সোমবার, ২৬ অক্টোবর, ২০২৬,

জাপানের বাজারে বাণিজ্য ঘাটতি ৭০০ মিলিয়ন ডলার কমানোর উদ্যোগ

দিনাজপুর টিভি ডেস্ক

অক্টোবর ২৬, ২০২৬, ১০:৩০ এএম

জাপানের বাজারে বাণিজ্য ঘাটতি ৭০০ মিলিয়ন ডলার কমানোর উদ্যোগ

ছবি: সংগৃহীত

জাপানের বাজারে বাণিজ্য ঘাটতি দাঁড়িয়েছে প্রায় ৭০০ মিলিয়ন ডলারে। প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের অন্যতম শীর্ষ অর্থনীতির এই দেশটিতে ২৪ বিলিয়ন ডলারের তৈরি পোশাকের বাজারে চীন ও ভিয়েতনাম নিজেদের একচ্ছত্র আধিপত্য ধরে রেখেছে। বিগত কয়েক বছর ধরে দক্ষিণ এশিয়ার কয়েকটি প্রতিযোগী দেশ নিজেদের অবস্থান শক্ত করলেও প্রতিযোগিতার এই বিশাল বাজারে এখনও অনেকটা পিছিয়ে রয়েছে বাংলাদেশ।

টোকিওর সাথে বাণিজ্যিক ভারসাম্যহীনতা এখন ঢাকার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।

বর্তমানে দুই দেশের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের আর্থিক আকার প্রায় সাড়ে তিন বিলিয়ন ডলার। গেল অর্থবছরে জাপান থেকে দুই বিলিয়ন ডলারেরও বেশি মূল্যের পণ্য সামগ্রী আমদানি করেছে বাংলাদেশ। এর বিপরীতে ঢাকা থেকে টোকিওতে রপ্তানি করা গেছে প্রায় দেড় বিলিয়ন ডলারের পণ্য। এতে দুই দেশের বাণিজ্যিক ব্যবধান বা বাণিজ্য ঘাটতি দাঁড়িয়েছে প্রায় ৭০০ মিলিয়ন ডলারে।

এই বিশাল ঘাটতি কমিয়ে জাপানের বাজারে রপ্তানি বাড়াতে প্রস্তাবিত নতুন অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি বা ইপিএর সুবিধা পুরোপুরি কাজে লাগানোর ওপর জোর দিচ্ছেন বাণিজ্য বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, রপ্তানিযোগ্য পণ্যে বৈচিত্র্য আনা, গুণগত মানোন্নয়ন, কঠোর আন্তর্জাতিক কমপ্লায়েন্স ও শিল্প কারখানার উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধির পাশাপাশি জাপানের প্রত্যক্ষ বিনিয়োগ ও আধুনিক প্রযুক্তি কাজে লাগানো এখন অপরিহার্য।

এমন একটি অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের জাপান সফরকে কেন্দ্র করে নতুন করে বাণিজ্যিক সহযোগিতা ও ভারসাম্য তৈরির জোর প্রত্যাশা করছে বাংলাদেশ। টোকিও সফরে অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি বা ইপিএ বাস্তবায়নে একটি কার্যকর যৌথ কর্মপরিকল্পনা ও জাপানি নীতিগত সহযোগিতা চাইবে ঢাকা। এর পাশাপাশি দীর্ঘদিনের এই বাণিজ্য ঘাটতি কমিয়ে আনতে তৈরি পোশাকের ওপর একক নির্ভরতা কমিয়ে চামড়াজাত পণ্য, প্রক্রিয়াজাত খাদ্য ও হালকা প্রকৌশলজাত পণ্যের রপ্তানি বাড়ানোর ক্ষেত্রে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হবে।

নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সাউথ এশিয়ান ইনস্টিটিউট অব পলিসি অ্যান্ড গভর্ন্যান্সের পরিচালক অধ্যাপক ড. এস কে তৌফিক এম হক জানান, বস্তুনিষ্ঠ গবেষণার মাধ্যমে জাপানের বিনিয়োগ, উন্নত প্রযুক্তি ও কারিগরি জ্ঞানকে নিজেদের স্বার্থে ব্যবহারের সুযোগগুলো দ্রুত চিহ্নিত করতে হবে। তিনি আরও উল্লেখ করেন, ঢাকা ও চট্টগ্রামের মধ্যকার যোগাযোগ অবকাঠামো উন্নয়ন এবং হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনালের মতো মেগা প্রকল্পে জাপানি অর্থায়নের পাশাপাশি তাদের আধুনিক প্রযুক্তি ও দীর্ঘ অভিজ্ঞতাকে বাংলাদেশ ঠিক কতটা বাস্তবায়নে কাজে লাগাতে পারছে, সেদিকেও গভীরভাবে নজর দেওয়া দরকার।

জাপান-বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সাধারণ সম্পাদক রবিউল আলম বলেন, জাপানের সুরক্ষিত বাজারে হিমায়িত খাদ্যসহ যেকোনো নতুন পণ্য প্রবেশ করাতে হলে তাদের নির্ধারিত উচ্চমান বজায় রাখা সবচেয়ে জরুরি। পণ্যের সেরা গুণগত মান নিশ্চিত করার পাশাপাশি কারখানাগুলোর উৎপাদন প্রক্রিয়া ও আন্তর্জাতিক সার্টিফিকেশন সংক্রান্ত কঠোর শর্তগুলো যথাযথভাবে পূরণ করতে হবে। এসব অভ্যন্তরীণ শর্ত শতভাগ পূরণ করতে পারলেই জাপানের বাজারে প্রবেশ এবং দীর্ঘমেয়াদে সফলভাবে রপ্তানি বৃদ্ধি করা সম্ভব হবে।

অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা আরও বলছেন, জাপানের বাজারে প্রবেশাধিকার সুসংহত করতে গতানুগতিক পণ্যের গণ্ডি পেরিয়ে নতুন ধরনের পণ্য উদ্ভাবনে মনোযোগ দিতে হবে। এর সাথে আন্তর্জাতিক লজিস্টিকস ও টেকসই সাপ্লাই চেইন নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা আবশ্যক। একই সঙ্গে উদ্যোক্তারা যদি জাপানের ভাষা ও প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবসায়িক সংস্কৃতি সম্পর্কে প্রাথমিক ধারণা রাখেন, তবে দেশটির অভ্যন্তরীণ আমদানিকারকদের সঙ্গে অংশীদারত্ব গড়ে তোলার ক্ষেত্রে অন্যান্য দেশের তুলনায় অনেকটাই এগিয়ে থাকবেন।

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের সম্মাননীয় ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, সরাসরি জাপানের বিনিয়োগ আকর্ষণ করে সেই বিদেশি বিনিয়োগের অবকাঠামো ব্যবহার করেই বাংলাদেশ থেকে তাদের নিজস্ব বাজারে শুল্কমুক্ত সুবিধায় পণ্য রপ্তানির এক অনন্য সুযোগ তৈরি করা সম্ভব। এতে উভয় দেশের জন্য একটি কার্যকর বাণিজ্যিক মডেল গড়ে উঠতে পারে। একই সাথে চীন থেকে জাপানি বিনিয়োগ অন্য দেশে সরিয়ে নেওয়ার যে বৈশ্বিক প্রবণতা এখন দেখা যাচ্ছে, কৌশলগত নীতি গ্রহণ করে তা কাজে লাগাতে পারলে বাংলাদেশ একটি অত্যন্ত সুবিধাজনক অবস্থানে পৌঁছাতে পারে।

শুধুমাত্র রপ্তানি আয় বাড়ানোই নয়, বরং ভারী শিল্প ও দক্ষ মানবসম্পদ তৈরির লক্ষ্যেও জাপান থেকে বিপুল সরাসরি বৈদেশিক বিনিয়োগ আকর্ষণ করতে চায় বাংলাদেশ। সংশ্লিষ্টদের মতে, ইপিএর বাণিজ্যিক সম্ভাবনা বাস্তবে কাজে লাগাতে হলে কেবল আনুষ্ঠানিক চুক্তির সুবিধার ওপর ভরসা করলেই চলবে না; বরং অভ্যন্তরীণ উৎপাদন সক্ষমতা, পণ্যের আন্তর্জাতিক মান ও জাপানি অভ্যন্তরীণ ভোক্তাদের চাহিদামাফিক প্রস্তুতি নিশ্চিত করাই হবে মূল চাবিকাঠি।