সোমবার, ২৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬,

অর্থনৈতিক সংকট রুখতে ইইউ’র কাছে ফিরছেন কি স্টারমার?

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

এপ্রিল ১, ২০২৬, ০৬:৫২ পিএম

অর্থনৈতিক সংকট রুখতে ইইউ’র কাছে ফিরছেন কি স্টারমার?

বক্তব্য রাখছেন কিয়ার স্টারমার

ইরান যুদ্ধের বৈশ্বিক অস্থিরতার প্রেক্ষাপটে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠ অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা সম্পর্ক গড়ে তোলার অঙ্গীকার করেছেন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার। বুধবার লন্ডনে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি জানান, চলমান সংঘাতের ফলে উদ্ভূত পরিস্থিতি মোকাবিলায় ব্রিটেনের জাতীয় স্বার্থেই ইউরোপীয় মিত্রদের সঙ্গে সহযোগিতা বাড়ানো এখন জরুরি হয়ে পড়েছে। 

বিশেষ করে আমেরিকার সঙ্গে সাম্প্রতিক কূটনৈতিক টানাপোড়েন এবং দেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক সংকটের মুখে স্টারমার এই নতুন কৌশলী অবস্থান নিলেন বলে মনে করা হচ্ছে।

প্রধানমন্ত্রী স্টারমার স্পষ্ট করেছেন যে, চলতি বছরের শেষের দিকে অনুষ্ঠিতব্য ইইউ সামিটে তিনি ব্রিটেন ও ইউরোপীয় ব্লকের মধ্যে অর্থনীতি এবং নিরাপত্তা খাতে আরও জোরালো অংশীদারিত্বের প্রস্তাব দেবেন। ইরান যুদ্ধের প্রভাবে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি ও পণ্যের বাজারে যে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে, তার সরাসরি প্রভাব পড়ছে ব্রিটেনের সাধারণ মানুষের ওপর। 

ওএসিডি বা অর্গানাইজেশন ফর ইকোনমিক কো-অপারেশন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট ইতোমধ্যে সতর্ক করেছে যে, বড় অর্থনীতির দেশগুলোর মধ্যে এই যুদ্ধের কারণে ব্রিটেন সবচেয়ে বেশি অর্থনৈতিক ক্ষতির সম্মুখীন হতে পারে। এই ঝুঁকি হ্রাস করতেই স্টারমার এখন ব্রেক্সিট পরবর্তী দূরত্ব কমিয়ে ইউরোপের কাছাকাছি যাওয়ার চেষ্টা করছেন।আন্তর্জাতিক সম্পর্কের এই পরিবর্তনের পেছনে আমেরিকার সঙ্গে ব্রিটেনের শীতল হতে থাকা সম্পর্ক একটি বড় ভূমিকা পালন করছে বলে বিশ্লেষকদের ধারণা। 

ইরানের বিরুদ্ধে সরাসরি সামরিক অভিযানে অংশ নিতে এবং ব্রিটিশ সামরিক ঘাঁটিগুলো মার্কিন বাহিনীকে ব্যবহারের অনুমতি দিতে অস্বীকার করার পর থেকেই হোয়াইট হাউসের সঙ্গে ডাউনিং স্ট্রিটের দূরত্ব বাড়তে শুরু করে। বিশেষ করে ডোনাল্ড ট্রাম্পের পক্ষ থেকে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর কড়া সমালোচনা আসার পর স্টারমার এখন ইইউকে একটি নির্ভরযোগ্য বিকল্প হিসেবে দেখছেন। যদিও স্টারমার ন্যাটো জোটের প্রতি ব্রিটেনের পূর্ণ আনুগত্যের কথা পুনর্ব্যক্ত করেছেন, তবে তিনি স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে ব্রিটেন কোনোভাবেই এই যুদ্ধে সরাসরি জড়িয়ে পড়বে না।

দেশের ভেতরেও প্রধানমন্ত্রী স্টারমারকে প্রবল রাজনৈতিক চাপের মোকাবিলা করতে হচ্ছে। বিরোধী দল কনজারভেটিভ পার্টি এবং রিফর্ম ইউকে দাবি তুলেছে যে, জীবনযাত্রার ব্যয় কমাতে বিদ্যুৎ বিল থেকে ভ্যাট প্রত্যাহার করতে হবে এবং আগামী সেপ্টেম্বরে পরিকল্পিত জ্বালানি কর বৃদ্ধি বাতিল করতে হবে। লিবারেল ডেমোক্র্যাট এবং গ্রিন পার্টিও সাধারণ মানুষের ওপর অর্থনৈতিক চাপ কমাতে সরকারকে আরও বড় অঙ্কের ভর্তুকি দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে। স্কটিশ ন্যাশনাল পার্টি (এসএনপি) দাবি করেছে যে, জ্বালানি নীতি নির্ধারণের ক্ষমতা সরাসরি হলিরুড বা স্কটিশ পার্লামেন্টের হাতে ছেড়ে দেওয়া উচিত। 

এই চাপের মুখে স্টারমার জনগণকে আশ্বস্ত করার চেষ্টা করেছেন যে, সরকার পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে এবং জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে কাজ করে যাচ্ছে।ইরান বর্তমানে হরমুজ প্রণালী কার্যত বন্ধ করে দেওয়ায় বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেল ও গ্যাসের দাম হু হু করে বাড়ছে। হরমুজ প্রণালী হলো বিশ্বের অন্যতম ব্যস্ত শিপিং চ্যানেল, যা বন্ধ থাকায় পাইকারি বাজারে জ্বালানির দাম বেড়ে চলেছে। এর প্রভাবে আগামী জুলাই মাসে যখন জ্বালানি মূল্যের সীমা বা প্রাইস ক্যাপ পুনর্নির্ধারণ করা হবে, তখন সাধারণ ব্রিটিশদের বিদ্যুৎ বিল আরও অনেকটা বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। 

স্টারমার জানিয়েছেন, হরমুজ প্রণালীকে নিরাপদ ও সচল রাখার বিষয়ে বৃহস্পতিবার ৩৫টি দেশের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করবেন ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী। এই বৈঠকের মূল লক্ষ্য হবে যুদ্ধের পরবর্তী সময়ে এই জলপথকে পুনরায় সবার জন্য উন্মুক্ত ও নিরাপদ করে তোলা।অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ব্রেক্সিট ব্রিটেনের অর্থনীতির যে দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি করেছে, ইইউ’র সঙ্গে নতুন এই ঘনিষ্ঠতা তা পুষিয়ে নিতে সাহায্য করতে পারে। 

প্রধানমন্ত্রী স্টারমার স্বীকার করেছেন যে, ব্রেক্সিট ব্রিটিশ অর্থনীতিতে গভীর ক্ষত তৈরি করেছে এবং এখন নিরাপত্তা জোরদার ও জীবনযাত্রার ব্যয় কমানোর যে সুযোগ তৈরি হয়েছে, তা উপেক্ষা করা সম্ভব নয়। যদিও লেবার পার্টির নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী ব্রিটেন এখনই সিঙ্গেল মার্কেট বা কাস্টমস ইউনিয়নে ফিরে যাচ্ছে না, তবে শিক্ষা, গবেষণা, প্রতিরক্ষা এবং জ্বালানি খাতে ইইউ’র সঙ্গে বড় ধরনের সহযোগিতার পথে হাঁটতে চান স্টারমার। 

এক সময় আমেরিকার সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ মিত্র হিসেবে পরিচিত ব্রিটেন এখন যুদ্ধের বাস্তবতায় নিজের অর্থনৈতিক ও ভৌগোলিক অবস্থানের নিরিখে ইউরোপীয় বলয়ে নিজেদের ভবিষ্যৎ খুঁজে পাওয়ার চেষ্টা করছে। এই পরিবর্তিত পররাষ্ট্রনীতি শেষ পর্যন্ত ব্রিটেনের জন্য কতটা ইতিবাচক হবে, তা অনেকটা নির্ভর করছে আসন্ন ব্রিটিশ-ইইউ সামিটের ওপর।

তথ্য:বিবিসি নিউজ