সেপ্টেম্বর ২১, ২০২৬, ০৭:৫৬ পিএম
বিধ্বস্ত ভবন, অস্থায়ী তাঁবু আর টিনের ছাপড়ার নিচে বসে দীর্ঘ তিন বছর পর সরাসরি শিক্ষা কার্যক্রমে ফিরেছে যুদ্ধবিধ্বস্ত গাজা উপত্যকার শিশুরা। নতুন খাতা-কলম বা ইউনিফর্মের সুযোগ না মিললেও শনিবার থেকে শুরু হওয়া এ পাঠদান কর্মসূচিতে শিক্ষার্থীদের মাঝে নতুন করে শিক্ষার আলোয় ফেরার উচ্ছ্বাস দেখা গেছে। জাতিসংঘের শিশুবিষয়ক সংস্থা ইউনিসেফ জানিয়েছে, দীর্ঘ সংঘাতে উপত্যকাটির প্রায় ৯৮ শতাংশ স্কুল ভবন হয় পুরোপুরি ধ্বংস হয়েছে নয়তো মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। গাজার স্থানীয় শিক্ষা কর্মকর্তাদের মতে, যুদ্ধ ও সংঘাতময় পরিস্থিতির কারণে প্রায় ৬ লাখ ৬০ হাজার শিশু এতদিন সরাসরি শ্রেণিকক্ষের স্বাভাবিক শিক্ষাগ্রহণ থেকে সম্পূর্ণ বঞ্চিত ছিল।
ভয়াবহ ক্ষয়ক্ষতির মাঝেও পুনরায় শিক্ষা শুরুকে আশার আলো হিসেবে দেখা হচ্ছে। গাজার পূর্বাঞ্চলীয় খান ইউনিসের শিক্ষা পরিচালক ইব্রাহিম রমদান জানান, সামরিক হামলায় এ পর্যন্ত অন্তত ২২ হাজার শিক্ষার্থী এবং ৫৩২ জন শিক্ষকসহ ৭৭০ জনেরও বেশি শিক্ষাকর্মী প্রাণ হারিয়েছেন। এই অপূরণীয় ক্ষতি সত্ত্বেও পাঠশালা চালু করার ঘটনাকে তারা এক ভঙ্গুর কিন্তু ইতিবাচক সূচনা হিসেবে বিবেচনা করছেন। চরম দাবদাহ আর বাতাস চলাচলের সুবিধাহীন তাঁবুর মেঝেতে বসেই ক্লাসে অংশ নিচ্ছে শিক্ষার্থীরা। জুতো বা শিক্ষা উপকরণ না থাকলেও এবং খেলার সাথীদের হারানোর বেদনা নিয়েই তারা সেখানে সমবেত হচ্ছে। খান ইউনিসের শিক্ষার্থী মোয়ায়েদ আবু মুস্তফা জানায়, তিন বছর পর আবার স্কুলে আসার সুযোগ হয়েছে এবং আজকের এই নতুন শিক্ষাবর্ষ তাদের জন্য আনন্দ ও সাফল্যের উপলক্ষ। সে আরও জানায়, সমস্ত প্রতিকূলতার মধ্যেও তারা তাঁবুর নিচে বসেই তাদের লেখাপড়া চালিয়ে যেতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।
বাস্তুচ্যুত পরিবারের সঙ্গে তাঁবুতে বসবাসকারী ১৫ বছর বয়সী আরেক শিক্ষার্থী সমর আবু সালমি ক্লাসে ফিরতে পেরে স্বস্তি প্রকাশ করেছে। অস্থায়ী স্কুলের আঙিনায় দাঁড়িয়ে সে জানায়, দীর্ঘদিন ধরে সে কেবল মুঠোফোনের পর্দায় পড়াশোনা করেছে এবং শিক্ষকদের সামনাসামনি দেখার কোনো সুযোগ পায়নি। এক তাঁবু থেকে অন্য তাঁবুতে গিয়ে হলেও নিজের শিক্ষাজীবনের স্বপ্ন পূরণ করতে চায় সে। সমর আরও স্মরণ করে যে যুদ্ধের আগের দিনগুলোতে খাতা, কলম কিংবা পোশাক খুব সহজে ও স্বল্পমূল্যে কেনা সম্ভব হতো।চারপাশের ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞের মধ্যেও আন্তর্জাতিক ও স্থানীয় বিভিন্ন সহযোগী সংস্থার সহায়তায় ২০২৬-২৭ শিক্ষাবর্ষের আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরু করেছে গাজার শিক্ষা মন্ত্রণালয়। শিক্ষার্থীদের বসার জায়গা করে দিতে তেরপল, স্টিল, কাঠ ও তাঁবু ব্যবহার করে অসংখ্য অস্থায়ী পাঠশালা গড়ে তোলা হয়েছে। এর মধ্যে কোনোটি সরাসরি বালুর ওপর স্থাপন করা হয়েছে, আবার কোনোটির শ্রেণিকক্ষে কেবল একটি ব্ল্যাকবোর্ড ও গুটিকয়েক গদি ছাড়া অন্য কোনো আসবাব নেই। এছাড়া বেশ কিছু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এখনো বাস্তুচ্যুত পরিবারগুলো গাদাগাদি করে আশ্রয় নিয়ে আছে।
চরম নিরাপত্তাহীনতার মধ্যেও ক্লাসে আসতে হচ্ছে বলে জানিয়েছে ১৪ বছর বয়সী শিক্ষার্থী ইয়ামেন আবু সামরা। সে জানায়, অতীতে আনন্দের সঙ্গে বিদ্যালয়ে যেত, তবে এখন ক্লাসে আসার সময় মাথায় লক্ষ্যভ্রষ্ট গুলি, রকেট ও নতুন হামলার ভয় তাড়া করে ফেরে। তীব্র রোদ আর অসহনীয় গরমের মাঝে তাঁবুতে বসেই তাকে পাঠ নিতে হচ্ছে। গাজার শিক্ষা বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, চলতি শিক্ষাবর্ষে ইউনিসেফের সরাসরি সহায়তায় অন্তত ৫ লাখ ৪০ হাজার শিক্ষার্থী এসব অস্থায়ী বেসরকারি স্কুল ও লার্নিং সেন্টারে সরাসরি অংশ নেবে। যারা এখনো ক্লাসে উপস্থিত হতে পারছে না কিংবা উপত্যকা ছেড়ে গেছে, তাদের পাঠদানের আওতায় রাখতে অনলাইন শিক্ষার ব্যবস্থাও সচল রাখা হয়েছে। যুদ্ধবিরতির পরও সামরিক বাহিনী গাজার ৬০ শতাংশেরও বেশি এলাকার নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে রেখেছে। এতে করে বড় আকারের প্রত্যক্ষ সংঘাত সাময়িক স্থগিত হলেও সার্বিক মানবিক সংকটের অবসান ঘটেনি। ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৩ সালের অক্টোবর মাসে সংঘাত শুরু হওয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত উপত্যকায় ৭৩ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি নাগরিক নিহত হয়েছেন।
আমদানি নিষেধাজ্ঞার কারণে বর্তমানে স্থানীয় বাজারে শিক্ষা উপকরণের মারাত্মক সংকট দেখা দিয়েছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয় ব্যবসায়ী খালেদ আলিয়ান। তিনি জানান, যুদ্ধের পূর্বে যে খাতার দাম ছিল তিন শেকেল বা এক ডলার, তা এখন বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৫ শেকেলে। নিত্যপ্রয়োজনীয় শিক্ষা উপকরণের এমন আকাশছোঁয়া দাম সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে গেছে। এদিকে শিক্ষা উপকরণ প্রবেশের অনুমতি না দেওয়া কিংবা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে হামলার অভিযোগের বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক মন্তব্য করেনি ইসরায়েলি সামরিক সমন্বয়কারী সংস্থা কোগাট। তবে দেশটির কর্তৃপক্ষ দাবি করেছে যে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সামরিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হয়ে থাকে। অন্যদিকে এই ধরনের অভিযোগ প্রথম থেকেই সম্পূর্ণ অস্বীকার করে আসছে ফিলিস্তিনি স্বাধীনতাকামী সংগঠন হামাস।

দিনাজপুর টিভির সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন