অক্টোবর ২২, ২০২৫, ১২:২৫ পিএম
পাকিস্তানে আবারও ভূকম্পন অনুভূত হয়েছে। মঙ্গলবার রাতে দেশটির একটি বিশাল অংশজুড়ে মাঝারি মাত্রার এই ভূমিকম্প আঘাত হানে, যার ফলে রাজধানী ইসলামাবাদসহ উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকায় তীব্র আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। ভূমিকম্পটি অনুভূত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই বহুতল ভবন ও ঘরবাড়ি থেকে মানুষজন দিগ্বিদিক ছুটে রাস্তায় নেমে আসেন। আফটারশকের আশঙ্কায় বহু মানুষ তীব্র শীত উপেক্ষা করে রাতভর খোলা আকাশের নিচে অবস্থান করেন।
যদিও রিখটার স্কেলে এই কম্পনের মাত্রা মাঝারি ছিল, তবে সাম্প্রতিক সময়ে আফগানিস্তানে ভয়াবহ ভূমিকম্পের স্মৃতি এবং পাকিস্তানে বারবার কম্পন অনুভূত হওয়ায় দেশটির নাগরিকদের মধ্যে চরম উদ্বেগ ও ভয় কাজ করছে। এখন পর্যন্ত এই ভূমিকম্পে কোনো বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি বা হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি, তবে এটি দক্ষিণ এশিয়ার এই অঞ্চলের ভূতাত্ত্বিক অস্থিতিশীলতাকে আবারও সামনে নিয়ে এসেছে।
পাকিস্তানি সংবাদমাধ্যম জিওনিউজের প্রাথমিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, মঙ্গলবার রাতের এই কম্পনের মাত্রা ছিল রিখটার স্কেলে ৫ দশমিক ৩। কম্পনটি রাজধানী ইসলামাবাদ, পাঞ্জাব প্রদেশের রাওয়ালপিন্ডি, খাইবার পাখতুনখোয়া প্রদেশের রাজধানী পেশোয়ার, আপার দির, মালাকান্ড, বাজাউর, চিত্রল, পর্যটন শহর মুরি এবং পাকিস্তান-শাসিত আজাদ কাশ্মীরের সামাহনি ও ভিমবেরসহ অন্যান্য অঞ্চলে একযোগে অনুভূত হয়।
পাকিস্তানের আবহাওয়া দপ্তরের (পিএমডি) অধীনস্থ ন্যাশনাল সিসমিক মনিটরিং সেন্টার জানিয়েছে, এই ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল ছিল আফগানিস্তানের হিন্দুকুশ পার্বত্য অঞ্চলে। ভূপৃষ্ঠের বেশ গভীরে, প্রায় ২৩৪ কিলোমিটার নিচে এর কেন্দ্র ছিল। হিমালয় পর্বতমালার যে অংশটি আফগানিস্তানে প্রবেশ করেছে, সেটিই হিন্দুকুশ পবর্তমালা হিসেবে পরিচিত, যা বিশ্বের অন্যতম সক্রিয় একটি ভূমিকম্পপ্রবণ অঞ্চল। উৎপত্তিস্থল গভীর হওয়ায় কম্পনটি বিস্তৃত এলাকাজুড়ে অনুভূত হয়েছে।
মঙ্গলবার রাতের এই ভূমিকম্পের মাত্রা রিখটার স্কেলে ৫.৩ হলেও, সাধারণ মানুষের মধ্যে তীব্র আতঙ্কের মূল কারণ ভিন্ন। মাত্র চার দিন আগেই দেশটিতে ৫ দশমিক ৬ মাত্রার আরেকটি ভূমিকম্প আঘাত হেনেছিল। সেই কম্পনটিও খাইবার পাখতুনখোয়া, ইসলামাবাদ এবং রাজধানী সংলগ্ন অঞ্চলে অনুভূত হয়েছিল। এভাবে ঘন ঘন ভূকম্পন সাধারণ মানুষের মনে বড় ধরনের দুর্যোগের ভয় ঢুকিয়ে দিয়েছে। সবচেয়ে বড় আতঙ্কের কারণ হলো, গত সেপ্টেম্বরে পার্শ্ববর্তী দেশ আফগানিস্তানের দুর্গম পূর্বাঞ্চলে ৬ মাত্রার এক বিশাল ভূমিকম্প আঘাত হেনেছিল।
সেই ভয়াবহ দুর্যোগে আফগানিস্তানে দুই হাজার দুইশ জনেরও বেশি মানুষ নিহত এবং আরও কয়েক হাজার মানুষ আহত হয়েছিলেন। সেই ভূমিকম্পের প্রভাব পাকিস্তানের লাহোর পর্যন্ত অনুভূত হয়েছিল। আফগানিস্তানের সেই ধ্বংসযজ্ঞের চিত্র পাকিস্তানিদের মনে এতটাই গভীরভাবে গেঁথে আছে যে, এখন মাঝারি কোনো কম্পন অনুভূত হলেই তারা সম্ভাব্য সবচেয়ে খারাপ পরিণতির আশঙ্কা করছেন। মঙ্গলবারের কম্পনের পরও পরিস্থিতি ছিল একই রকম।
তাৎক্ষণিকভাবে কোনো বড় ধরনের আফটারশক অনুভূত না হলেও, বহু মানুষ সারারাত আর নিজেদের বাড়িতে ফিরে যাওয়ার সাহস করেননি।শুধু হিন্দুকুশ অঞ্চলই নয়, পাকিস্তানের অন্যান্য অঞ্চলও সম্প্রতি ভূকম্পনজনিত ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। ভূতাত্ত্বিকরা বলছেন, পাকিস্তান এমন একটি ফল্ট লাইনের ওপর অবস্থিত, যেখানে ইউরেশিয়ান এবং ইন্ডিয়ান টেকটোনিক প্লেট একে অপরের সঙ্গে মিলিত হয়েছে, যা এই অঞ্চলকে অত্যন্ত সংবেদনশীল করে তুলেছে।
গত জুন মাসে দেশটির বাণিজ্যিক রাজধানী করাচিতে একাধিকবার মৃদু কম্পন অনুভূত হয়। দেশটির প্রধান আবহাওয়াবিদ আমির হায়দার সে সময় ব্যাখ্যা দিয়েছিলেন যে, কয়েক দশক ধরে সুপ্ত থাকা লান্দি ফল্ট লাইনটি পুনরায় সক্রিয় হওয়ার কারণে এই কম্পনগুলো ঘটছে। এক মাসেই করাচিতে এই ধরনের কম্পনের সংখ্যা কমপক্ষে ৫৭টিতে পৌঁছেছিল।
সব মিলিয়ে, একদিকে আফগানিস্তানের ভয়াবহ ভূমিকম্পের স্মৃতি, অন্যদিকে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ফল্ট লাইনের সক্রিয় হয়ে ওঠার খবর—এই দুইয়ের মধ্যে পাকিস্তানের নাগরিকরা এখন ভূমিকম্প নিয়ে এক ধরনের স্থায়ী আতঙ্কের মধ্যে বসবাস করছেন। মঙ্গলবারের রাতভর এই আতঙ্ক সেই গভীর উদ্বেগেরই বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়েছে।



দিনাজপুর টিভির সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন