বুধবার, ২১ অক্টোবর, ২০২৬,
এক অনন্য প্রেম

জাপানের সুনামি ট্র্যাজেডি: নিখোঁজ স্ত্রীর সন্ধানে সাগরে ৭৬০ বার ডুব

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

অক্টোবর ২১, ২০২৬, ০৪:৫৪ পিএম

জাপানের সুনামি ট্র্যাজেডি: নিখোঁজ স্ত্রীর সন্ধানে সাগরে ৭৬০ বার ডুব

প্রতি মাসে নিয়মিত দুইবার একটি ছোট মাছ ধরার নৌকায় চেপে উপকূল ছেড়ে গভীর সাগরের দিকে যাত্রা করেন ইয়াসুও তাকামাতসু।

জাপানের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় মিয়াগি প্রিফেকচারের ওনাগাওয়া বন্দর থেকে জলপথে এই যাত্রা শুরু করেন তিনি। এক যুগেরও বেশি সময় ধরে তিনি অবিচলভাবে একই রুটিন মেনে চলেছেন। পরনে ডাইভিং স্যুট, মুখে বিশেষ মাস্ক, পিঠে অক্সিজেনের ভারী এয়ার ট্যাংক এবং কোমরে ওয়েট বেল্ট। নৌকাটি উপকূল থেকে কয়েক কিলোমিটার দূরে নির্দিষ্ট স্থানে পৌঁছালে তিনি সরাসরি নিচের বরফশীতল পানিতে ঝাঁপিয়ে পড়েন। প্রতিটি ডুবের মধ্য দিয়ে তিনি যেন ফিরে যান সেই একই সাগরের গহ্বরে, যা ২০১১ সালে তার প্রিয়তমা স্ত্রী ইউকোকে কেড়ে নিয়েছিল।

২০১১ সালের সেই ভয়াবহ সুনামিতে ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছিল জাপানের উত্তর-পূর্ব উপকূল।

সেদিন সকালে ইয়াসুও নিজের গাড়িতে করে স্ত্রী ইউকোকে তার কর্মস্থল একটি ব্যাংকে পৌঁছে দিয়েছিলেন। স্বল্প সময়ের সেই যাত্রাপথে রাতের খাবারের মেন্যু নিয়ে তাদের মধ্যে স্বাভাবিক কথা হচ্ছিল। কিন্তু কিছুক্ষণ পরই বেজে ওঠে সুনামির সতর্কীকরণ সাইরেন। তীব্র ভূমিকম্পের পর সাগরের বিশাল জলরাশি ধেয়ে আসায় ইউকো এবং তার অন্য ১২ জন সহকর্মী বাঁচার আশায় ব্যাংক ভবনের ছাদে উঠে যান।

ছাদে আটকা পড়া অবস্থায় স্বামীর কাছে শেষ বার্তা পাঠান ইউকো।

মোবাইলের সেই সংক্ষিপ্ত বার্তায় তিনি লিখেছিলেন, "তুমি কি নিরাপদ আছো? আমি বাড়ি যেতে চাই।" বার্তাটি পেয়ে ইয়াসুও ভেবেছিলেন হয়তো তার স্ত্রী কোনো নিরাপদ আশ্রয়ে রয়েছেন। কিন্তু পরদিন বেঁচে ফেরা মানুষজন যেখানে আশ্রয় নিয়েছিলেন, সেই স্থানীয় পৌর হাসপাতালে তন্ন তন্ন করে খুঁজেও স্ত্রীর দেখা পাননি তিনি।

সেখানে ইয়াসুওকে জানানো হয় যে বিশাল সুনামি তার স্ত্রীকে সাগরে ভাসিয়ে নিয়ে গেছে।

সেই দুঃসহ মুহূর্তের স্মৃতিচারণ করে তিনি জানান, খবরটি শোনার পর তার পায়ের নিচ থেকে মাটি সরে গিয়েছিল এবং সোজা হয়ে দাঁড়ানোর শক্তিটুকুও হারিয়ে ফেলেছিলেন। উপকূলে আঘাত হানা সুনামির বিশাল ঢেউ সবকিছু চূর্ণবিচূর্ণ করে স্থলভাগের প্রায় ১০ কিলোমিটার ভেতর পর্যন্ত প্রবেশ করেছিল।

পানি নেমে যাওয়ার পর পরবর্তী দিন ও সপ্তাহগুলোতে জাপানের দীর্ঘ উপকূলরেখা থেকে উদ্ধারকর্মীরা হাজার হাজার মানুষের মরদেহ উদ্ধার করে। কিন্তু বহু মানুষের মতো ইউকোর কোনো হদিস মেলেনি। তিনি চিরতরে নিখোঁজদের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হন।

পরবর্তী দুই বছর জাপানি উপকূলরক্ষী বাহিনীর ডুবুরিরা সাগরের তলদেশে তল্লাশি চালিয়ে মৃতদেহ এবং স্বজনদের স্মারকচিহ্ন উদ্ধার করছিল। দূর থেকে সেই দৃশ্য নীরবে দেখতেন ইয়াসুও।

তারপর তিনি নিজেই এক কঠিন সিদ্ধান্ত নেন।

স্ত্রীকে খোঁজার তাগিদে ষাট ছুঁইছুঁই ইয়াসুও নিজে ডাইভিং শেখার প্রশিক্ষণ নেন। তিনি বলেন, "আমার তীব্র অনুভূতি হতো যে, যতদিন আমি সাগরের নিচে এই ডুব দেওয়া চালিয়ে যাব, কোনো না কোনো দিন ঠিকই তার দেখা পাব।"

সেই অটুট বিশ্বাস বুকে ধারণ করে তিনি টানা ডাইভিং চালিয়ে গেছেন এবং এ পর্যন্ত ৭৬০ বারেরও বেশি সাগরের গভীরে ডুব দিয়েছেন।