জুন ২২, ২০২৬, ১০:৫৭ এএম
তীব্র জ্বালানি সংকট, ব্যাংক ঋণের আকাশচুম্বী সুদের হার এবং অভ্যন্তরীণ বাজারের মন্দার চাপে দেশের শিল্প খাত গভীর সংকটে পড়েছে। উচ্চ উৎপাদন ব্যয় ও প্রযুক্তিগত আধুনিকায়নের অভাবে বৈশ্বিক বাজারেও ক্রমাগত প্রতিযোগিতা হারাচ্ছে দেশীয় পণ্য। নতুন বিনিয়োগ থমকে যাওয়ার পাশাপাশি সচল কারখানাগুলোর উৎপাদন ক্ষমতা ইতিমধ্যে নেমে এসেছে অর্ধেকের নিচে। একদিকে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগী দেশগুলোর কাছে নিজেদের হিস্যা হারানো, অন্যদিকে দেশীয় বাজারে লোকসানের দ্বিমুখী চাপে ব্যবসায় টিকে থাকার কঠিন সংগ্রাম করছেন উদ্যোক্তারা।
কর্মসংস্থান সংকোচন এবং শিল্পায়নে স্থবিরতার এই ধারাবাহিকতা সামগ্রিক অর্থনীতিকে এক দীর্ঘমেয়াদি সংকটের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, বর্তমান সংকটের অনেক শেকড় জুলাই বিপ্লবে ক্ষমতাচ্যুত হওয়া বিগত সরকারের আমলেই তৈরি হয়েছিল। কয়েক বছর ধরে চলা উচ্চ মূল্যস্ফীতি, ডলার সংকট, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ হ্রাস, ব্যাংকিং খাতের অনিয়ম এবং नीतिগত বা নীতিগত অসঙ্গতির কারণে দেশের শিল্প খাত দুর্বল হয়ে পড়ে।
দেশের শিল্পাঞ্চলগুলোতে এখন সবচেয়ে বড় হাহাকার চলছে গ্যাস ও বিদ্যুতের জন্য। সাভার, আশুলিয়া, গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জের শিল্প এলাকাগুলোতে পর্যাপ্ত গ্যাসের চাপ না থাকায় দিনের বড় অংশ জুড়েই উৎপাদন বন্ধ রাখতে হচ্ছে। বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের তথ্য অনুযায়ী, অনেক কারখানায় গ্যাসের চাপ ১৫ পিএসআই থাকার কথা থাকলেও মিলছে মাত্র ১ থেকে ২ পিএসআই, যার ফলে স্বয়ংক্রিয় যন্ত্রাংশগুলো চালু করাই সম্ভব হচ্ছে না।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর শিল্প উৎপাদন সূচক বিশ্লেষণে দেখা যায়, দেশের বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ শিল্পে উৎপাদন উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে। বিগত অর্থবছরে ওয়েভিং টেক্সটাইল খাতে উৎপাদন কমেছে ২৯ দশমিক ৩১ শতাংশ, জুট টেক্সটাইলে ৩৫ দশমিক ৫০ শতাংশ এবং ওষুধ শিল্পে ১০ দশমিক ৮১ শতাংশ। এ ছাড়া সিমেন্ট ও ফল প্রক্রিয়াজাত শিল্পেও বড় পতন লক্ষ্য করা গেছে। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কেন্দ্রীয় ব্যাংক সুদের হার বাড়ানোয় উচ্চ সুদে ঋণ নিয়ে নতুন বিনিয়োগে যাচ্ছেন না ব্যবসায়ীরা।
ফলে চলতি বছরের মার্চ শেষে ব্যাংক খাতে অতিরিক্ত তারল্য বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩ লাখ ৭৮ হাজার ১৩৫ কোটি টাকায়, যা এক বছর আগের তুলনায় ৫৮ দশমিক ৩১ শতাংশ বেশি হলেও তা উৎপাদন খাতে ব্যবহৃত হচ্ছে না।দেশের প্রধান রপ্তানি খাত তৈরি পোশাক শিল্পেও এই জ্বালানি সংকটের কারণে বড় ধরনের ধস চলছে। বাংলাদেশ গার্মেন্টস... অ্যাসোসিয়েশনের তথ্যমতে, অঞ্চলভেদে পরিস্থিতির তারতম্য থাকলেও পোশাক খাতের মোট উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত হ্রাস পেয়েছে। গ্যাসের স্বল্পচাপ ও বিদ্যুৎ ঘাটতি মোকাবিলায় কারখানাগুলোকে চড়া মূল্যের বিকল্প জ্বালানির ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে, যা উৎপাদন ব্যয় বাড়িয়ে বৈশ্বিক বাজারে প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশকে পিছিয়ে দিচ্ছে।
অন্যদিকে সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও পরিবেশগত মানদণ্ড পূরণে ব্যর্থতা ও সাভারের ট্যানারি শিল্পনগরীর কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগার কার্যকর না হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজার হারাচ্ছে চামড়াশিল্প।রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর প্রকাশিত সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের মে মাসে বাংলাদেশ থেকে ৪৪০ কোটি ২৭ লাখ ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়েছে, যা আগের বছরের একই মাসের তুলনায় ৭ দশমিক ০৭ শতাংশ কম।
বাংলাদেশ যখন অভ্যন্তরীণ সংকটে জর্জরিত, তখন ভিয়েতনাম, ভারত, পাকিস্তান ও কম্বোডিয়া নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সুবিধার জোরে বিশ্ববাজারের বড় অংশ দখল করে নিচ্ছে। বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানির শীর্ষ দশটি দেশের মধ্যে ৯টি দেশেই রপ্তানি আশঙ্কাজনকভাবে কমেছে। দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নিয়ে শিল্পে নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা না গেলে দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতে এর দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা।

দিনাজপুর টিভির সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন