জানুয়ারি ১২, ২০২৬, ১০:০৯ এএম
বাংলাদেশের সংবাদপত্রের ইতিহাসে এক-এগারোর সেনা সমর্থিত সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর থেকে এক বিশেষ ধরনের 'পলিটিক্যাল প্যারালেলিজম' বা রাজনৈতিক সমান্তরালতা লক্ষ্য করা গেছে। তখন থেকে শুরু করে পরবর্তী প্রায় দেড় দশক দেশের প্রধান পত্রিকাগুলো বিশেষ করে বিএনপি ও এর শীর্ষ নেতৃত্বের বিরুদ্ধে এক সুপরিকল্পিত প্রোপাগান্ডা চালিয়েছে।
গবেষকদের মতে বাংলাদেশের অধিকাংশ সংবাদপত্রের মালিকানা বা সম্পাদকীয় নীতি কোনো না কোনো রাজনৈতিক দলের সাথে সম্পৃক্ত থাকা এবং অর্থনৈতিক কাঠামোর ওপর টিকে থাকার তাগিদই এর মূল কারণ।
ফলে অনেক ক্ষেত্রেই সাংবাদিকতার মৌলিক নীতি 'বস্তুনিষ্ঠতা' বিসর্জিত হয়েছে এবং 'জার্নালিস্টিক পাওয়ার' বা সাংবাদিকতা শক্তির অপব্যবহার হয়েছে।
উদাহরণস্বরূপ প্রথম আলোর ভূমিকার দিকে তাকালে দেখা যায় ২০০৭-০৮ সালের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় থেকেই তারা বিএনপি নেতৃত্বের বিরুদ্ধে ধারাবাহিক আক্রমণাত্মক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। বিশেষ করে খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানকে লক্ষ্য করে 'দুর্বৃত্তচক্র' ও 'দুর্নীতিবাজ' হিসেবে উপস্থাপনের প্রতিযোগিতায় নেমেছিল পত্রিকাটি। এমনকি ২০১৩ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত প্রথম আলোর বিভিন্ন প্রতিবেদনে বিএনপিকে সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ থেকে শুরু করে ইতিহাস বিকৃতির সাথে যুক্ত করার চেষ্টা ছিল চোখে পড়ার মতো।
ডেইলি স্টারের ক্ষেত্রেও গ্রেনেড হামলার মতো স্পর্শকাতর বিষয়ে 'হাওয়ার ভবনের ষড়যন্ত্র' সংক্রান্ত প্রতিবেদন বা বিভিন্ন ব্যাঙ্গাত্মক কার্টুনের মাধ্যমে একটি সুনির্দিষ্ট রাজনৈতিক বয়ান তৈরির চেষ্টা দেখা গেছে। জিয়া পরিবারের সদস্যদের নিয়ে তাদের শিরোনাম ও টাইমিং নিয়ে আজও রাজনৈতিক মহলে বিতর্ক রয়েছে।অন্যদিকে বাংলাদেশ প্রতিদিন ও জনকণ্ঠের মতো পত্রিকাগুলো সময়ের সাথে সাথে তাদের সম্পাদকীয় অবস্থান নাটকীয়ভাবে পরিবর্তন করেছে।
আওয়ামী লীগের শাসনামলে যে খালেদা জিয়াকে 'দেশদ্রোহী' বা 'সন্ত্রাসী' হিসেবে চিত্রিত করা হয়েছিল বর্তমানে সেই একই ব্যক্তিকে তারা 'আপসহীন নারী' ও 'গণতন্ত্রের প্রতীক' হিসেবে মহিমান্বিত করছে। বিডিআর বিদ্রোহ বা আদালতের হাজিরাকে কেন্দ্র করে যেসব নেতিবাচক বিশেষণ ব্যবহার করা হতো এখন ক্ষমতার পটপরিবর্তনের সাথে সাথে সেই শব্দগুলোর প্রয়োগ বদলে গেছে। এই চিত্র মূলত সাংবাদিকতার কোনো আদর্শিক পরিবর্তন নয় বরং ক্ষমতার পরিবর্তনের সাথে খাপ খাইয়ে নেওয়ার একটি কৌশলগত রূপান্তর।
বিশ্লেষকদের মতে এই 'সেকাল-একাল' এর গল্প আসলে বাংলাদেশের গণমাধ্যমের কাঠামোগত সংকটের একটি জীবন্ত দলিল। পত্রিকাগুলো যখন বিরোধী রাজনীতিকে অনৈতিকতার প্রতীক হিসেবে হাজির করেছিল তখন তারা মূলত ক্ষমতাসীনদের ন্যারেটিভ বা বয়ান প্রতিষ্ঠায় কাজ করেছে। আজ যখন পুনরায় ক্ষমতার পালাবদল হয়েছে তখন তারাই আবার ভিন্ন ভাষায় একই শক্তিকে গণতন্ত্রের আশা হিসেবে তুলে ধরছে।
এই যে ভাষা বদলানো কিন্তু নৈতিক অবস্থান না বদলানো এটি প্রমাণ করে যে বাংলাদেশের বেশিরভাগ গণমাধ্যম এখনো ক্ষমতার বলয়ের ওপর অতিমাত্রায় নির্ভরশীল। এই সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে না পারলে বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতা কেবল কাগজেই সীমাবদ্ধ থাকবে।


দিনাজপুর টিভির সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন