বুধবার, ১৪ অক্টোবর, ২০২৬,

দড়ি বেয়ে মসজিদে যাওয়া সেই প্রবীণ মুয়াজ্জিন আর নেই

দিনাজপুর টিভি ডেস্ক

এপ্রিল ৬, ২০২৬, ০২:৩৬ পিএম

দড়ি বেয়ে মসজিদে যাওয়া সেই প্রবীণ মুয়াজ্জিন আর নেই

নাটোরের বড়াইগ্রাম উপজেলার সবচেয়ে প্রবীণ মানুষ এবং দড়ি বেয়ে মসজিদে যাতায়াতকারী আলোচিত অন্ধ মুয়াজ্জিন আব্দুর রহমান মোল্লা আর নেই। রোববার সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে বড়াইগ্রামের নগর ইউনিয়নের বড়দেহা গ্রামে নিজ বাড়িতে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ১২০ বছর। 

সোমবার সকাল ৯টায় বড়দেহা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় মাঠে জানাজা শেষে স্থানীয় কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়। বার্ধক্যজনিত নানা জটিলতায় ভুগছিলেন এই ধর্মপ্রাণ মানুষটি।

পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, প্রায় ২২ বছর আগে এক মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় নিজের দুই চোখের দৃষ্টিশক্তি হারান আব্দুর রহমান মোল্লা। দৃষ্টিহীন হওয়ার ছয় বছর পর বড় ছেলেকে সঙ্গে নিয়ে তিনি পবিত্র হজ পালন করেন। সৌদি আরব থেকে ফিরে এসে ধর্মীয় কাজে নিজেকে পুরোপুরি সপে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন তিনি। 

নিজের মালিকানাধীন পাঁচ শতাংশ জমির ওপর একটি পাকা মসজিদ নির্মাণ করেন এবং সেই জমি মসজিদের নামে রেজিস্ট্রি করে দেন। এরপর থেকে দৃষ্টিহীন হওয়া সত্ত্বেও সেই মসজিদের মুয়াজ্জিন হিসেবে স্বেচ্ছায় দায়িত্ব পালন শুরু করেন তিনি।বাড়ি থেকে মসজিদের দূরত্ব ছিল প্রায় ২০০ মিটার। দৃষ্টিহীন হওয়ার কারণে যাতায়াতে সমস্যা সৃষ্টি হলে তিনি নিজেই একটি অভিনব পথ খুঁজে বের করেন। তার পরামর্শ অনুযায়ী ছেলেরা বাড়ি থেকে মসজিদ পর্যন্ত রাস্তার ধার দিয়ে বাঁশ ও দড়ি টাঙিয়ে একটি বিশেষ রেলিং তৈরি করে দেন। 

এরপর থেকে দীর্ঘ সময় ধরে তিনি কারো সাহায্য ছাড়াই সেই দড়ি ও বাঁশ ধরে লাঠির সাহায্যে একাকী মসজিদে যাতায়াত করতেন। প্রতিদিন পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের আজান দিতে তার এই অদম্য স্পৃহা পুরো এলাকায় এক বিস্ময় ও অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে দাঁড়িয়েছিল।প্রয়াত আব্দুর রহমানের ছেলে স্কুলশিক্ষক মো. শফিকুল ইসলাম সাইফুল জানান, তার বাবা হজ থেকে ফেরার পর আজান দেওয়ার বিষয়ে খুব একগুঁয়ে ছিলেন। 

দৃষ্টি না থাকলেও তিনি কখনো অন্যের ওপর নির্ভর করতে চাইতেন না। প্রথম দিকে নাতিরা তাকে পথ দেখিয়ে দিলেও পরবর্তীতে তিনি সম্পূর্ণ একা এই পথ পাড়ি দেওয়া আয়ত্ত করেন। লাঠি দিয়ে দড়ি খুঁজে পেলেই তিনি নিশ্চিত হয়ে যেতেন যে তিনি সঠিক পথেই আছেন। তার এই অসাধারণ জীবন যুদ্ধ দেশজুড়ে বিভিন্ন সময়ে আলোচিত হয়েছে।নাটোর-৪ আসনের সংসদ সদস্য ও জেলা বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক আব্দুল আজিজ এই প্রবীণ মুয়াজ্জিনের মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন। 

তিনি বলেন, আব্দুর রহমান মোল্লা ছিলেন বড়াইগ্রামের এক জীবন্ত কিংবদন্তি। দৃষ্টিহীন হয়েও ইসলামের প্রচার ও প্রসারে তিনি যে অদম্য পরিশ্রম করেছেন, তা বর্তমান যুগে বিরল। তার মৃত্যুতে পুরো এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে। স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তি ও ধর্মপ্রাণ মুসল্লিরা তার জানাজায় অংশ নিয়ে বিদেহী আত্মার মাগফেরাত কামনা করেন। যাতায়াতের সেই দড়িটি আজ পড়ে থাকলেও সেখানে আর হাত রাখবেন না সেই অদম্য মুয়াজ্জিন।