শনিবার, ২৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬,

সাহিত্যবিশারদ: জীবনদৃষ্টি ও বিষণ্ণ তিন দশক নিয়ে তিন নোক্তা

দিনাজপুর টিভি ডেস্ক

অক্টোবর ১২, ২০২৫, ০৮:০৯ পিএম

সাহিত্যবিশারদ: জীবনদৃষ্টি ও বিষণ্ণ তিন দশক নিয়ে তিন নোক্তা

ছবি - সংগৃহীত

উনিশ শতকের শেষ ভাগে ব্রিটিশদের পৃষ্ঠপোষকতায় যখন বাংলা সাহিত্যের প্রাচীন সম্পদ উদ্ধারের মহাযজ্ঞ চলছিল, তখন তা সীমাবদ্ধ ছিল মূলত হিন্দু লেখকদের পুঁথি সংগ্রহে। বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষৎ বা কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো প্রতিষ্ঠানগুলোর ছত্রছায়ায় হরপ্রসাদ শাস্ত্রী, দীনেশচন্দ্র সেনের মতো দিকপালেরা যখন গ্রাম থেকে গ্রামে পুঁথি খুঁজছিলেন, তখন তারা মুসলিমদের ঘরে উঁকি দেওয়ার প্রয়োজন বোধ করেননি।

ঠিক সেই সাম্প্রদায়িক ভেদবুদ্ধির যুগে সম্পূর্ণ স্রোতের বিপরীতে দাঁড়িয়েছিলেন একজন আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ (১৮৭১-১৯৫৩)। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা বা পৃষ্ঠপোষকতা—কোনোটিই তার ছিল না। ছিল শুধু বাংলা সাহিত্যের প্রতি অকৃত্রিম ভালোবাসা। তিনিই প্রথম ব্যক্তি, যিনি হিন্দু-মুসলমান নির্বিশেষে পুঁথি সংগ্রহকে জীবনের ব্রত হিসেবে গ্রহণ করেন। কিন্তু পথটা সহজ ছিল না।

মুসলমান হওয়ায় হিন্দুদের পুঁথি সংগ্রহ করতে গিয়ে তাকে নিদারুণ লাঞ্ছনা ও অপমানের শিকার হতে হয়েছে। ‘ম্লেচ্ছ’ অপবাদ শুনেও ঘরের বাইরে দাঁড়িয়ে, পুঁথি স্পর্শ না করে, দূর থেকে দেখে দেখে তিনি পাণ্ডুলিপি নকল করেছেন। এই বৈরী সমাজেও সাহিত্য সংগ্রহকে তিনি ইবাদতের মতোই পবিত্র জ্ঞান করেছিলেন।প্রায় ষাট বছরের দীর্ঘ সাধনায় আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ দুই হাজারের বেশি পুঁথি সংগ্রহ করেছিলেন,

যার মধ্যে স্বতন্ত্র পুঁথির সংখ্যা ছিল প্রায় ১০৮৭টি। তার সংগৃহীত মুসলিম লেখকদের পুঁথির সংখ্যা ছিল ৫৮৫টি এবং হিন্দু লেখকদের পুঁথির সংখ্যা ৪৫০টি। জীবনের শেষ দিকে এসে এই  (অমূল্য) সংগ্রহ তিনি দান করে যান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং রাজশাহীর বরেন্দ্র গবেষণা জাদুঘরে, ভবিষ্যৎ গবেষকদের জন্য। পুঁথি সংগ্রহ ও সম্পাদনার পাশাপাশি তিনি বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় প্রায় ছয় শতাধিক প্রবন্ধ রচনা করেন এবং তার প্রকাশিত-অপ্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা পনেরোর অধিক।

‘আরাকান রাজসভায় বাঙ্গালা সাহিত্য’-এর মতো যুগান্তকারী গবেষণা তার হাত ধরেই এসেছে। তার এই বিপুল কীর্তিই বাংলা সাহিত্যের মধ্যযুগবিষয়ক গবেষণার মূল ভিত্তি স্থাপন করে দিয়েছে।জীবনের সবচেয়ে গৌরবময় কীর্তিগুলো সম্পন্ন করার পরও আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদের শেষ জীবন কেটেছে চরম অবহেলা ও বিষণ্ণতায়। ১৯২১ সালে স্কুল পরিদর্শকের চাকরি থেকে অবসর নেওয়ার পর থেকে ১৯৫৩ সালে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত—এই ৩২টি বছর, অর্থাৎ প্রায় ‘বিষণ্ণ তিন দশক’—তিনি কাটিয়েছেন চট্টগ্রামের পটিয়ায় নিজ গ্রামের বাড়িতে, অনেকটা লোকচক্ষুর আড়ালে এবং আর্থিক অনটনের মধ্যে।

যে সময়ে তার প্রাতিষ্ঠানিক সম্মান ও স্বীকৃতি প্রাপ্য ছিল, সে সময়ে তিনি ছিলেন প্রায় বিস্মৃত। কলকাতায় থাকা তার সমসাময়িক সংগ্রাহকরা যখন প্রাতিষ্ঠানিক আনুকূল্যে জীবনযাপন করেছেন, সাহিত্যবিশারদ তখন নীরবে-নিভৃতে একাই পাণ্ডুলিপি সম্পাদনা ও পাঠোদ্ধারের কাজ করে গেছেন। এই নিঃসঙ্গ সাধনাই ছিল তার শেষ জীবনের সঙ্গী। তার এই আত্মত্যাগ ও বিষণ্ণতাই তাকে বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে এক স্বতন্ত্র ও মহিমান্বিত আসনে বসিয়েছে।