এপ্রিল ১৬, ২০২৬, ১২:০৮ পিএম
নারীর শরীর একটি স্বাভাবিক ও নিয়মতান্ত্রিক ছন্দে পরিচালিত হয় যেখানে প্রতি মাসেই নতুন জীবনের সম্ভাবনা তৈরি হওয়ার একটি প্রক্রিয়া চলতে থাকে। এই শারীরিক প্রক্রিয়ার মূল ভিত্তি হলো তিনটি বিষয় যার মধ্যে মাসিক বা পিরিয়ড, ওভুলেশন এবং গর্ভধারণের বিষয়টি ওতপ্রোতভাবে জড়িত। অনেক নারী এ বিষয়ে কিছুটা জানলেও পুরো বিষয়টি নিয়ে অনেকের মনেই নানা ধরনের বিভ্রান্তি বা ভুল ধারণা কাজ করে।
অথচ নিজের শরীরের এই স্বাভাবিক ছন্দ সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা থাকলে স্বাস্থ্য সচেতনতা এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা উভয়ই অনেক বেশি সহজ হয়ে ওঠে।
চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় মাসিক বা পিরিয়ড হলো নারীর শরীরের একটি স্বাভাবিক শারীরবৃত্তীয় ঘটনা যেখানে জরায়ুর ভেতরের আবরণ নির্দিষ্ট সময় পর পর ঝরে পড়ে। বিশেষজ্ঞদের মতে একটি সাধারণ মাসিক চক্র সাধারণত ২১ থেকে ৩৫ দিনের মধ্যে সম্পন্ন হয় এবং এটিই স্বাভাবিক হিসেবে ধরা হয়।
এর অর্থ হলো কারও ক্ষেত্রে এই চক্র ২১ দিনে আবার কারও ক্ষেত্রে ৩৫ দিনে সম্পন্ন হলেও তা উদ্বেগের কোনো কারণ নয়। প্রতিটি চক্রে সাধারণত ৫০ থেকে ১৫০ মিলিলিটার পর্যন্ত রক্তক্ষরণ হতে পারে তবে বয়স, মানসিক চাপ, হরমোনের পরিবর্তন ও জীবনযাত্রার ধরনের ওপর ভিত্তি করে এই সময়ের কিছুটা তারতম্য ঘটা স্বাভাবিক।গর্ভধারণের হিসাব মেলাতে হলে ওভুলেশন বা ডিম্বস্ফোটনের বিষয়টি বুঝতে পারা সবচেয়ে বেশি জরুরি। ওভুলেশন হলো সেই সময় যখন ডিম্বাশয় থেকে একটি পরিপক্ক ডিম্বাণু বের হয়ে জরায়ুর দিকে অগ্রসর হয়।
সাধারণভাবে ধরা হয় যে পরবর্তী মাসিক শুরু হওয়ার প্রায় ১৪ দিন আগে ওভুলেশন ঘটে থাকে। যেমন যদি কারও ২৮ দিনের মাসিক চক্র হয় তবে তার ১৪তম দিনে ওভুলেশন হওয়ার সম্ভাবনা বেশি থাকে। একইভাবে ৩৪ দিনের চক্রে প্রায় ২০তম দিনে বা ২৪ দিনের ছোট চক্রে ১০ম দিনে এটি হতে পারে। তবে এটি কেবল একটি গড় হিসাব মাত্র কারণ বাস্তবে ব্যক্তিভেদে এই সময় কিছুটা এগিয়ে বা পিছিয়ে যেতেই পারে।সফলভাবে গর্ভধারণের ক্ষেত্রে ডিম্বাণু ও শুক্রাণুর টিকে থাকার সময়ের সমন্বয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি ধাপ।
একটি পরিপক্ক ডিম্বাণু বের হওয়ার পর সাধারণত ১২ থেকে ২৪ ঘণ্টা পর্যন্ত সক্রিয় থাকে। অন্যদিকে শুক্রাণু নারীর শরীরে প্রবেশের পর ৩ থেকে ৫ দিন পর্যন্ত বেঁচে থাকতে পারে। এই কারণে ওভুলেশনের আগের কয়েক দিন এবং ওভুলেশনের দিনটিকে সবচেয়ে বেশি উর্বর সময় বা ফার্টিলিটি উইন্ডো বলা হয়। সন্তান নেওয়ার পরিকল্পনা থাকলে এই নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে মিলন ঘটলে গর্ভধারণের সম্ভাবনা কয়েক গুণ বেড়ে যায়। একইভাবে যারা আপাতত গর্ভধারণ এড়াতে চান তাদের জন্যও এই উর্বর সময় সম্পর্কে সচেতন থাকা একান্ত প্রয়োজন।
আমাদের সমাজে প্রচলিত কিছু ভুল ধারণার কারণে অনেক সময় সঠিক পরিকল্পনা ব্যাহত হয়। অনেকেই মনে করেন মাসিক শেষ হওয়ার পরপরই গর্ভধারণ করা সম্ভব নয়। কিন্তু যাদের মাসিক চক্র ছোট বা অনিয়মিত তাদের ক্ষেত্রে মাসিকের পরপরই ওভুলেশন হতে পারে এবং গর্ভধারণের সম্ভাবনা তৈরি হয়। আবার সবার ওভুলেশন ঠিক ১৪তম দিনেই হবে এমন কোনো ধরাবাঁধা নিয়ম নেই। অনিয়মিত মাসিক মানেই সবসময় গুরুতর কোনো সমস্যা এমনটা ভাবাও ঠিক নয় তবে দীর্ঘদিন এই অনিয়ম চলতে থাকলে অবশ্যই বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
নিজের শরীর সম্পর্কে সচেতন হতে কিছু সহজ অভ্যাস গড়ে তোলা যেতে পারে যা মাতৃত্ব পরিকল্পনাকে সহজ করবে। প্রতি মাসে মাসিকের তারিখটি ক্যালেন্ডারে নিয়মিত নোট রাখা বা মোবাইল অ্যাপের সাহায্য নেওয়া যেতে পারে। পাশাপাশি মাসিক চক্রের দৈর্ঘ্য হিসাব করা এবং শরীরের কিছু সূক্ষ্ম পরিবর্তন লক্ষ্য করা জরুরি। নারীর শরীর কোনো রহস্যময় বিষয় নয় বরং এটি একটি স্বাভাবিক ও সুন্দর ছন্দ যাকে সঠিকভাবে বুঝতে পারা মানেই নিজের জীবনের ওপর আরও বেশি নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা। এ সম্পর্কে সঠিক জ্ঞান শুধু মাতৃত্ব পরিকল্পনাতেই সহায়ক নয় বরং এটি আত্মবিশ্বাস ও সার্বিক সচেতনতা বাড়াতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।



দিনাজপুর টিভির সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন