সোমবার, ২৬ অক্টোবর, ২০২৬,

নির্বাসন কাটিয়ে ভেনেজুয়েলায় ফিরলেন মারিয়া কোরিনা মাচাদো

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

অক্টোবর ২৬, ২০২৬, ০৯:৫০ এএম

নির্বাসন কাটিয়ে ভেনেজুয়েলায় ফিরলেন মারিয়া কোরিনা মাচাদো

মারিয়া কোরিনা মাচাদো দীর্ঘ ১০ মাসেরও বেশি সময় নির্বাসিত জীবন কাটিয়ে নিজ দেশ ভেনেজুয়েলায় ফিরে এসেছেন। রাজনৈতিক চরম অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে যাওয়া ল্যাটিন আমেরিকার দেশটিতে রোববার তার এই নাটকীয় প্রত্যাবর্তন ঘটে। মারিয়া কোরিনা মাচাদো ফিরলেন স্বদেশের মাটিতে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে একটি সংক্ষিপ্ত বার্তা দিয়ে নিজের উপস্থিতি নিশ্চিত করেন এই নোবেলজয়ী বিরোধী নেত্রী। সেখানে তিনি লেখেন, তিনি এখন দেশেই আছেন এবং জনগণের সঙ্গেই আছেন। এর আগে একাধিকবার সীমান্ত পেরিয়ে স্বদেশে ফেরার চেষ্টা করেও বিভিন্ন বাধার কারণে তিনি সফল হতে পারেননি।

রোববার ভেনেজুয়েলার লারা প্রদেশের একটি স্থানীয় গির্জায় প্রার্থনায় অংশ নেন তিনি। গির্জায় পৌঁছাতেই শত শত সমর্থক তাকে ঘিরে ধরেন এবং সেখানে এক আবেগঘন পরিবেশ তৈরি হয়। সমর্থকেরা তাকে জড়িয়ে ধরে ও করমর্দন করে স্বাগত জানান। পরে উচ্ছ্বসিত কর্মী-সমর্থকদের একটি বিশাল মোটর শোভাযাত্রা নিয়ে রাজধানী কারাকাসের উদ্দেশে যাত্রা শুরু করেন তিনি। দীর্ঘ যাত্রাপথেও বিভিন্ন স্থানে সাধারণ মানুষ তাকে অভিবাদন জানান।

মাচাদোর ফিরে আসাকে স্বাগত জানিয়ে সাবেক প্রেসিডেন্ট প্রার্থী ও তার ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক মিত্র এডমান্ডো গঞ্জালেজ একটি আনুষ্ঠানিক বিবৃতি দিয়েছেন। বিবৃতিতে তিনি বলেন, তাদের নেত্রী মারিয়া কোরিনা পুনরায় দেশের মাটিতে পা রেখেছেন। এই দিনটিকে ভেনেজুয়েলার মানুষের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দিন হিসেবে উল্লেখ করে তিনি জানান, দিকনির্দেশনা ও চলমান প্রক্রিয়ায় নেতৃত্ব দিতে তাদের সার্বভৌম কণ্ঠ আবার ফিরে এসেছে। দেশের স্বাধীনতার লক্ষ্যে তিনি নিজেও শিগগিরই মাচাদোর সাথে যোগ দেবেন বলে ঘোষণা দেন।

গত সেপ্টেম্বর মাসে মাচাদোর একজন উপদেষ্টা আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমকে জানিয়েছিলেন, কয়েক সপ্তাহের মধ্যে তিনি অন্তত সাতবার দেশে প্রবেশের চেষ্টা করেছিলেন। প্রতিবারই তাকে ভেতরে ঢুকতে বাধা দেওয়া হয়েছিল। তার প্রত্যাবর্তন প্রক্রিয়ায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সম্পৃক্ততা ছিল বলে বিভিন্ন মহলে খবর প্রকাশিত হলেও ওয়াশিংটন বরাবরই তা অস্বীকার করে এসেছে।

দেশে ফেরার পর মাচাদোর ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক পদক্ষেপ কী হবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়। তবে অতীতে তিনি একাধিকবার স্পষ্ট করেছেন যে নতুন নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলে তিনি প্রেসিডেন্ট পদে লড়াই করবেন। রাজনৈতিক মহলে ধারণা করা হচ্ছে, ট্রাম্প প্রশাসনের সম্মতির ওপরই তার দেশে ফেরা অনেকটাই নির্ভরশীল ছিল।

২০২৩ সালে ভেনেজুয়েলার বিরোধী দলগুলোর নিজস্ব উদ্যোগে আয়োজিত একটি স্বাধীন প্রাথমিক নির্বাচনে বিপুল জনসমর্থন পান তিনি। সরকারি কোনো প্রাতিষ্ঠানিক নজরদারি ছাড়া অনুষ্ঠিত ওই ভোটাভুটিতে মাচাদো ৯০ শতাংশের বেশি ভোট পেয়েছিলেন। কিন্তু ওই বিজয়ের পরপরই প্রেসিডেন্ট নিকোলা মাদুরোর প্রশাসন তাকে নির্বাচনে অযোগ্য ঘোষণা করে। সে সময় তার বিরুদ্ধে জালিয়াতি ও কর সংক্রান্ত অনিয়মের অভিযোগ তোলা হয়। বিরোধীদের দাবি ছিল, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে মাঠ থেকে সরিয়ে রাখতেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল।

দেশ ছাড়ার আগে গ্রেফতার এড়াতে তাকে বিভিন্ন গোপন ডেরায় দিন কাটাতে হয়েছিল। পরে গত বছরের শেষভাগে রাতের অন্ধকারে একটি দ্রুতগতির নৌকায় করে দেশ ছাড়েন তিনি। নরওয়েতে গিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে নোবেল শান্তি পুরস্কার গ্রহণ করার উদ্দেশ্যেই দেশ ত্যাগ করেছিলেন মাচাদো।

পরবর্তী ২০২৪ সালের বিতর্কিত প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে মাদুরোর বিপরীতে নির্বাচনে দাঁড়ান বিরোধী জোটের প্রতিনিধি এডমান্ডো গঞ্জালেজ। সরকারের অনুগত নির্বাচনী কর্তৃপক্ষ বিস্তারিত ফলাফল জনসমক্ষে প্রকাশ না করেই মাদুরোকে বিজয়ী ঘোষণা করে। তবে বিরোধী দলগুলো নির্বাচনী হিসাবের অনুলিপি প্রকাশ করে দাবি করে যে প্রকৃত ভোটে গঞ্জালেজই জয়ী হয়েছিলেন।

চলতি বছরের জানুয়ারি মাসে পরিস্থিতির চরম মোড় নেয়, যখন মার্কিন সামরিক বাহিনী কারাকাস থেকে মাদুরোকে আটক করে নিয়ে যায়। বর্তমানে তিনি নিউ ইয়র্কের ফেডারেল কারাগারে বন্দি আছেন। তার বিরুদ্ধে মাদক চোরাচালান, অস্ত্র ব্যবসা এবং নির্যাতন সংক্রান্ত মামলায় বিচার চলছে, যদিও মাদুরো সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।

মাচাদোর স্বদেশ প্রত্যাবর্তনকে গণতান্ত্রিক উত্তরণের বড় ধাপ হিসেবে দেখছেন তার মুখপাত্র ডেভিড স্মোলানস্কি। তিনি মন্তব্য করেন, এই প্রক্রিয়ার ফলে নিকট ভবিষ্যতে একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের পরিবেশ তৈরি হবে। একই সাথে তিনি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প, পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও, মার্কিন সরকার, কংগ্রেস ও অন্যান্য মিত্রদের সহায়তার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।

এদিকে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেন, মাচাদোর প্রত্যাবর্তনের বিষয়ে বিস্তারিত কিছু তার জানা নেই। তবে তিনি আশা প্রকাশ করেন যে মাচাদো নিরাপদে আছেন। ট্রাম্প উল্লেখ করেন, মাচাদো একজন অত্যন্ত ভালো নারী এবং তিনি হোয়াইট হাউসে তাকে নিজের নোবেল পদক উপহার দিয়েছিলেন।

গত জানুয়ারি মাসে হোয়াইট হাউসে সাক্ষাতের সময় ট্রাম্পের হাতে নোবেল শান্তি পুরস্কারের পদক তুলে দেন মাচাদো। তবে নোবেল কমিটি তখন নিয়ম স্মরণ করিয়ে দিয়ে জানিয়েছিল যে তাদের পদক কাউকে হস্তান্তর বা ভাগ করে দেওয়ার সুযোগ নেই।

অন্যদিকে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও এই ঘটনায় কূটনৈতিক সমঝোতার প্রশংসা করেছেন। এক্সে দেওয়া বিবৃতিতে তিনি উল্লেখ করেন, রাজনৈতিক আলোচনার ফলেই মাচাদোর নিরাপদে দেশে ফেরার মতো সহায়ক পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। রুবিও দাবি করেন, ওয়াশিংটনের মধ্যস্থতায় চলা সমঝোতার অধীনে ইতিমধ্যে শত শত রাজনৈতিক বন্দি মুক্তি পেয়েছেন এবং অনেক নির্বাসিত নেতা দেশে ফিরতে পেরেছেন। সব পক্ষকে এই আলোচনা এগিয়ে নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, গত তিন দশকের মধ্যে ভেনেজুয়েলায় একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে টেকসই গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার এটাই সবচেয়ে বড় সুযোগ।