বৃহস্পতিবার, ০৫ নভেম্বর, ২০২৬,

ই-সিগারেট নিষিদ্ধের ধারা বাতিল: হুমকিতে তরুণ প্রজন্ম

জাতীয় ডেস্ক

এপ্রিল ১১, ২০২৬, ০৭:৪৩ পিএম

ই-সিগারেট নিষিদ্ধের ধারা বাতিল: হুমকিতে তরুণ প্রজন্ম

জাতীয় সংসদের সাম্প্রতিক অধিবেশনে ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ (সংশোধন) বিল ২০২৬ পাস হয়েছে। তবে এই নতুন সংশোধনীতে ই-সিগারেট, ভ্যাপ এবং নিকোটিন পাউচসহ সকল ধরনের ইমার্জিং টোব্যাকো প্রোডাক্ট নিষিদ্ধের পূর্বপ্রস্তাবিত ধারাটি বাতিল করা হয়েছে। সরকারের এই সিদ্ধান্তের ফলে এসব ক্ষতিকর পণ্য এখন দেশের বাজারে কার্যত কোনো নিয়ন্ত্রণ ছাড়াই উন্মুক্ত হয়ে পড়বে। 

এতে জনস্বাস্থ্য বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের ভবিষ্যৎ ভয়াবহ ঝুঁকির মুখে পড়বে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মহামান্য আপিল বিভাগ ২০১৬ সালের ১ মার্চ এক ঐতিহাসিক রায়ে বাংলাদেশে তামাকের ব্যবহার কমাতে সুনির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার নির্দেশনা দিয়েছিলেন। 

বর্তমান এই আইন সংশোধনীর মাধ্যমে ই-সিগারেট ও ভ্যাপকে বৈধতা দেওয়া মূলত আদালতের সেই রায়ের স্পষ্ট পরিপন্থি। ২০০৫ সালে যখন দেশে তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন প্রথম প্রণয়ন করা হয়, তখন সেটি দক্ষিণ এশিয়ায় একটি রোল মডেল হিসেবে স্বীকৃত হয়েছিল। 

কিন্তু এবারের এই শিথিল সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের সেই অগ্রযাত্রাকে পেছনে ঠেলে দিচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।সংসদীয় আলোচনায় স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রী উল্লেখ করেছেন যে রাজস্ব আদায়ের বিষয়টি বিবেচনা করে ই-সিগারেট নিষিদ্ধের বিধানটি আইন থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। অথচ অর্থনৈতিক পরিসংখ্যান বলছে ভিন্ন কথা। বাংলাদেশে তামাকজনিত অসুস্থতা ও ক্ষতির আর্থিক পরিমাণ বছরে প্রায় ৮৭ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। তামাক খাত থেকে সংগৃহীত রাজস্বের তুলনায় এই ক্ষতির পরিমাণ বহুগুণ বেশি। ফলে রাজস্বের দোহাই দিয়ে জনস্বাস্থ্যকে ঝুঁকির মুখে ফেলা ‘রোগের অর্থনীতি’কে উৎসাহিত করার নামান্তর বলে মনে করছেন তামাকবিরোধী আন্দোলনকর্মীরা।

আন্তর্জাতিক বিভিন্ন গবেষণায় ই-সিগারেটের সুদূরপ্রসারী নেতিবাচক প্রভাব সুপ্রতিষ্ঠিত। ২০২৩ সালে ইনস্টিটিউট ফর গ্লোবাল টোব্যাকো কন্ট্রোল (আইজিটিসি) এক প্রতিবেদনে জানায় যে বিশ্বের ১৩২টি দেশ ইতোমধ্যে ই-সিগারেট নিয়ন্ত্রণ বা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করেছে। এর মধ্যে ৪৬টি দেশ জনস্বাস্থ্য রক্ষায় কোনো আপস না করে এসব পণ্য বাজার থেকে পুরোপুরি সরিয়ে দিয়েছে। সারা বিশ্ব যখন তামাকের এই আধুনিক সংস্করণ বন্ধে কঠোর অবস্থানে যাচ্ছে, বাংলাদেশ তখন ঠিক বিপরীত পথে হাঁটছে।

সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, ই-সিগারেট বা ভ্যাপ বর্তমানে কেবল নিকোটিন গ্রহণের মাধ্যম নয় বরং মাদক সেবনের অন্যতম অনুষঙ্গ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিভিন্ন গোয়েন্দা তথ্যে উঠে এসেছে যে এক শ্রেণির অসাধু চক্র ভ্যাপ লিকুইডে এমডিএমবি নামক মারাত্মক বিপজ্জনক মাদক মিশিয়ে বাজারে সরবরাহ করছে, যা ‘শয়তানের নিঃশ্বাস’ নামে পরিচিত। নিয়ন্ত্রণহীন বাজার ব্যবস্থার কারণে এসব পণ্য স্কুল-কলেজগামী শিক্ষার্থীদের হাতে সহজে পৌঁছে যাচ্ছে। এর ফলে তরুণ সমাজ এক ভয়াবহ মাদকচক্রের শিকার হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

এছাড়া মাত্র ৬১ কোটি টাকার বিদেশি বিনিয়োগের সুযোগ দিয়ে একটি বহুজাতিক কোম্পানিকে দেশে নিকোটিন পাউচ উৎপাদনের অনুমতি দেওয়া হয়েছে। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা একে ‘ভুল পলিসি’ হিসেবে দেখছেন। শনিবার বাংলাদেশ তামাক বিরোধী জোট (বাটা), বাংলাদেশ ক্যানসার সোসাইটি এবং প্রত্যাশা মাদক বিরোধী সংগঠনসহ মোট ১৭টি সংগঠন এক যৌথ বিবৃতিতে এই সিদ্ধান্তের তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছে। তারা ২০০৫ সালের মূল আইনের চেতনা বজায় রাখতে এবং জনস্বাস্থ্য সুরক্ষার অঙ্গীকার রক্ষার্থে ই-সিগারেট ও নিকোটিন পাউচ পুনরায় নিষিদ্ধ করার জন্য দ্রুত কার্যকর নতুন আইন প্রণয়নের জোর দাবি জানিয়েছে। একই সাথে নিকোটিন পাউচ উৎপাদনের যে কোনো অনুমতি বাতিলের আহ্বান জানানো হয়েছে।