নভেম্বর ৫, ২০২৬, ০৮:৪৮ পিএম
নারীর ক্ষমতায়ন, অর্থনৈতিক স্বাধীনতা, শিক্ষা ও নেতৃত্ব বিকাশে সমান সুযোগ নিশ্চিত করার জোর আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সহধর্মিণী ও জিয়াউর রহমান ফাউন্ডেশনের ভাইস প্রেসিডেন্ট ডা. জুবাইদা রহমান। তিনি স্পষ্ট করে বলেছেন যে, নারীর অগ্রগতি কেবল কতজন নারী শীর্ষ পদে পৌঁছেছেন, তা দিয়ে পরিমাপ করা যায় না। বরং আরও কত নারী তাদের অনুসরণ করার সুযোগ পাচ্ছেন, বিভিন্ন সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটের নারীদের জন্য সুযোগ কতটা উন্মুক্ত হচ্ছে এবং তাদের নেতৃত্ব কর্মক্ষেত্র ও সমাজে কতটা ইতিবাচক প্রভাব ফেলছে, তার ওপরই প্রকৃত অগ্রগতি নির্ভর করে।
আজ বৃহস্পতিবার রাজধানীর হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে আয়োজিত ওম্যান লিডারশিপ সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যিক সম্পর্ক সম্প্রসারণের ৩০ বছর পূর্তি উপলক্ষে রাজধানীতে তিন দিনব্যাপী আয়োজিত ৩০তম ইউএস ট্রেড শো’র অংশ হিসেবে এই বিশেষ সেমিনারের আয়োজন করা হয়।
আমেরিকান চেম্বার অব কমার্স ইন বাংলাদেশ বা অ্যামচেম এবং ঢাকায় অবস্থিত মার্কিন দূতাবাস যৌথভাবে এই আলোচনা সভার আয়োজন করে। সেমিনারে নারীর ক্ষমতায়ন, কর্মসংস্থান, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা এবং অর্থনৈতিক অংশগ্রহণের নানা দিক বিস্তারিতভাবে তুলে ধরেন ডা. জুবাইদা রহমান।
বক্তব্যের শুরুতে তিনি জানান, বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার ৫০ দশমিক ৮ শতাংশই নারী। অথচ নানা সামাজিক প্রতিবন্ধকতার কারণে দেশের বিপুলসংখ্যক নারী এখনও মূলধারার অর্থনীতি থেকে পিছিয়ে রয়েছেন। বাল্যবিয়ে, শিক্ষার সুযোগের সীমাবদ্ধতা এবং মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবার অভাব নারীদের সম্ভাবনা বিকাশের পথে সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার বা আইএলও-এর ২০২৫ সালের হিসাব তুলে ধরে তিনি উল্লেখ করেন, বাংলাদেশে শ্রমশক্তিতে নারীদের অংশগ্রহণের হার মাত্র ৩৮ দশমিক ৬ শতাংশ, যেখানে পুরুষদের ক্ষেত্রে এই হার ৮০ দশমিক ৪ শতাংশ। দেশের নব্বই হাজার ৪৯টি গ্রামের কোটি কোটি নারী এখনও অর্থনীতির মূলধারায় পর্যাপ্তভাবে যুক্ত হতে পারছেন না।
শিক্ষাক্ষেত্রে ছাত্রীদের ঝরে পড়ার গুরুতর চিত্র তুলে ধরে তিনি বলেন, ব্যানবেইসের ২০২৩ সালের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, মাধ্যমিক পর্যায়ে ৩৪ দশমিক ৯ শতাংশ এবং উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ে ২২ দশমিক ৫ শতাংশ ছাত্রী পড়াশোনা থেকে ঝরে পড়ে। এছাড়া উচ্চশিক্ষায় নারীদের অংশগ্রহণের হার মাত্র ২০ দশমিক ৮ শতাংশ। তাই বিদ্যালয় থেকে শুরু করে উচ্চশিক্ষা এবং কর্মসংস্থান পর্যন্ত প্রতিটি পর্যায়ে নারীদের জন্য ধারাবাহিক সহায়তা নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি।
জুবাইদা রহমান বলেন, কেবল ডিগ্রি অর্জন করলেই কর্মসংস্থানের প্রকৃত নিশ্চয়তা তৈরি হয় না। নারীদের সাক্ষরতা, বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও ব্যবহারিক দক্ষতায় একটি শক্তিশালী ভিত্তি গড়ে তুলতে হবে। পাশাপাশি প্রশ্ন করা, নতুন কিছু উদ্ভাবন এবং নেতৃত্ব দেওয়ার প্রশস্ত সুযোগ তৈরি করতে হবে।
তিনি আরও বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও তার সরকার স্নাতক পর্যায় পর্যন্ত মেয়েদের অবৈতনিক শিক্ষার বিষয়ে দৃঢ়প্রতিবন্ধক। এর আগে প্রয়াত সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত মেয়েদের শিক্ষা সম্পূর্ণ অবৈতনিক করেছিলেন।
দেশব্যাপী ‘নতুন কুঁড়ি’ ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতাসংক্রান্ত উদ্যোগের কথা উল্লেখ করে এই চিকিৎসক বলেন, এ ধরনের আয়োজন শিশুদের, বিশেষ করে মেয়েদের মধ্যে নেতৃত্বের গুণাবলি বিকাশে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। এর মাধ্যমে তারা উন্নত যোগাযোগ দক্ষতা, দলগত কাজ করার মানসিকতা, শৃঙ্খলা, জবাবদিহিতা, সহমর্মিতা এবং প্রতিকূলতা মোকাবিলার সাহস অর্জন করছে।
নারীর অর্থনৈতিক স্বাধীনতার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে জুবাইদা রহমান বলেন, একজন নারীর নিজস্ব আয়, সঞ্চয় এবং আর্থিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার সক্ষমতা তার ব্যক্তিগত সুযোগ বাড়ানোর পাশাপাশি পরিবারের সামগ্রিক সক্ষমতাকেও শক্তিশালী করে। অর্থনৈতিক স্বাধীনতা কেবল আয়ের বিষয় নয়; বরং নিজের ভবিষ্যৎ নিজে আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে গড়ে তোলার ক্ষমতা। এই লক্ষ্য বাস্তবায়নে `ফ্যামিলি কার্ড` ও `কৃষক কার্ড` কর্মসূচিকে তিনি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ হিসেবে অভিহিত করেন।
স্বাস্থ্যসেবা প্রসঙ্গে তিনি জানান, সরকারের পক্ষ থেকে প্রায় এক লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে, যার ৮০ শতাংশই হবেন নারী। পাশাপাশি নারী ও শিশুর উন্নত স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে ২৫ হাজার পেশাদার মিডওয়াইফ বা প্রসবসঙ্গী নিয়োগের পদক্ষেপের কথাও তুলে ধরেন তিনি।
নারীদের কর্মজীবন নির্বিঘ্ন করতে দেশজুড়ে ডে-কেয়ার সেন্টার বা দিবাযত্ন কেন্দ্র গড়ে তোলার ওপরও জোরালো গুরুত্ব আরোপ করেন জিয়াউর রহমান ফাউন্ডেশনের এই ভাইস প্রেসিডেন্ট। তার মতে, পারিবারিক দায়িত্ব কোনো নারীর ক্যারিয়ার ও পেশাগত অগ্রগতির পথে কখনোই বাধা হওয়া উচিত নয়। কর্মক্ষেত্রে নতুন দক্ষতা অর্জন এবং দীর্ঘ বিরতির পর পুনরায় কাজে ফিরে আসার সুযোগও নারীদের জন্য অবারিত করতে হবে।
প্রযুক্তির দ্রুত পরিবর্তিত বাস্তবতা তুলে ধরে তিনি বলেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই, ডিজিটাল সেবা এবং নতুন প্রযুক্তি কাজের ধরণ পুরোপুরি বদলে দিচ্ছে। এসব ক্ষেত্রে নারীদের সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা গেলে আগামী দিনের অর্থনীতি আরও বেশি অন্তর্ভুক্তিমূলক ও উদ্ভাবনী হয়ে উঠবে।
তিনি বলেন, নারীর অগ্রগতি নিশ্চিত করা কেবল সরকারের একক দায়িত্ব নয়; এর জন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, পরিবার, কর্মক্ষেত্র এবং সমাজের সর্বস্তরের মানুষের সম্মিলিত উদ্যোগ প্রয়োজন। মেয়েদের বড় স্বপ্ন দেখতে উৎসাহিত করার পাশাপাশি শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের মধ্যে একটি কার্যকর সংযোগ তৈরি করতে হবে।
বক্তব্যের শেষ পর্যায়ে জুবাইদা রহমান বলেন, নারীদের অর্জনগুলো যথাযথভাবে উদযাপনের পাশাপাশি তাদের পথকে অহেতুক কঠিন করে তোলা সামাজিক প্রতিবন্ধকতার দেয়ালগুলো ভেঙে ফেলতে হবে। সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টার মাধ্যমেই আকাঙ্ক্ষাকে সুযোগে, সুযোগকে নেতৃত্বে এবং সেই নেতৃত্বকে বাংলাদেশের জন্য এক টেকসই প্রভাবে রূপান্তর করা সম্ভব।
অনুষ্ঠান সফলভাবে আয়োজন করার জন্য আমেরিকান চেম্বার অব কমার্স ইন বাংলাদেশ এবং ঢাকাস্থ মার্কিন দূতাবাসকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানান তিনি। একই সঙ্গে আলোচনা সভায় অংশ নেওয়া মডারেটর ও প্যানেলিস্টদের প্রতিও গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।
মাস্টারকার্ড বাংলাদেশের কান্ট্রি ম্যানেজার জাকিয়া সুলতানার চমৎকার সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে প্যানেল স্পিকার হিসেবে যুক্ত ছিলেন সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী ফারজানা শারমিন। প্যানেলের অন্য বিশিষ্ট সদস্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন ফরেন ইনভেস্টর চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি রুপালী হক চৌধুরী, সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের নির্বাহী পরিচালক ড. নাজনীন আহমেদ, ঢাকা অবস্থিত মার্কিন দূতাবাসের অ্যাক্টিং ডেপুটি চিফ অব মিশন তৃশিতা মোওলা, শেভরন বাংলাদেশের সভাপতি ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক শু শিয়ং এবং ওরাকলের বাংলাদেশ, নেপাল ও ভুটানের কান্ট্রি ম্যানেজিং ডিরেক্টর রুবাবা দৌলা।

দিনাজপুর টিভির সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন