মে ১, ২০২৬, ১০:২৩ এএম
মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা এবং ক্রমবর্ধমান বৈশ্বিক জ্বালানি ব্যয়ের কারণে দেশের মূল্যস্ফীতিতে নতুন ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। রপ্তানি খাত এখন চাপের সম্মুখীন এবং চলমান জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় সতর্ক নীতিকাঠামো প্রয়োজন বলে মনে করছে পরিকল্পনা কমিশন। গতকাল পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের (জিইডি) এপ্রিলের অর্থনৈতিক হালনাগাদ প্রতিবেদনে এই পর্যবেক্ষণ উঠে এসেছে।
জিইডি বলছে, বৈশ্বিক জ্বালানি মূল্যের ঊর্ধ্বগতি, আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি এবং বিনিময় হারের চাপ উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যবস্থায় ব্যয় বাড়াচ্ছে। এর ফলে মূল্যস্ফীতি পুনরায় ঊর্ধ্বমুখী হতে পারে। মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলের চলমান উত্তেজনা পরিস্থিতিকে আরও অনিশ্চিত করে তুলেছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৬ সালের মার্চ মাসে সামগ্রিক মূল্যস্ফীতি কমে ৮ দশমিক ৭১ শতাংশে দাঁড়িয়েছে, যা ফেব্রুয়ারি মাসে ছিল ৯ দশমিক ১৩ শতাংশ। এই হ্রাস মূলত খাদ্য মূল্যস্ফীতির কমার ফল। মার্চে খাদ্য মূল্যস্ফীতি ৮ দশমিক ২৪ শতাংশে নেমে আসে, যা আগের মাসে ছিল ৯ দশমিক ৩০ শতাংশ। বিপরীতে খাদ্যবহির্ভূত খাতে মূল্যস্ফীতি ৯ দশমিক ০৯ শতাংশে অবস্থান করছে।
খাদ্য খাতে কিছুটা স্বস্তির প্রধান কারণ হিসেবে চালের দাম কমাকে চিহ্নিত করেছে জিইডি। বোরো মৌসুমের নতুন সরবরাহ, আমদানি বৃদ্ধি এবং উন্মুক্ত বাজারে সরকারের বিক্রয় কার্যক্রম (ওএমএস) চালের দাম কমাতে ভূমিকা রেখেছে। তবে মাংস, মাছ ও সবজির দাম এখনো উচ্চ পর্যায়ে রয়ে গেছে। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, মজুরি বৃদ্ধির হার মূল্যস্ফীতির তুলনায় কম থাকায় সাধারণ মানুষের বাস্তব আয় এখনো চাপের মধ্যে রয়েছে। মার্চে মজুরি প্রবৃদ্ধি ৮ দশমিক ০৯ শতাংশে উঠলেও তা মূল্যস্ফীতির হারের নিচে অবস্থান করছে।
ব্যাংকিং খাতে আমানত প্রবৃদ্ধি অব্যাহত থাকলেও সরকারি খাতে ঋণ গ্রহণের পরিমাণ দ্রুত বেড়েছে। ফেব্রুয়ারিতে সরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি ২৯ দশমিক ৬১ শতাংশে পৌঁছেছে, যা সাম্প্রতিক সময়ের মধ্যে সর্বোচ্চ। রাজস্ব আদায়ের ক্ষেত্রেও লক্ষ্যমাত্রা পূরণে বড় ঘাটতি লক্ষ করা গেছে। মার্চে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৫৩ হাজার ২৯০ কোটি টাকা, যার বিপরীতে আদায় হয়েছে ৩৩ হাজার ৫২১ কোটি টাকা।
উন্নয়ন প্রকল্পের ব্যয়েও ধীরগতি লক্ষ্য করা গেছে। জুলাই-মার্চ সময়ে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) বাস্তবায়ন গত বছরের একই সময়ের তুলনায় কমেছে। প্রকল্প বাস্তবায়নে বিলম্ব, অর্থায়ন সীমাবদ্ধতা ও প্রশাসনিক জটিলতাকে এর কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
বৈদেশিক খাতের তথ্যে দেখা যায়, রেমিট্যান্স বা প্রবাসী আয় প্রবাহ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে, যা বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ স্থিতিশীল রাখতে সহায়তা করছে। জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত ধারাবাহিকভাবে প্রবাসী আয় বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে রপ্তানি খাতের চিত্র কিছুটা উদ্বেগের। ২০২৬ সালের প্রথম প্রান্তিকে রপ্তানি প্রবৃদ্ধি ধারাবাহিকভাবে কমেছে এবং মার্চ মাসে তা ঋণাত্মক ১৮ দশমিক ০৭ শতাংশে নেমে এসেছে। বৈশ্বিক চাহিদা হ্রাস ও উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি এর পেছনে প্রধান ভূমিকা রাখছে।
প্রতিবেদনের সারসংক্ষেপে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক মূল্যস্ফীতিতে যে সামান্য নিম্নগতি দেখা গেছে তা মূলত চালের দামের কারণে। তবে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা ও অভ্যন্তরীণ ব্যয় বৃদ্ধির কারণে মূল্যস্ফীতির ঝুঁকি এখনো বহাল রয়েছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় সতর্ক ও সমন্বিত নীতিগত পদক্ষেপের প্রয়োজন বলে জানিয়েছে জিইডি।


দিনাজপুর টিভির সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন