বৃহস্পতিবার, ০৫ নভেম্বর, ২০২৬,
স্বাস্থ্যঝুঁকি

স্থানীয়ভাবে তৈরি অ্যালুমিনিয়ামের রান্নার পাত্র থেকে খাবারে মিশতে পারে বিষাক্ত সিসা

দিনাজপুর টিভি ডেস্ক

নভেম্বর ৫, ২০২৬, ০৮:৫৬ পিএম

স্থানীয়ভাবে তৈরি অ্যালুমিনিয়ামের রান্নার পাত্র থেকে খাবারে মিশতে পারে বিষাক্ত সিসা

স্থানীয়ভাবে তৈরি অ্যালুমিনিয়ামের রান্নার পাত্র থেকে খাবারে বিষাক্ত ধাতু সিসা মিশতে পারে। বিশেষ করে নতুন পাত্রে প্রথম কয়েকবার রান্নার সময় খাবারে সিসার পরিমাণ অনেক বেশি পরিমাণে পাওয়া গেছে। আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশ বা আইসিডিডিআর,বি এবং যুক্তরাষ্ট্রের স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের যৌথ এক গবেষণায় এই তথ্য উঠে এসেছে। গবেষকেরা বলছেন, নিরাপদ রান্নার পাত্র তৈরি, মান যাচাই এবং ব্যবহারের ক্ষেত্রে সার্বিক সচেতনতা বাড়ানো অত্যন্ত জরুরি।

বৃহস্পতিবার প্রকাশিত ওই গবেষণায় বলা হয়েছে, পুরোনো অ্যালুমিনিয়ামের হাঁড়ি-পাতিলের বদলে নতুন পাত্র কেনা কিংবা পুরোনো কাপড়ের বিনিময়ে পাত্র নেওয়ার প্রচলন থাকলেও নতুন বা দেখতে চকচকে হলেই সেটি নিরাপদ, এই ধারণা সম্পূর্ণ ঠিক নয়। স্থানীয়ভাবে তৈরি অনেক অ্যালুমিনিয়ামের পাত্র পুরোনো স্ক্র্যাপ ধাতু গলিয়ে তৈরি করা হয়। এসব ধাতু যথাযথভাবে পরীক্ষা না করলে প্রস্তুতকৃত পাত্রে সিসা রয়ে যেতে পারে।

সিসার সংস্পর্শ শিশুদের মস্তিষ্কের বিকাশ, শেখার ক্ষমতা ও আচরণের ওপর দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, রক্তে সিসার এমন কোনো নির্দিষ্ট মাত্রা নেই, যাকে সম্পূর্ণ নিরাপদ বলা যায়।

আলোচ্য গবেষণাটি ন্যাচার প্রকাশিত জার্নাল অব এক্সপোজার সায়েন্স অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল এপিডেমিওলজি সাময়িকীতে প্রকাশিত হয়েছে। এতে স্থানীয়ভাবে তৈরি অ্যালুমিনিয়ামের পাত্রে রান্না করা খাবারে কী পরিমাণ সিসা মিশতে পারে, তা পরীক্ষা করা হয়। পাশাপাশি খাবারের অম্লতা, পাত্র পরিষ্কারের পদ্ধতি এবং রান্নার ধরন সিসা মিশে যাওয়ার পরিমাণে কী ধরনের প্রভাব ফেলে, সেটিও নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করেন গবেষকেরা।

এই উদ্দেশ্যে বাংলাদেশের বিভিন্ন পরিবার থেকে সংগ্রহ করা সাতটি ব্যবহৃত পাত্র এবং বাজার থেকে কেনা বিশটি নতুন পাত্র পরীক্ষা করা হয়। প্রথমে পাত্রগুলোর ধাতুতে সিসার উপস্থিতি ও পরিমাণ নির্ণয় করা হয়। পরে পাত্রগুলোতে তাপ দিয়ে তাতে সাদা ভাত ও খিচুড়ি রান্না করা হয়। সবশেষে পরীক্ষাগারে বিশেষ পদ্ধতিতে পানি ও রান্না করা খাবারে সিসার পরিমাণ মাপা হয়।

স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের হিউম্যান অ্যান্ড প্ল্যানেটারি হেলথের প্রজেক্ট আনলেডেডের পরিচালক জেনা ফরসিথ জানান, রান্নার পাত্র এবং ওই পাত্রে রান্না করা খাবার—দুটিতেই সিসার পরিমাণ পরীক্ষা করেছেন তারা। এর মাধ্যমে প্রতিদিনের রান্নায় ব্যবহৃত সাধারণ একটি পাত্র কীভাবে মানুষের শরীরে সিসার সংস্পর্শে আসার কারণ হতে পারে, তা বোঝার চেষ্টা করেছেন গবেষকেরা।

গবেষণায় পরীক্ষা করা প্রতিটি পাত্র থেকেই রান্না করা খাবারে সিসা নির্গত হয়েছে। নতুন পাত্রে প্রথমবার রান্নার সময় প্রতি কেজি সাদা ভাতে সর্বোচ্চ তিনশত পাঁচ মাইক্রোগ্রাম এবং খিচুড়িতে সর্বোচ্চ চারশত বিশ মাইক্রোগ্রাম সিসা পাওয়া গেছে। তুলনা হিসেবে উল্লেখ করা যায় যে, শিশু ও ছোট শিশুদের খাবারে সিসার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের খাদ্য ও ওষুধ প্রশাসন বা এফডিএ নির্ধারিত নিরাপদ সীমা প্রতি কেজিতে মাত্র দশ মাইক্রোগ্রাম।

বারবার ব্যবহারের ফলে খাবারে সিসার পরিমাণ কিছুটা কমলেও তা কখনোই নিরাপদ সীমার নিচে নেমে আসে না। এমনকি আগে থেকে ব্যবহৃত সাতটি পাত্রের মধ্যে ছয়টিতে রান্না করা ভাতেও সিসার উপস্থিতি পাওয়া গেছে।

পাত্র পরিষ্কারের পদ্ধতিও খাবারে সিসা মিশে যাওয়ার পরিমাণে সরাসরি প্রভাব ফেলে। গবেষণায় দেখা গেছে, নতুন পাত্র স্টিলের তারের মাজুনি দিয়ে ঘষে পরিষ্কার করলে, না ঘষে ব্যবহারের তুলনায় প্রায় পাঁচ গুণ বেশি সিসা খাবারে মিশেছে। এ ছাড়া ধাতব খুন্তি দিয়ে খাবার নাড়লেও সিসা মিশে যাওয়ার পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।

গবেষকেরা নিরাপদ রান্নার পাত্র তৈরিতে ব্যবহৃত ধাতুর মান যথাযথভাবে যাচাই এবং পাত্র ব্যবহারের ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষের মধ্যে সচেতনতা বাড়ানোর ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব আরোপ করেছেন।