রাকিবুল হাসান মুন্না
অক্টোবর ৪, ২০২৫, ০২:৫৩ পিএম
ছবি-দিনাজপুর টিভি
যারা বৃহত্তর নোয়াখালীকে ছোট করে দেখেন, তারা আসলে এই জনপদের ইতিহাস ও ঐতিহ্য সম্পর্কে অজ্ঞ। এই অঞ্চল শিক্ষা, সংস্কৃতি, ব্যবসা ও বাণিজ্যে সমৃদ্ধ, যার গৌরব আজও অটুট। বৃহত্তর নোয়াখালী এগোলে, এগিয়ে যাবে গোটা বাংলাদেশ। কারণ এ অঞ্চলের মানুষের প্রতিষ্ঠিত ব্যবসা-বাণিজ্য দেশের অর্থনীতির চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করছে। শুধু তাই নয়, নোয়াখালীর প্রবাসীরা পৃথিবীর প্রায় সব দেশেই নিজেদের অবস্থান সুদৃঢ় করেছেন। তাঁদের পাঠানো রেমিট্যান্স দেশের অর্থনীতিকে সমৃদ্ধ করে চলেছে। নোয়াখালীর মানুষের এই বিশ্বব্যাপী অবস্থান উপলব্ধি করেই প্রবীণরা গর্বভরে বলেন, "চান্দের দেশে গেলেও নোয়াখালীর মানুষ খুঁজে পাবেন।"
দেশের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ আন্দোলনে নোয়াখালী অঞ্চলের মানুষ অগ্রণী ভূমিকা রেখেছে। ব্রিটিশ শাসন, পাকিস্তান আমল, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ কিংবা ২৪ জুলাইয়ের বিপ্লব—সব আন্দোলনেই এ অঞ্চলের মানুষ সক্রিয় অংশীদার ছিলেন। ইতিহাসে বলা হয়, নোয়াখালী দাঙ্গা না হলে হয়তো পাকিস্তান রাষ্ট্রের জন্মই হতো না। এই অঞ্চল রাজনৈতিক পরিবর্তন ও জাতীয় আন্দোলনের এক অনন্য চালিকা শক্তি হিসেবে কাজ করেছে।
মুক্তিযুদ্ধের সময় নোয়াখালীর বীর সন্তানেরা তাঁদের প্রাণ উৎসর্গ করে দেশের স্বাধীনতার ইতিহাসকে গৌরবান্বিত করেছেন। শহীদ বীর শ্রেষ্ঠ মোহাম্মদ রুহুল আমিন, ভাষা শহীদ আব্দুস সালাম, শহীদ বুদ্ধিজীবী এ.এন.এম. মুনীর চৌধুরী, সেলিনা পারভীন ও শহীদুল্লাহ কায়সার তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য। এছাড়াও, ছাব্বিশের জুলাই বিপ্লবে এ অঞ্চলের কৃতি সন্তানেরা নেতৃত্ব দিয়ে প্রমাণ করেছেন যে তারা কেবল অংশগ্রহণকারী নয়, জাতীয় আন্দোলনের দিশারি।
বাংলাদেশের প্রকাশনা শিল্পের বিকাশে নোয়াখালীর অবদান অনস্বীকার্য। এ অঞ্চলের মানুষই গড়ে তুলেছিলেন দেশের বড় বড় প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান। এই ধারার অন্যতম পথিকৃৎ ছিলেন চিত্তরঞ্জন সাহা, যিনি বাংলাদেশের প্রকাশনা শিল্পের একজন অগ্রদূত এবং বাংলা একাডেমি বইমেলার স্বপ্নদ্রষ্টা। তাঁর হাত ধরেই বাংলাদেশের প্রকাশনা জগতে নতুন দিগন্ত সূচিত হয়। এছাড়াও, নোয়াখালীর চৌমুহনী একসময় ছিল দেশের একটি সক্রিয় ও গুরুত্বপূর্ণ মুদ্রণ ও প্রকাশনা কেন্দ্র।
বাংলাদেশের সাহিত্য, সংস্কৃতি ও শিল্পের অঙ্গনে নোয়াখালীর কৃতি সন্তানদের অবদানও অত্যন্ত গৌরবময়। তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন: মঞ্চ ও টেলিভিশন অভিনেতা আতাউর রহমান, গীতিকার-সুরকার আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুল, শিক্ষাবিদ কবির চৌধুরী ও মোতাহের হোসেন চৌধুরী, সাহিত্যিক সেলিনা হোসেন, এবং নাট্যকার ড. সেলিম আল দীন। এই ব্যক্তিত্বরা তাঁদের জ্ঞান ও শিল্পকর্মের মাধ্যমে সমগ্র বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গনকে সমৃদ্ধ করেছেন।
এই অঞ্চলের মানুষ দেশের শিল্প-বাণিজ্য অঙ্গনে এক অগ্রণী ভূমিকা রেখেছে। এ অঞ্চলের অনেক উদ্যোক্তা আজ দেশের বড় বড় শিল্প প্রতিষ্ঠানের কর্ণধার। তাঁদের প্রতিষ্ঠিত শিল্পপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো, আবুল খায়ের গ্রুপ, পারটেক্স গ্রুপ, বেঙ্গল গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজ ও গ্লোব ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেড।
দেশের আঞ্চলিক জিডিপিতে নোয়াখালীর মানুষের অবদান আজ এক শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করেছে। এই অঞ্চলে বেকারত্বের হার সবচেয়ে কম, যা তাদের কর্মঠ মনোভাব ও উদ্যোগী মানসিকতার প্রমাণ। এই কারণেই নোয়াখালীকে দেশের "এক নাম্বার ধনী জেলা" হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। রাজধানী ঢাকা থেকে শুরু করে বন্দরনগরী চট্টগ্রাম পর্যন্ত সব জায়গায় বৃহত্তর নোয়াখালী অঞ্চলের মানুষ তাঁদের দৃঢ় অবস্থান ও কর্তৃত্ব ধরে রেখেছে।
শুধু ব্যবসা-বাণিজ্য নয়, দেশের প্রশাসন, আমলাতন্ত্র ও রাষ্ট্র পরিচালনার বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদেও এ অঞ্চলের বহু কৃতি সন্তান নেতৃত্ব দিচ্ছেন। তাঁদের দক্ষতা ও অবদানের মাধ্যমে তাঁরা জাতীয় অগ্রযাত্রায় এক উজ্জ্বল অধ্যায় সৃষ্টি করে চলেছেন। তাই বৃহত্তর নোয়াখালী শুধু একটি অঞ্চল নয়; এটি বাংলাদেশের অগ্রগতি, সংস্কৃতি ও ইতিহাসের প্রাণকেন্দ্র। যখন নোয়াখালী এগোবে, তখন সমগ্র বাংলাদেশ এগিয়ে যাবে।