সেপ্টেম্বর ২, ২০২৬, ০৪:০৭ পিএম
প্রাথমিক শিক্ষার মজবুত ভিত্তি নির্মাণে একটি যুগান্তকারী উদ্যোগ
প্রাথমিক শিক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হলো FLN, যার পূর্ণরূপ Foundational Literacy and Numeracy (ফাউন্ডেশনাল লিটারেসি অ্যান্ড নিউমারেসি)। বাংলায় একে বলা হয় মৌলিক সাক্ষরতা ও সংখ্যাজ্ঞান।
বিশ্বব্যাপী শিক্ষার মানোন্নয়নে বর্তমানে FLN একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ধারণা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। একটি শিশুর প্রাথমিক বিদ্যালয় জীবনের শুরুতেই ভাষা ও গণিতের মৌলিক দক্ষতা নিশ্চিত করতে পারলেই তার ভবিষ্যৎ শিক্ষাজীবন অনেক বেশি সহজ, কার্যকর ও সফল হয়। এ কারণেই বাংলাদেশেও প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর ও জাতীয় শিক্ষাক্রমে FLN কার্যক্রমকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
FLN-এর প্রধান দুটি ভিত্তি হলো—
- মৌলিক সাক্ষরতা (Foundational Literacy)
- মৌলিক সংখ্যাজ্ঞান (Foundational Numeracy)
মৌলিক সাক্ষরতা (Foundational Literacy)
মৌলিক সাক্ষরতা বলতে বোঝায় একজন শিক্ষার্থী তৃতীয় শ্রেণির শেষ নাগাদ বাংলা ও ইংরেজি ভাষায় সহজভাবে পড়তে, পড়া বুঝতে, নিজের ভাব স্পষ্টভাবে বলতে এবং লিখে প্রকাশ করতে পারবে।
একজন শিক্ষার্থী যখন—
- অক্ষর চিনতে পারে
- শব্দ পড়তে পারে
- বাক্য বুঝে পড়তে পারে
- গল্পের মূলভাব অনুধাবন করতে পারে
- নিজের ভাষায় উত্তর লিখতে পারে
- সুন্দরভাবে নিজের অনুভূতি প্রকাশ করতে পারে
তখন বলা যায় সে মৌলিক সাক্ষরতা অর্জন করেছে।
মৌলিক সংখ্যাজ্ঞান (Foundational Numeracy)
মৌলিক সংখ্যাজ্ঞান হলো এমন একটি দক্ষতা, যার মাধ্যমে শিক্ষার্থী সংখ্যা চিনবে, গণনা করবে এবং দৈনন্দিন জীবনের সাধারণ গাণিতিক সমস্যা সমাধান করতে পারবে। যেমন—
- সংখ্যা চেনা
- ছোট-বড় সংখ্যা নির্ণয়
- গণনা করা
- যোগ
- বিয়োগ
- গুণ
- ভাগ
- সময়, দৈর্ঘ্য ও পরিমাপ সম্পর্কে ধারণা
- বাস্তব জীবনের সহজ সমস্যা সমাধান
বর্তমান বিশ্বে শুধু মুখস্থ বিদ্যা নয়, বরং বাস্তব জীবনে গণিত ব্যবহার করার সক্ষমতাকেই বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
কেন FLN এত গুরুত্বপূর্ণ?
বিশ্বব্যাপী Learning Poverty (শিখন ঘাটতি) বর্তমানে শিক্ষাক্ষেত্রের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ। অনেক শিশু বিদ্যালয়ে গেলেও নির্দিষ্ট শ্রেণিতে পৌঁছে সহজ একটি গল্প পড়ে বুঝতে পারে না কিংবা সাধারণ গণিত করতে পারে না। এই সমস্যা দূর করার জন্যই FLN কার্যক্রম চালু হয়েছে।
এর লক্ষ্য হলো—
- প্রতিটি শিশুর মৌলিক শেখা নিশ্চিত করা
- শ্রেণিভিত্তিক শিক্ষাগত দক্ষতা অর্জন করানো
- ঝরে পড়ার হার কমানো
- আত্মবিশ্বাস বৃদ্ধি করা
- আজীবন শিক্ষার শক্ত ভিত্তি তৈরি করা
- উচ্চশিক্ষার জন্য প্রস্তুত করা
ভাষা শিক্ষায় FLN-এর কার্যক্রম
Reading (পড়া)
- অক্ষর চেনা
- শব্দ পড়া
- বাক্য পড়া
- গল্প বুঝে পড়া
- পাঠ অনুধাবন
Writing (লেখা)
- সঠিকভাবে লেখা
- শব্দ গঠন
- বাক্য রচনা
- নিজের মতামত লিখে প্রকাশ
- সৃজনশীলভাবে লেখা
সংখ্যাজ্ঞান অংশে থাকছে
১. Number Sense
- সংখ্যা চেনা
- বড়-ছোট বোঝা
- গণনা করা
- সংখ্যার ব্যবহার
২. Basic Operations
- যোগ
- বিয়োগ
- গুণ
- ভাগ
৩. Problem Solving
- বাস্তব জীবনের সহজ সমস্যা সমাধান
- যৌক্তিক চিন্তাশক্তির বিকাশ
৪. Measurement and Shapes
- দৈর্ঘ্য
- ওজন
- সময়
- আকার
- জ্যামিতিক আকৃতি সম্পর্কে ধারণা
একটি সহজ উদাহরণ
ধরো, একজন শিক্ষার্থীকে বলা হলো—
"তোমার কাছে ৭টি মার্বেল ছিল। তুমি তোমার ভাইকে ২টি মার্বেল দিলে। পরে তোমার মা তোমাকে আরও ৫টি মার্বেল দিলেন। এখন তোমার কাছে কয়টি মার্বেল আছে?"
শিক্ষার্থী যদি মনে মনে হিসাব করে বলতে পারে—
৭ - ২ + ৫ = ১০
তাহলে বোঝা যাবে তার সংখ্যাজ্ঞান (Numeracy) সঠিকভাবে বিকশিত হচ্ছে। একই সঙ্গে যদি সে প্রশ্নটি পড়ে বুঝতে পারে এবং নিজের ভাষায় ব্যাখ্যা করতে পারে, তবে তার সাক্ষরতাও (Literacy) উন্নত হচ্ছে।
FLN কার্যক্রমে শিক্ষকের ভূমিকা
একজন শিক্ষক কেবল পাঠদানকারী নন; তিনি একজন দক্ষ পথপ্রদর্শক। শিক্ষকের দায়িত্ব হলো—
- আনন্দময় পরিবেশে পাঠদান করা
- শিশুকেন্দ্রিক শিক্ষা নিশ্চিত করা
- খেলাধুলা ও কার্যক্রমভিত্তিক শিক্ষা পরিচালনা করা
- দুর্বল শিক্ষার্থীদের আলাদা সহায়তা প্রদান
- নিয়মিত শিখন মূল্যায়ন করা
- অভিভাবকদের সম্পৃক্ত করা
অভিভাবকের ভূমিকা
FLN সফল করতে পরিবারের ভূমিকাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অভিভাবকরা যদি—
- প্রতিদিন সন্তানকে কিছু সময় পড়ান
- গল্পের বই পড়তে উৎসাহ দেন
- ঘরের কাজে গণনার সুযোগ করে দেন
- বিদ্যালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ রাখেন
তবে শিশুর শেখা আরও কার্যকর হবে।
জাতীয় শিক্ষাক্রম ২০২৫ (পরিমার্জিত) ও FLN
জাতীয় শিক্ষাক্রম ২০২৫ (পরিমার্জিত) অনুযায়ী মুখস্থ বিদ্যার পরিবর্তে Competency Based Education (যোগ্যতাভিত্তিক শিক্ষা)-এর ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। অর্থাৎ একজন শিক্ষার্থী কী মুখস্থ জানে, তার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো—
- সে কী বুঝতে পারে
- কীভাবে চিন্তা করে
- বাস্তবে কীভাবে প্রয়োগ করতে পারে
- সমস্যা সমাধান করতে পারে কি না
এই লক্ষ্যই FLN কার্যক্রমকে আরও শক্তিশালী করেছে।
আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে FLN
জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (SDG-4) অনুযায়ী সবার জন্য মানসম্মত ও অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষা নিশ্চিত করার অন্যতম ভিত্তি হলো মৌলিক সাক্ষরতা ও সংখ্যাজ্ঞান। এছাড়া ইউনেস্কো ও ইউনিসেফও শিশুদের প্রাথমিক পর্যায়ে ভাষা ও গণিতের দক্ষতা অর্জনকে শিক্ষার প্রধান অগ্রাধিকার হিসেবে বিবেচনা করে।
উপসংহার
পরিশেষে বলা যায়, FLN (Foundational Literacy and Numeracy) বা মৌলিক সাক্ষরতা ও সংখ্যাজ্ঞান বর্তমানে প্রাথমিক শিক্ষার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। দেশব্যাপী প্রতিটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে তৃতীয় থেকে পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের মধ্যে এ কার্যক্রম সফলভাবে বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত হওয়ার পাশাপাশি শিখন ঘাটতি কমবে, ঝরে পড়ার হার হ্রাস পাবে এবং শিশুরা আত্মবিশ্বাসী, দক্ষ ও মানবিক নাগরিক হিসেবে গড়ে উঠবে।
"প্রাথমিক শিক্ষা শুধু পাঠদান নয়, বরং একটি শিশুর সামগ্রিক বিকাশের ভিত্তি।"
একসাথে ধ্বনিত হোক—
"বিদ্যালয়
মোদের বিদ্যালয়,
এখানে সভ্যতারই ফুল ফোটানো হয়।"
লেখক
মিতা চক্রবর্তী
প্রধান শিক্ষক
ভোপলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, ঠাকুরগাঁও
তথ্যসূত্র
- প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর (DPE), বাংলাদেশ।
- প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ।
- জাতীয় শিক্ষাক্রম ২০২৫ (পরিমার্জিত), জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (NCTB)।
- UNESCO (Global Education Monitoring Report)।
- UNICEF, Foundational Learning।
- The World Bank, Learning Poverty Report।
- United Nations, Sustainable Development Goal 4 (SDG-4)।
- Wikipedia Bangladesh

দিনাজপুর টিভির সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন