অক্টোবর ৮, ২০২৬, ০৩:৩৪ পিএম
বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে অর্থনীতির সামগ্রিক চিত্রে বড় ধরনের শঙ্কার সংকেত পাওয়া গেছে। কর্মসংস্থান হ্রাস, দারিদ্র্য বৃদ্ধি, প্রবৃদ্ধির শ্লথগতি, তীব্র জ্বালানি ঘাটতিতে উৎপাদন স্থবিরতা এবং ব্যাংক খাতের দুর্বলতাসহ প্রধান সূচকগুলোর অবনমন দেশের বাণিজ্যকে গভীর সংকটের মুখে ফেলেছে। সম্প্রতি প্রকাশিত আন্তর্জাতিক আর্থিক সংস্থাটির এই মূল্যায়ন ঘিরে নীতি-নির্ধারক ও অর্থনীতিবিদদের মাঝে জোরালো বিতর্ক শুরু হয়েছে।
সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশের প্রকৃত মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপি প্রবৃদ্ধি নেমে এসেছে ৩ দশমিক ৪ শতাংশে।
অর্থবছরের তৃতীয় প্রান্তিকে এই প্রবৃদ্ধি আরও কমে দাঁড়ায় ২ দশমিক ২ শতাংশে, যা করোনা মহামারির পর যেকোনো প্রান্তিকে সর্বনিম্ন। অথচ ২০২২-২৩ অর্থবছরেও এই বৃদ্ধির হার ছিল ৫ দশমিক ৮ শতাংশ। সরকারি বিনিয়োগ শূন্য দশমিক ৭ শতাংশ এবং বেসরকারি বিনিয়োগ শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ সংকুচিত হওয়াকেই এর প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে সংস্থাটি। এছাড়া পণ্য ও সেবার প্রকৃত রপ্তানি কমেছে ৪ দশমিক ৮ শতাংশ।
তীব্র গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটের কারণে অধিকাংশ শিল্প কারখানা তাদের সক্ষমতার তুলনায় অনেক কম উৎপাদন করতে বাধ্য হয়েছে।
ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইয়ের প্রশাসক ও বিকেএমইএর সাবেক সভাপতি ফজলুল হক জানান, বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনের তথ্যের সাথে দ্বিমত পোষণের সুযোগ কম। প্রবৃদ্ধির সংখ্যা নিয়ে বিতর্ক থাকলেও বিনিয়োগ ও উৎপাদন পরিস্থিতির মূল্যায়ন বাস্তবভিত্তিক। তিনি বলেন, কর্মসংস্থান বাড়াতে নতুন গ্যাসক্ষেত্রগুলোর দ্রুত ব্যবহার ও নীতিমালার সংস্কার প্রয়োজন। যেসব খাতে জ্বালানি নির্ভরতা কম, সেখানে নতুন বিনিয়োগ আকৃষ্ট করার ওপর তিনি জোর দেন। একই সাথে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির দৃশ্যমান উন্নতি এবং ব্যাংকগুলোর রক্ষণশীল মনোভাব পরিবর্তনের আহ্বান জানান তিনি।
অর্থনীতির অভ্যন্তরীণ সংকট নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সাবেক চেয়ারম্যান ড. মোহাম্মদ আবদুল মজিদ।
তিনি উল্লেখ করেন, রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর সবাই আশা করেছিল আস্থা ফিরে আসবে এবং বেসরকারি খাত চাঙা হবে, কিন্তু সেই সুফল এখনো মেলেনি। পুরো প্রশাসন পুনর্গঠন ও আমূল সংস্কার ছাড়া বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়। শ্রীলঙ্কা কিংবা নেপাল সংকট কাটিয়ে উঠলেও বাংলাদেশ পিছিয়ে পড়ছে। তিনি বলেন, দুর্নীতি ও ব্যবসায়িক খরচ না কমলে নতুন পুঁজি আসবে না। সিন্ডিকেটের শুধু সাইনবোর্ড পরিবর্তন হয়েছে, কাজের কোনো কাঠামোগত উন্নতি হয়নি।
আমেরিকান চেম্বারের (অ্যামচেম) সাবেক সভাপতি সৈয়দ এরশাদ আহমেদ বিনিয়োগ পরিস্থিতির প্রতিকূলতা তুলে ধরেন।
তিনি স্পষ্ট করেন, দেশে বর্তমানে বিনিয়োগের পরিবেশ অনুকূলে নেই। সবার আগে আইন-শৃঙ্খলা ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে হবে। বারবার রাজনৈতিক অস্থিরতা বা আন্দোলনের হুমকি চলতে থাকলে অর্থনীতি টিকিয়ে রাখা অসম্ভব হয়ে পড়বে। তিনি বলেন, বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে বিদ্যুৎ-জ্বালানির নিরবচ্ছিন্ন প্রবাহ, অবকাঠামোগত সক্ষমতা এবং সমুদ্রবন্দরগুলোকে কার্যকর করতে হবে।
প্রতিবেদনের পর্যালোচনায় শিল্প খাতের অস্বাভাবিক সংকোচনের বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে।
২০২৫-২৬ অর্থবছরে শিল্প খাতে প্রবৃদ্ধি হয়েছে মাত্র প্রায় ২ শতাংশ, যেখানে তৃতীয় প্রান্তিকে উৎপাদন সংকুচিত হয়েছে শূন্য দশমিক ৩ শতাংশ। মোট গ্যাস চাহিদার প্রায় এক-তৃতীয়াংশ এখন আমদানি করতে হচ্ছে। মহেশখালীর ভাসমান টার্মিনাল ও নির্দিষ্ট কিছু বড় খনির ওপর একক নির্ভরতার কারণে একটি অবকাঠামো বিঘ্নিত হলেই সারাদেশে তীব্র সংকট তৈরি হচ্ছে।
মূল্যস্ফীতির চাপে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা চরম ঝুঁকিতে পড়েছে।
গড় মূল্যস্ফীতি আগের অর্থবছরের ১০ শতাংশ থেকে কমে গত অর্থবছরে ৮ দশমিক ৭ শতাংশ এবং আগস্টে ৮ দশমিক ৩ শতাংশে নামলেও নিত্যপণ্যের বাজার নিয়ন্ত্রণে আসেনি। এর ফলে দারিদ্র্যের হার টানা চতুর্থ বছরের মতো বৃদ্ধি পেয়ে আনুমানিক ২২ দশমিক ৫ শতাংশে পৌঁছেছে। গত এক বছরে নতুন করে প্রায় ২১ লাখ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে গেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট ইউনিভার্সিটি অব নিউইয়র্কের অধ্যাপক ড. বিরূপাক্ষ পাল পরিস্থিতিকে মহামারির সময়ের চেয়েও খারাপ বলে মন্তব্য করেছেন।
তিনি জানান, স্বাভাবিক রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে প্রবৃদ্ধি এভাবে মুখ থুবড়ে পড়া চরম উদ্বেগের বিষয়। তিনি বলেন, অর্থনীতি ও রাজনীতিকে আলাদা করে দেখার কৌশলগত ভুলের কারণে কর্মসংস্থান তৈরি হয়নি এবং বন্ধ কারখানার জন্য রাখা ৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা রাজনৈতিক পক্ষপাতের কারণে কাজে আসেনি। সরবরাহ শৃঙ্খলা রাজনৈতিক অপরিপক্বতায় বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। সংকট থেকে উত্তরণে তিনি তিনটি পদক্ষেপের প্রস্তাব দেন: করণীয় নির্ধারণে সুনির্দিষ্ট প্রস্তুতি বা রিভিশন, প্রয়োজনীয় কাঠামোগত সংস্কার এবং ব্যবসায়ী সম্প্রদায়কে সাথে নিয়ে সমন্বিত অর্থনৈতিক উদ্যোগ গ্রহণ।
ব্যাংকিং খাতের ভঙ্গুরতাকে অর্থনীতির অন্যতম মারাত্মক ঝুঁকি হিসেবে চিহ্নিত করেছে বিশ্বব্যাংক।
২০২৪ সালের ডিসেম্বরে ২০ দশমিক ২ শতাংশে থাকা খেলাপি ঋণ ২০২৬ সালের জুনে বৃদ্ধি পেয়ে ৩৩ দশমিক ২ শতাংশে পৌঁছেছে। ইসলামী ব্যাংকগুলোতে এই হার দাঁড়িয়েছে ৫৮ দশমিক ৯ শতাংশ এবং রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোতে ৪৩ দশমিক ২ শতাংশে। ব্যাংকগুলোর সার্বিক মূলধন ঘাটতি ঋণাত্মক ২ দশমিক ৬ শতাংশে নেমেছে, যেখানে ন্যূনতম আন্তর্জাতিক বাধ্যবাধকতা ১০ শতাংশ।
পরিসংখ্যানে দেখা যায়, গত জুনে বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধি নেমেছে মাত্র ৪ দশমিক ৫ শতাংশে, যা গত ৩৩ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন।
বিপরীতে সরকারি খাতের ব্যাংক ঋণ বেড়েছে ৩০ দশমিক ৪ শতাংশ হারে। অর্থাৎ ব্যাংকের সমুদয় অর্থ সরকারের ব্যয় নির্বাহে ব্যবহৃত হচ্ছে, কিন্তু ব্যক্তি বা শিল্প খাতে নতুন ঋণ প্রবাহ সম্পূর্ণ স্থবির। এর ফলে রাজস্ব আহরণও নেমে এসেছে জিডিপির মাত্র ৮ দশমিক ৩ শতাংশে, যা বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে অন্যতম সর্বনিম্ন এবং এতে বাজেট ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৩ দশমিক ৯ শতাংশে। নতুন বিদেশি বিনিয়োগ ১৫ শতাংশ কমে ১ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলারে নেমেছে এবং নতুন ইকুইটি কমেছে ৭০ দশমিক ৩ শতাংশ।
সব সূচকের চরম অবনমনের মধ্যেও একমাত্র প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স অর্থনীতিকে কিছুটা স্বস্তি জুগিয়েছে।
চরম সংকটের মধ্যেও গত অর্থবছরে রেকর্ড ৩৫ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলার প্রবাসী আয় দেশে এসেছে, যা বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ সুরক্ষায় বড় অবদান রেখেছে। তবে এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান ড. আবদুল মজিদ সতর্ক করে বলেন, আড়াই শতাংশ প্রণোদনার সুযোগ নিতে পাচার করা অর্থ রেমিট্যান্সের মোড়কে ফিরে আসছে কি না, তাও নজরদারিতে আনা প্রয়োজন।

দিনাজপুর টিভির সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন