় ছিলেন। মহিষ বিক্রির টাকা দিয়ে বাড়ি নির্মাণের কাজ শুরু করায় সেই পুঁজি হারানোর ভয়ও কাজ করছিল। পরিচিত এক বড় ভাইয়ের সহযোগিতায় নাটোর থেকে দুটি দুম্বা এনে কাজ শুরু করেন তিনি।

২০২৪ সালের শুরুতে দুটি দুম্বা দিয়ে যাত্রা শুরু করার পর তার খামারে এখন ছোট-বড় মিলিয়ে ১৫টি দুম্বা রয়েছে। ইতোমধ্যে তিনি ছয়টি বড় দুম্বা ১২ লাখ টাকায় বিক্রি করেছেন। প্রতিটি বাচ্চা দুম্বার সম্ভাব্য বাজার মূল্য প্রায় এক লাখ টাকা। আর পূর্ণবয়স্ক দুম্বা বিক্রি হচ্ছে দুই থেকে তিন লাখ টাকায়।

দুম্বা পালনের খরচ সম্পর্কে রাকিবুল জানান, দেশি গবাদিপশুর মতো দুম্বাও কাঁচা ঘাস, খড়, ভুসি, ছোলাসহ সব ধরনের খাবার খায়। খাবারের জন্য আলাদা বড় কোনো আয়োজন করতে হয় না। পুষ্টির জন্য মাঝে মধ্যে ভিটামিন দেওয়া হয়। দুম্বা প্রতিবছর দুবার বাচ্চা দেয়। বাচ্চাগুলো ঘাস খাওয়ার উপযোগী হলেই প্রায় এক লাখ টাকায় বিক্রি করা যায়। বর্তমানে খামারে থাকা ১৫টি দুম্বার মধ্যে তিনটি অল্প কিছুদিনের মধ্যেই বাচ্চা দেবে। বাচ্চা দেওয়ার পরও মা দুম্বার দুধ সংগ্রহ করা যায়।

খামারের পরিচর্যাকারী সুজন হাসান বলেন, দেশি ছাগল ও ভেড়া যে খাবার খায়, সেগুলোই দুম্বাকে দেওয়া হয়। খুব বেশি খাবার লাগে না। সকালে ঘরের খাবার দেওয়ার পর বাইরে ঘাস খেতে ছেড়ে দেওয়া হয়। বিকেলে পানি ও সামান্য আনুষঙ্গিক খাবার দিলেই চলে। মাসে দুইবার গোসল করাতে হয় এবং খামারের ঘর পরিষ্কার রাখতে হয়।

প্রতিবেশী মাওলানা ইমরান হাসান বলেন, মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণে শরীরের এক পাশ অবশ হয়ে গেলেও দমে যাননি রাকিবুল। দুম্বার খামার করে নিজের উপার্জনের পথ তৈরি করেছেন তিনি। তার এই উদ্যোগ প্রমাণ করে যে, মনোবল ও ইচ্ছাশক্তি থাকলে শারীরিক প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বেও ঘুরে দাঁড়ানো সম্ভব।

মিরপুর উপজেলা প্রাণিসম্পদ সম্প্রসারণ কর্মকর্তা ডা. মো. আবদুল্লাহিল কাফি বলেন, স্বল্প পরিসরে ঘরোয়া পরিবেশে দুম্বা পালন করে লাভবান হওয়া সম্ভব। রাকিবুলের খামার তার একটি দৃষ্টান্ত। বেকার তরুণ ও উদ্যোক্তারা বিদেশে যাওয়ার পেছনে অর্থ ব্যয় না করে দেশে বিনিয়োগ করে এ ধরনের খামার গড়ে তুলতে পারেন। সঠিক পরিচর্যা ও ব্যবস্থাপনায় দুম্বা পালন অত্যন্ত লাভজনক হতে পারে।