বুধবার, ১৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬,

দিনাজপুরে ২০১ বছরের ঐতিহ্যবাহী বুড়াচিন্তামন ঘোড়ার মেলা

নিজস্ব প্রতিবেদক

এপ্রিল ২৮, ২০২৬, ১২:০৫ এএম

দিনাজপুরে ২০১ বছরের ঐতিহ্যবাহী বুড়াচিন্তামন ঘোড়ার মেলা

ছবি-দিনাজপুর টিভি

দুমকি, সিডর, দুর্বার, বিজলি, কিরণমালা, রানি, সুইটি—এসব কোনো চলচ্চিত্রের চরিত্রের নাম নয়, বরং দিনাজপুরের ফুলবাড়ীতে মেলায় আসা বাহারি সব ঘোড়ার নাম। ঘোড়াগুলোর ক্ষিপ্রতা, বুদ্ধিমত্তা আর দুলকী চলনের বিদ্যুৎগতির ওপর ভিত্তি করেই রাখা হয়েছে এমন গালভরা নাম। আর পছন্দের সেই ঘোড়াটি নিজের করে নিতে ক্রেতাদের মধ্যে চলছে রীতিমতো দর-কষাকষি আর কাড়াকাড়ি। 

দিনাজপুরের ফুলবাড়ী উপজেলার আলাদীপুর ইউনিয়নে শুরু হয়েছে ২০১ বছরের পুরোনো ঐতিহ্যবাহী ‘বুড়াচিন্তামন ঘোড়ার মেলা’।ফুলবাড়ী শহর থেকে প্রায় ৯ কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিমে অবস্থিত এই মেলাটি এখন ক্রেতা-বিক্রেতা ও দর্শনার্থীদের পদচারণায় মুখর। 

দীর্ঘদিনের ঐতিহ্যকে লালন করতে প্রতি বছর বৈশাখ মাসের ৯ অথবা ১০ তারিখ থেকে মাসব্যাপী এই মেলার আয়োজন করা হয়। যদিও মেলাটি এক মাস চলে, তবে গবাদিপশু বিশেষ করে ঘোড়া কেনাবেচার হাট চলে টানা ১০ দিন। স্থানীয়দের কাছে এটি মূলত ‘ঘোড়ার মেলা’ হিসেবেই দেশব্যাপী পরিচিত।

মেলায় গিয়ে দেখা যায়, ক্রেতা ও বিক্রেতার মধ্যে দাম ঠিকঠাক হওয়ার পর পছন্দের ঘোড়াটিকে নিয়ে যাওয়া হয় পাশের খেলার মাঠে। সেখানে ক্রেতাকে ঘোড়ার গতি ও দৌড় পরীক্ষা করে দেখানো হয়। এরপরই চূড়ান্ত হয় লেনদেন। মেলায় ঘোড়া ছাড়াও মহিষ, গরু, ভেড়া ও ছাগল কেনাবেচা হলেও আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকে ঘোড়া। বর্তমানে মেলা প্রাঙ্গণে গ্রামীণ হরেক রকম পণ্যের দোকান, খাবারের দোকান এবং বিনোদনের জন্য নাগরদোলার ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে।

রংপুরের তারাগঞ্জ থেকে মজনু মিয়া নামের এক বিক্রেতা পাঁচটি ঘোড়া নিয়ে মেলায় এসেছেন। তার বড় ঘোড়া ‘নিউপাওয়ার টেন’-এর দাম হেঁকেছেন সাত লাখ টাকা। তিনি জানান, প্রায় সাড়ে পাঁচ লাখ টাকা হলে তিনি এটি বিক্রি করবেন। অন্যদিকে বগুড়া থেকে আসা আজাদ হোসেন নিয়ে এসেছেন ‘সম্রাট’ নামের একটি রেসিং ঘোড়া। লাল রঙের এই ঘোড়াটির দাম চাওয়া হচ্ছে তিন লাখ টাকা। গত ৪০ বছর ধরে এই মেলায় নিয়মিত আসছেন বলে জানান এই বৃদ্ধ বিক্রেতা। গাবাইবান্ধা থেকে আসা ছমেজ উদ্দীনও ২৫ বছর ধরে এই মেলার নিয়মিত বিক্রেতা।

মেলার এই ঐতিহ্য কয়েক পুরুষ ধরে চলে আসছে। স্থানীয় ৭৯ বছর বয়সী অবসরপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মো. দছিম উদ্দীন মন্ডল জানান, লালমনিরহাট, গাইবান্ধা, নীলফামারী, কুড়িগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে এখানে ঘোড়া আমদানি হয়। মেলা কমিটির সভাপতি শিক্ষক আফতাব উদ্দিন স্মৃতিচারণ করে বলেন, এক সময় এই মেলায় নেপাল, ভুটান ও ভারত থেকেও উন্নত জাতের ঘোড়া আসত। বর্তমানে সেই আমেজ কিছুটা কমলেও দেশের অভ্যন্তরীণ ব্যবসায়ীদের কাছে এই মেলার কদর এখনও কমেনি।

আয়োজক কমিটি জানিয়েছে, প্রায় ৮ একর জমির ওপর মেলার স্থায়ী মাঠ রয়েছে। মেলার শৃঙ্খলা রক্ষা এবং বিদ্যুৎ ও পানির সুব্যবস্থা নিশ্চিত করতে প্রায় ২০০ স্বেচ্ছাসেবক কাজ করছেন। মেলায় আসা ব্যবসায়ী ও দর্শনার্থীদের নিরাপত্তায় পুলিশের একটি বিশেষ দল সার্বক্ষণিক নিয়োজিত রয়েছে। ফুলবাড়ী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আ. লতিব শাহ জানিয়েছেন, ঐতিহ্যবাহী এই মেলার নিরাপত্তা নিশ্চিতে প্রয়োজনীয় সব ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। গ্রামীণ ঐতিহ্যের টানে দূর-দূরান্ত থেকে আসা মানুষের ভিড়ে বুড়াচিন্তামন মেলা এখন এক মিলনমেলায় পরিণত হয়েছে।