মঙ্গলবার, ০৬ অক্টোবর, ২০২৬,
মৃত নক্ষত্র

নক্ষত্রের মৃত্যুর পর জন্ম নিতে পারে নতুন গ্রহ: বিজ্ঞানীদের দাবি

তথ্যপ্রযুক্তি ডেস্ক

অক্টোবর ৬, ২০২৬, ০৬:১৫ পিএম

নক্ষত্রের মৃত্যুর পর জন্ম নিতে পারে নতুন গ্রহ: বিজ্ঞানীদের দাবি

মৃত নক্ষত্রের ধ্বংসাবশেষ থেকে নতুন একটি গ্রহ তৈরি হয়েছে—এমন সম্ভাবনার প্রথম জোরালো প্রমাণ খুঁজে পেয়েছেন বিজ্ঞানীরা। পৃথিবী থেকে প্রায় ২৭০ আলোকবর্ষ দূরে অবস্থান করা একটি মৃত নক্ষত্রকে কেন্দ্র করে এই নতুন গ্রহের সৃষ্টি হয়ে থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। নেচার অ্যাস্ট্রোনমি সাময়িকীতে এই চাঞ্চল্যকর গবেষণাটি প্রকাশিত হয়েছে। বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন, আবিষ্কৃত গ্রহটি সম্ভবত একটি গ্যাসীয় দৈত্য। এটি ‘এইচএস ০২০৯+০৮৩২’ নামের একটি শ্বেত বামন নক্ষত্রকে কেন্দ্র করে নিয়মিত আবর্তন করছে। হাবল মহাকাশ দূরবিনসহ বিভিন্ন আধুনিক যন্ত্রের সাহায্যে ওই নক্ষত্রটির দীর্ঘ পর্যবেক্ষণ চালান গবেষকরা। সেখানে তারা এমন কিছু ভারী মৌলের অস্তিত্ব খুঁজে পেয়েছেন, যা জোরালোভাবে ইঙ্গিত দেয় যে নক্ষত্রটি মারা যাওয়ার সময় যে পদার্থগুলো মহাকাশে ছড়িয়ে পড়েছিল, সেখান থেকেই এই নতুন গ্রহটির জন্ম হতে পারে। সাধারণত সূর্যের মতো কোনো নক্ষত্রের জীবনচক্রের শেষে সেটি দ্রুত ফুলে উঠে লাল দানবে পরিণত হয় এবং পরবর্তীতে নক্ষত্রের বাইরের স্তরগুলো মহাকাশে ছিটকে যায়।

শেষ পর্যন্ত সেখানে অত্যন্ত ঘন ও উত্তপ্ত ছোট একটি কেন্দ্র অবশিষ্ট থাকে, যাকে জ্যোতির্বিজ্ঞানের ভাষায় শ্বেত বামন বলা হয়। নক্ষত্রের সঙ্গে একই সময়ে তৈরি হওয়া কিছু পুরোনো গ্রহ অবশ্য এই ভয়াবহ পরিবর্তন থেকেও টিকে যেতে পারে, যেগুলোকে প্রথম প্রজন্মের গ্রহ বলা হয়। এর আগে জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা শ্বেত বামনকে ঘিরে এমন কয়েকটি টিকে থাকা গ্রহের সন্ধান পেলেও, মৃত নক্ষত্রের ধ্বংসাবশেষ থেকে তৈরি দ্বিতীয় প্রজন্মের কোনো গ্রহের প্রমাণ এবারই প্রথম পাওয়া গেল বলে দাবি গবেষকদের। গবেষণার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সূত্রটি এসেছে শ্বেত বামনটির পৃষ্ঠে খুঁজে পাওয়া অস্বাভাবিক ভারী মৌল থেকে। গবেষকরা সেখানে ‘নিওবিয়াম’ নামের একটি বিশেষ মৌলের অস্তিত্ব শনাক্ত করেছেন। গবেষণার প্রধান লেখক ও ইংল্যান্ডের ওয়ারউইক বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞানের গবেষক জেমি উইলিয়ামস জানিয়েছেন যে, শ্বেত বামনের পৃষ্ঠে এর আগে এই মৌল দেখা যায়নি। তার মতে, নক্ষত্রটির মৃত্যুর ঠিক সেই মুহূর্তে তৈরি হওয়া পদার্থ থেকেই গ্রহটি গঠিত হওয়ার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি। মৃত নক্ষত্রের ক্ষেত্রে ভারী মৌল সাধারণত দ্রুত নিচের দিকে তলিয়ে যায়। ফলে শ্বেত বামনের বাইরের অংশে প্রধানত হাইড্রোজেন ও হিলিয়ামের মতো হালকা মৌল থাকার কথা।

তাই গবেষকদের ধারণা, সেখানে পাওয়া ভারী মৌলগুলো নিশ্চিতভাবেই নক্ষত্রটির বাইরের কোনো উৎস থেকে এসে জমা হয়েছে। উইলিয়ামসের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, শ্বেত বামনটি অত্যন্ত উত্তপ্ত এবং প্রচুর শক্তিশালী অতিবেগুনি রশ্মি বিকিরণ করছে। এই তীব্র বিকিরণের প্রভাবে কাছাকাছি থাকা কোনো গ্রহের বায়ুমণ্ডল ক্ষয় হয়ে তার উপাদানগুলো শ্বেত বামনের পৃষ্ঠে গিয়ে জমা হতে পারে। এছাড়া নাসার ট্রানজিটিং এক্সোপ্ল্যানেট সার্ভে স্যাটেলাইটের তথ্য বিশ্লেষণ করেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কিছু সংকেত পেয়েছেন গবেষকরা। সেখানে প্রতি ৪ দশমিক ৪ দিন পরপর নক্ষত্রটির উজ্জ্বলতায় সামান্য পরিবর্তন লক্ষ্য করা গেছে, যা শ্বেত বামনকে ঘিরে কোনো বিশাল গ্রহের ঘূর্ণনের সঙ্গেই পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ। তবে বিজ্ঞানীরা এখনই এটিকে একটি নিশ্চিত গ্রহ হিসেবে ঘোষণা করতে নারাজ। উইলিয়ামস স্পষ্ট করে জানিয়েছেন যে এটি আপাতত শুধু একটি গ্রহের প্রার্থী মাত্র এবং আরও নিবিড় পর্যবেক্ষণের পরই এর প্রকৃত অস্তিত্ব নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। মৃত নক্ষত্রকে ঘিরে দ্বিতীয় প্রজন্মের গ্রহ তৈরির ধারণা যদিও সম্পূর্ণ নতুন নয়।

এর আগে দ্রুত ঘূর্ণনশীল মৃত নক্ষত্র বা পালসারকে ঘিরেও গ্রহের সন্ধান পাওয়া গিয়েছিল। পালসার সাধারণত বিশাল নক্ষত্রের ভয়াবহ বিস্ফোরণের পর তৈরি হয়। সেই বিস্ফোরণে পুরোনো গ্রহগুলো ধ্বংস হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকায় ওই গ্রহগুলোকে দ্বিতীয় প্রজন্মের বলে বিবেচনা করা হয়। তবে শ্বেত বামন সুপারনোভার মাধ্যমে তৈরি হয় না। নক্ষত্রটি যখন লাল দানব থেকে শ্বেত বামনে পরিণত হয়, তখন তার চারপাশে বিপুল পরিমাণ ধ্বংসাবশেষ, গ্যাস ও ধূলিকণা ছড়িয়ে পড়ে। সেই উপাদানগুলো পরবর্তীতে একত্র হয়ে নতুন গ্রহ তৈরি করতে পারে বলে বিজ্ঞানীদের ধারণা। গবেষক ডেভিড জে. উইলসনের মতে, নক্ষত্রের বিশাল পরিবর্তনীয় পর্যায় পার হওয়ার পরও কিছু পুরোনো গ্রহ টিকে থাকতে পারে। আবার কিছু গ্রহ সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে তাদের ধ্বংসাবশেষ চারদিকে ছড়িয়ে দিতে পারে। নক্ষত্র থেকে বেরিয়ে আসা গ্যাস ও ধূলিকণাও সেখানে অবস্থান করে।

এসব উপাদান একত্র হয়ে নতুন গ্রহ তৈরির উপযুক্ত পরিবেশ সৃষ্টি করে। তবে ঠিক কী প্রক্রিয়ায় এই গ্রহ তৈরি হয়েছে, তা এখনও পুরোপুরি পরিষ্কার নয়। গবেষকদের একটি প্রধান ধারণা হলো, নক্ষত্রটির সঙ্গে অন্য কোনো মহাজাগতিক বস্তুর সংঘর্ষ বা ঘনিষ্ঠ মিথস্ক্রিয়ার ফলেই এই পুরো প্রক্রিয়াটি শুরু হয়ে থাকতে পারে। উইলিয়ামসের মতে, ওই বস্তুটি সূর্যের ভরের প্রায় ২০ শতাংশের একটি ছোট নক্ষত্র কিংবা কোনো বাদামি বামনও হতে পারে। সেটি নক্ষত্রের লাল দানব পর্যায়ে তার ভেতরে প্রবেশ করলে গ্যাস ও ধূলিকণাকে সরাসরি বাইরে ছিটকে পড়া থেকে কিছুটা আটকে দিতে পারে। সে সময় সেগুলো ঘূর্ণায়মান একটি চাকতির মতো কাঠামো তৈরি করতে পারে এবং পরবর্তী সময়ে সেই চাকতি থেকেই নতুন গ্রহের জন্ম হওয়া সম্ভব। গবেষকরা আগামী এক বছরে হাবল মহাকাশ দূরবিন এবং নাসার চন্দ্র এক্স-রে মানমন্দিরের সাহায্যে এই নক্ষত্রব্যবস্থাটি আরও নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করার পরিকল্পনা করেছেন। পাশাপাশি তারা জেমস ওয়েব মহাকাশ দূরবিন ব্যবহার করার জন্যও সময় চেয়েছেন। আরও শক্তিশালী এই দূরবিনের মাধ্যমে গ্রহটির অস্তিত্ব এবং এর অনন্য বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে আরও সুনির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া যেতে পারে। গ্রহটির অস্তিত্ব শেষ পর্যন্ত নিশ্চিত হলে এটি জ্যোতির্বিজ্ঞানের ইতিহাসে সম্পূর্ণ নতুন একটি শ্রেণীর গ্রহ হিসেবে স্বীকৃতি পাবে।

একই সঙ্গে শ্বেত বামনকে ঘিরে এমন আরও দ্বিতীয় প্রজন্মের গ্রহ থাকার সম্ভাবনাও অনেকখানি জোরালো হবে। গবেষক ডেভিড উইলসন মনে করেন, এই গবেষণার ফলাফলের সঙ্গে আমাদের সৌরজগতের ভবিষ্যতেরও একটি গভীর সম্পর্ক রয়েছে। কারণ কোটি কোটি বছর পর আমাদের সূর্যও একসময় শ্বেত বামনে পরিণত হবে। সেই অর্থে, দূরের এই নক্ষত্রব্যবস্থায় নতুন গ্রহ তৈরির এই সম্ভাবনা ভবিষ্যতে আমাদের সৌরজগতের পরিণতি ঠিক কী হতে পারে, সে সম্পর্কেও বিজ্ঞানীদের নতুন ও স্পষ্ট ধারণা দিতে পারে।