অক্টোবর ২৩, ২০২৫, ০৭:০০ পিএম
এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের সাম্প্রতিক আন্দোলনের সময় ক্লাস বর্জনের কারণে শিক্ষার্থীদের যে পাঠদানের ক্ষতি হয়েছে, তা পুষিয়ে নিতে শনিবার ক্লাস নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছিলেন শিক্ষক নেতারা। তবে এই ঘোষণা নিয়ে শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে বেশ কিছু বিভ্রান্তি দেখা দেয়। বিশেষ করে, শনিবারের সাপ্তাহিক ছুটি বাতিল হয়ে গেল কিনা এবং কতদিন ধরে এই শনিবার ক্লাস চলবে – এসব প্রশ্ন ওঠে।
এই বিভ্রান্তি দূর করতে এবং নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করতে বৃহস্পতিবার ফেসবুক লাইভে এসে বিস্তারিত ব্যাখ্যা দিয়েছেন এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারী জোটের সদস্য সচিব অধ্যক্ষ দেলোয়ার হোসেন আজিজী। তিনি জানিয়েছেন, বার্ষিক পরীক্ষার আগে মাত্র চারটি শনিবার ক্লাস নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে এবং এটি শিক্ষকদের ‘বিবেকের তাড়না’ থেকেই নেওয়া একটি স্বেচ্ছামূলক পদক্ষেপ।
অধ্যক্ষ দেলোয়ার হোসেন আজিজী তার ফেসবুক লাইভে স্পষ্ট করে বলেন, আগামী ২০ নভেম্বর থেকে স্কুল ও মাদ্রাসায় বার্ষিক পরীক্ষা শুরু হতে যাচ্ছে। হিসেব অনুযায়ী, এর আগে শিক্ষকরা ক্লাস নেওয়ার জন্য মাত্র চারটি শনিবার পাচ্ছেন। তাই তিনি সকল এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীকে এই চারটি শনিবার ক্লাস নেওয়ার জন্য উদাত্ত আহ্বান জানান। তিনি মনে করিয়ে দেন, বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কর্মরত এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের বাড়িভাড়া বৃদ্ধিসহ বিভিন্ন ন্যায্য দাবির আন্দোলনে এদেশের সাধারণ জনগণ শিক্ষকদের পাশে ছিলেন।
সেই জনগণের প্রতি দায়বদ্ধতা থেকে এবং তাদের সন্তানদের শিক্ষার ক্ষতি পুষিয়ে দেওয়ার লক্ষ্যেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। আজিজী বলেন, এটি শিক্ষকদের নৈতিক দায়িত্ব ও কর্তব্য।শনিবার ক্লাস নেওয়া নিয়ে শিক্ষকদের মধ্যে যে শঙ্কা তৈরি হয়েছিল, সে বিষয়েও কথা বলেন আজিজী। তিনি বলেন, “শনিবার ক্লাস খোলা রাখার বিষয়ে অনেকে আশঙ্কা প্রকাশ করছেন যে, একবার শনিবার খোলা রাখলে, পরে হয়তো স্থায়ীভাবে খোলা রাখতে হবে নাকি। এটা নিয়ে কোনো আশঙ্কা বা ভয়ের কারণ নেই।”
তিনি জোর দিয়ে বলেন, এই সিদ্ধান্ত শিক্ষা মন্ত্রণালয় বা সরকারের পক্ষ থেকে চাপিয়ে দেওয়া কোনো সিদ্ধান্ত নয়। বরং, “আমরাই বিবেকের তাড়নায় শিক্ষার্থীদের প্রতি আমাদের ভালোবাসা ও দায়বদ্ধতা থেকে শনিবার ক্লাস নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছি।” তিনি মনে করেন, এই ত্যাগের মাধ্যমে শিক্ষকরা জাতির কাছে প্রমাণ করতে চান যে, তারা কেবল নিজেদের দাবির জন্যই অনড় নন, বরং শিক্ষার্থীদের প্রতিও তাদের অগাধ ভালোবাসা ও দায়িত্ববোধ রয়েছে। তিনি যোগ করেন, “আজ আপনারা যদি এই সামান্য ত্যাগ স্বীকার না করেন, তাহলে আগামী দিনে কোনো আন্দোলনে গেলে জাতি আমাদের পাশে দাঁড়াবে না।”
এই শিক্ষক নেতা কেবল আহ্বান জানিয়েই ক্ষান্ত হননি, যারা এই সিদ্ধান্ত মানবেন না তাদের প্রতি কড়া হুঁশিয়ারীও উচ্চারণ করেছেন। তিনি বলেন, কোনো কোনো প্রতিষ্ঠান হয়তো এই চারটি শনিবার ক্লাস না-ও নিতে পারে। কিন্তু বিষয়টি জোটের পক্ষ থেকে কঠোরভাবে তদারকি করা হবে। আজিজী বলেন, “যারা শনিবার খোলা রাখবেন না, তা তদারকি করা হবে। যারা এ কাজ করবেন, তাদের বিরুদ্ধে জোটের পক্ষ থেকে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
তিনি চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানিয়ে বলেন, “আমি আবারও বলছি, স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা ও কারিগরি – সকল এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আগামী ২০ নভেম্বর পর্যন্ত কোনো শনিবার বন্ধ থাকবে না। এটা আমাদের এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারী জোটের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত। সারা দেশে খোঁজখবর নেওয়া হবে। যারা নিয়ম মানবে না, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
উল্লেখ্য, এমপিওভুক্ত শিক্ষকরা মূল বেতনের ২০ শতাংশ বাড়িভাড়া ভাতা প্রদানসহ তিনটি প্রধান দাবিতে আন্দোলন করেছিলেন। আন্দোলনের পর সরকারের পক্ষ থেকে দুই ধাপে মোট ১৫ শতাংশ বাড়িভাড়া ভাতা বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এর প্রথম ধাপ হিসেবে ৭.৫ শতাংশ আগামী নভেম্বর মাস থেকে কার্যকর হওয়ার কথা রয়েছে এবং দ্বিতীয় ধাপের ৭.৫ শতাংশ আগামী বছরের জুলাই মাস থেকে কার্যকর হয়ে মোট ১৫ শতাংশ পূর্ণ হবে। তবে এই সিদ্ধান্তের বিষয়ে অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক প্রজ্ঞাপন জারি হয়নি, যা নিয়ে শিক্ষকদের মধ্যে কিছুটা উদ্বেগ রয়েছে।
এই বিষয়ে শিক্ষকদের অভয় দিয়ে অধ্যক্ষ আজিজী বলেন, “আমাদের সঙ্গে যে সিদ্ধান্ত হয়েছে, সরকার যদি এর ব্যত্যয় ঘটিয়ে অন্য কোনো সিদ্ধান্ত নেয়, তাহলে আমরা ৬ লাখ শিক্ষক-কর্মচারী ঐক্যবদ্ধভাবে প্রয়োজনে আবার মন্ত্রণালয় ঘেরাও করব। আমাদের মাঝে যে ঐক্য তৈরি হয়েছে, সরকার আমাদের পাশ কাটিয়ে কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারবে না।” তার এই বক্তব্যে স্পষ্ট যে, শিক্ষকরা সরকারের প্রতিশ্রুতির দিকে তাকিয়ে আছেন এবং একই সঙ্গে শিক্ষার্থীদের প্রতি তাদের দায়িত্ব পালনেও সচেষ্ট।




দিনাজপুর টিভির সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন