বৃহস্পতিবার, ০৫ নভেম্বর, ২০২৬,

পর্তুগালের প্রতি ভালোবাসা চিরকাল থাকবে: রোনালদো

দিনাজপুর টিভি ডেস্ক

নভেম্বর ৫, ২০২৬, ০৯:৫২ পিএম

পর্তুগালের প্রতি ভালোবাসা চিরকাল থাকবে: রোনালদো

ছবি: সংগৃহীত

পর্তুগালের সাত নম্বর জার্সি গায়ে আন্তর্জাতিক ফুটবলে আর দেখা যাবে না ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোকে। দীর্ঘ ২৩ বছরের পথচলা শেষে জাতীয় দলকে বিদায় জানানোর ঘোষণা দিয়েছেন পর্তুগিজ এই মহাতারকা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত দীর্ঘ এক ভিডিও বার্তায় নিজের ক্যারিয়ার, ঐতিহাসিক গোল, অর্জন আর দেশের জার্সিতে খেলার ত্যাগের কথা স্মরণ করেছেন তিনি। বিদায়বেলায় জানিয়েছেন, সাত নম্বর জার্সি অন্যদের হাতে তুলে দিলেও সেটি পরার গর্ব আজীবন তারই থাকবে।

আসছে ফেব্রুয়ারিতে ৪১ বছরে পা রাখা রোনালদো পর্তুগালের হয়ে মোট ২৩৪টি ম্যাচ খেলেছেন। গোল করেছেন ১৪৬টি। পুরুষদের আন্তর্জাতিক ফুটবলে সর্বোচ্চ ম্যাচ খেলা এবং সর্বোচ্চ গোলের রেকর্ড দুটিই তার দখলে রয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে নেশন্স লিগে কোচ হোর্হে জেসুসের সঙ্গে টানাপোড়েন, দলের অনুশীলন ক্যাম্প ছেড়ে চলে যাওয়া এবং নিষেধাজ্ঞার নানা ঘটনার পর আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে সরে দাঁড়ানোর এই ঘোষণা দিলেন তিনি।

বিদায়ী বার্তায় পর্তুগিজ অধিনায়ক বলেন, পর্তুগালের মানুষের জন্য জাতীয় দলের সাত নম্বর জার্সিটি ফিরিয়ে দেওয়ার সময় এসেছে। জার্সিটি কখনো শুধু নিজের বলে মনে করেননি তিনি। তবে দীর্ঘ ২৩ বছর ধরে এটি পরিধান করার, এর মর্যাদা রক্ষা করার এবং বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের স্টেডিয়ামে গায়ে জড়িয়ে মাঠে নামার সৌভাগ্য ও দায়িত্ব তার হয়েছে। এখন সময় এসেছে এই জার্সি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের হাতে তুলে দেওয়ার। এই সিদ্ধান্ত নেওয়া সহজ ছিল না, কারণ কিছু সিদ্ধান্ত শুধু মাথা দিয়ে নয়, হৃদয়ের অনুভূতি থেকেও নিতে হয়। ২০০৩ সালের আগস্টে যে যাত্রা শুরু হয়েছিল এবং যা তার জীবন চিরতরে বদলে দিয়েছে, তার এবার সমাপ্তি ঘটছে।

জাতীয় দলের স্মৃতিচারণা করতে গিয়ে তিনি আরও বলেন, দলের হয়ে কাটানো অভিজ্ঞতাগুলোর কথা ভাবলে শুধু ম্যাচ, গোল, রেকর্ড কিংবা ট্রফির কথাই মনে পড়ে না। মনে পড়ে সাধারণ মানুষদের কথা। বিদেশে থাকা সেই পর্তুগিজদের কথা মনে পড়ে, যারা ৯০ মিনিটের জন্য হলেও নিজেদের দেশকে একটু বেশি কাছে অনুভব করতে পেরেছেন। লাখো পর্তুগিজ মানুষের কথা স্মরণ করে তিনি জানান, ফুটবল শেষ পর্যন্ত কেবল একটি খেলা নয়, এটি মানুষের জীবনের গল্প।

নিজের সীমাবদ্ধতা ছাড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা সবসময় করেছেন উল্লেখ করে রোনালদো বলেন, জাতীয় দলের ক্যারিয়ারে তিনি সবসময় নিজের সীমা ছাড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছেন। জয়ী হতে চেয়েছেন, সেরা হতে চেয়েছেন এবং ইতিহাস গড়তে চেয়েছেন। নিজের কাছে সবসময় অনেক বেশি প্রত্যাশা রেখেছেন এবং বিশ্বাস করেছেন দল আরও দূরে যেতে পারবে। এই জার্সির জন্য তিনি নিজের সবকিছু উজাড় করে দিয়েছেন।

ক্যারিয়ারের উত্থান-পতনের কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, এমন অনেক বিকেল ও রাত এসেছে যা ছিল নিখুঁত এবং এমন জয় রয়েছে যা কখনো ভোলার নয়। আবার এমন কিছু হারও রয়েছে যা মনে পড়লে এখনো কষ্ট হয়। তিনিও ব্যর্থ হয়েছেন, কষ্ট পেয়েছেন। এমন সময়ও এসেছে যখন পর্তুগালের মানুষ যা চেয়েছেন, তা দিতে পারেননি। কিন্তু কখনো হাল ছাড়েননি। সবচেয়ে বড় কথা, পর্তুগালের প্রতিনিধিত্ব করার গর্ব তিনি কখনো হারাননি।

সময় পেরিয়ে গেলেও মানুষের ভালোবাসাই সবচেয়ে বড় অর্জন বলে মনে করেন রোনালদো। তার মতে, গোলের স্মৃতি একসময় ফিকে হয়ে যায়, ট্রফি জাদুঘরে জায়গা পায় এবং রেকর্ডও একদিন ভেঙে যায়। কিন্তু মানুষের হৃদয়ে তৈরি হওয়া জায়গা সময় কখনো মুছে দিতে পারে না। তার কোনো গোল যদি কাউকে আনন্দ দিয়ে থাকে, আলিঙ্গন করতে সাহায্য করে থাকে কিংবা নিজের দেশ নিয়ে গর্ব অনুভব করিয়ে থাকে, তবে সেটাই তার সবকিছু সার্থক করেছে।

নতুন প্রজন্মের প্রতি আস্থার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, পর্তুগালের সবসময় এমন তরুণদের প্রয়োজন যারা স্বপ্ন দেখতে জানে এবং কখনো হাল ছাড়ে না। সতীর্থদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে রোনালদো বলেন, প্রতিটি দৌড়, প্রতিটি আলিঙ্গন এবং একসঙ্গে উদযাপন করা প্রতিটি জয় ও হারের জন্য তিনি সবার কাছে কৃতজ্ঞ। দলটির অধিনায়ক হওয়ার সৌভাগ্য তার হয়েছিল, কিন্তু কোনো অধিনায়ক একা পথ চলেন না।

কোচ, কর্মকর্তা, চিকিৎসক, ফিজিওথেরাপিস্ট ও কিট ম্যানেজারসহ দলের পেছনে কাজ করা প্রত্যেকের প্রতি ধন্যবাদ জানান তিনি। পাশাপাশি পরিবারের ত্যাগের কথা স্মরণ করে বলেন, তার অনুপস্থিতি এবং জাতীয় দলকে সময় দিতে গিয়ে পরিবারের জন্য নির্ধারিত সময় কম পাওয়ার বিষয়টি পরিবার যেভাবে বুঝেছে, সেজন্য তিনি কৃতজ্ঞ। এতদূর আসা সম্ভব হয়েছে কারণ তারা সবসময় একসঙ্গে পথ চলেছেন।

পর্তুগালের জাতীয় সংগীত বাজার মুহূর্তটিকে জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত মনে রাখবেন জানিয়ে রোনালদো বলেন, গান শুরু হওয়ার মুহূর্তে চারপাশে তাকিয়ে সতীর্থ, গ্যালারি ও দূরদূরান্ত থেকে ছুটে আসা পর্তুগিজদের তিনি দেখেন। সেই কয়েক মিনিটের জন্য সেখানে কোনো ক্লাব, রং, শ্রেণি বা মতভেদ থাকে না; থাকে কেবল একটি আবেগ—সেটি হলো পর্তুগাল। এই অনুভূতি তিনি সারা জীবন বয়ে বেড়াবেন।

বিদায়লগ্নে নিজের শেষ কথায় পর্তুগিজ মহাতারকা জানান, আন্তর্জাতিক ফুটবলে মাঠের সময় শেষ হলেও পর্তুগালের প্রতি তার ভালোবাসা কখনো ফুরোবে না। মাথা উঁচু করে বিদায় নিচ্ছেন এবং জানেন যে দেশের জন্য নিজের সবটুকু দিয়েছেন। মাদেইরার ছোট্ট এক শিশু হিসেবে বলের পেছনে ছুটতে ছুটতে যে স্বপ্ন তিনি দেখেছিলেন, তা বাঁচানোর সুযোগ দেওয়ার জন্য সবাইকে ধন্যবাদ জানান তিনি। সাত নম্বর জার্সিটি থেকে গেলেও তা পরার গর্ব চিরকাল তার সঙ্গেই থাকবে।