জুন ১৬, ২০২৬, ০৪:০৯ পিএম
দিনাজপুরের হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষক রাসায়নিক সারের ব্যবহার ব্যাপক হারে কমিয়ে বিষমুক্ত সবজি উৎপাদনে অসামান্য সাফল্য অর্জন করেছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের বায়োকেমিস্ট্রি অ্যান্ড মলিকুলার বায়োলজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আজিজুল হক এন্ডোফাইটিক ব্যাকটেরিয়া ব্যবহারের মাধ্যমে এই নতুন পরিবেশবান্ধব চাষ পদ্ধতি উদ্ভাবন করেছেন।
এই প্রযুক্তির ফলে সবজির ফলন প্রভূত বৃদ্ধির পাশাপাশি চাষের খরচও উল্লেখযোগ্যভাবে কমে এসেছে।গবেষণাগার থেকে মাঠপর্যায়ে স্থানান্তরিত এই বিশেষ প্রযুক্তিটি ইতিমধ্যেই স্থানীয় কৃষকদের মাঝে ব্যাপক সাড়া ফেলেছে।ড. আজিজুল হকের গবেষণা অনুযায়ী, জমি থেকে সংগৃহীত এন্ডোফাইটিক ব্যাকটেরিয়া বিশেষভাবে আইসোলেশন বা পৃথকীকরণ করে টমেটো গাছে ৪ থেকে ৫ বার স্প্রে করা হয়। চারা রোপণের পর জমিতে কোনো বাড়তি রাসায়নিক সার প্রয়োগ না করে এই ব্যাকটেরিয়াল কনসোর্টিয়া ব্যবহার করলে ইউরিয়া ও ফসফরাসের মতো সারের ব্যবহার ৫০ থেকে ৮০ শতাংশ পর্যন্ত কমিয়ে আনা সম্ভব।
এই উপকারী ব্যাকটেরিয়াগুলো প্রাকৃতিকভাবে ক্ষতিকর কীটনাশক খেয়ে নিজেদের বংশবৃদ্ধি করে এবং মাটির ক্ষতিকর উপাদানের উচ্চ ঘনমাত্রা ৯০ শতাংশ পর্যন্ত কমিয়ে ফেলে। এর ফলে জমিতে গাছের জন্য উপকারী উপাদানের আধিক্য দেখা যায় এবং ফসফেট, অর্গানিক কার্বন, পটাশিয়াম ও সালফারের পরিমাণ প্রাকৃতিকভাবেই বৃদ্ধি পায়।বিগত দেড় বছর ধরে দিনাজপুর সদর, চিরিরবন্দর ও সেতাবগঞ্জ উপজেলার ১০টি পরীক্ষামূলক মাঠে এই ব্যাকটেরিয়াল কনসোর্টিয়া নিয়ে শীতকালীন ও গ্রীষ্মকালীন টমেটো চাষের সফল ট্রায়াল সম্পন্ন করা হয়েছে।
গবেষণায় দেখা গেছে, সাধারণ কীটনাশকযুক্ত গাছের তুলনায় এই ব্যাকটেরিয়া প্রয়োগ করা টমেটো গাছগুলো আকারে অনেক বড়, অধিক সবুজ এবং এর ফলন প্রায় দুই থেকে তিনগুণ বেশি। এছাড়া উৎপাদিত সবজি সম্পূর্ণ বিষমুক্ত, সুস্বাদু এবং লাইকোপেন, ফ্লাভোনয়েড ও প্রয়োজনীয় অ্যামিনো অ্যাসিড সমৃদ্ধ হয়। অতি সম্প্রতি দিনাজপুরে গত ৫০ দিনে হওয়া নিয়মিত মাঝারি ও ভারী ঝড়-বৃষ্টির মধ্যেও এই প্রযুক্তিতে চাষ করা গাছগুলো চমৎকার আবহাওয়া সহনশীলতা প্রদর্শন করেছে এবং কোনো গাছ নেতিয়ে পড়েনি।
চলতি বছরের ১০ ফেব্রুয়ারি ১০৫ শতকের একটি মাঠে চারা রোপণ করে পরিচালিত এক তুলনামূলক পর্যালোচনায় দেখা গেছে, প্রথাগত পদ্ধতিতে চাষ করতে গিয়ে কৃষকদের ৪৮ দিনে প্রায় ৪০ বার কীটনাশক ছিটানোসহ ২০ হাজার টাকা অতিরিক্ত খরচ করতে হয়েছে। পক্ষান্তরে এই ব্যাকটেরিয়া প্রযুক্তি ব্যবহার করা ৪টি মাঠে কোনো ধরনের বালাইনাশক বা ছত্রাকনাশক ছিটানোর প্রয়োজনই হয়নি, যার ফলে মাটির গুণগত মান ও মাইক্রোবিয়াল বায়োডাইভারসিটি অক্ষুণ্ন রয়েছে। টমেটোর পাশাপাশি সাথী ফসল হিসেবে আখ চাষেও এই ব্যাকটেরিয়া অভাবনীয় সাফল্য দেখিয়েছে, যেখানে প্রচলিত ব্যবস্থার চেয়ে মাত্র ১ বিघा জমির আখের চিনি উৎপাদন আড়াই বিঘা জমির সমান হয়েছে।
এই পরিবেশবান্ধব ও সাশ্রয়ী কৃষি প্রযুক্তি দেশব্যাপী ছড়িয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে আমাদের জাতীয় সচেতনতা ও সরকারি কাঠামোগত কিছু সীমাবদ্ধতা এখনও বিদ্যমান রয়েছে। বর্তমানে কেবল একটি জেলাতেই এই ট্রায়াল সীমাবদ্ধ থাকায় উৎপাদিত এই বিশেষ সবজি সাধারণ বাজারের অন্যান্য পণ্যের সাথেই বিক্রি হচ্ছে, যার ফলে সাধারণ ভোক্তারা এর পুষ্টিগুণ সম্পর্কে জানতে পারছেন না। উদ্ভাবিত এই আধুনিক জৈব প্রযুক্তিটি সরকারিভাবে চূড়ান্ত অনুমোদন লাভ করলেই মাঠপর্যায়ে দেশের প্রান্তিক কৃষকদের মাঝে তা দ্রুত ছড়িয়ে দেওয়া সম্ভব হবে বলে আশা প্রকাশ করেছেন সংশ্লিষ্ট গবেষক।

দিনাজপুর টিভির সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন