নভেম্বর ৫, ২০২৬, ০৩:০৯ পিএম
দক্ষিণ কক্সবাজারের সীমান্তবর্তী ব্যস্ততম উখিয়ার আরাকান সড়ক এখন অবৈধ পার্কিং ও ঝুপড়ি দোকানের দখলে চলে গেছে। উপজেলার কুতুপালং এলাকায় সড়কের দুই পাশে গড়ে উঠেছে অবৈধ বাজার, স্থাপনা ও পার্কিং। ফলে এক মিনিটের পথ পাড়ি দিতে লাগছে ঘণ্টারও বেশি সময়। তীব্র যানজট ও বিশৃঙ্খলায় চরম ভোগান্তিতে পড়ছেন রোহিঙ্গা ক্যাম্পে নিয়োজিত শত শত যানবাহনের চালক, ভিআইপিদের বহনকারী যানবাহন, রোগীবাহী অ্যাম্বুলেন্স, স্কুলগামী শিক্ষার্থী, কর্মজীবী মানুষ, ব্যবসায়ী ও সাধারণ পথচারীরা। সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের নাকের ডগায় অবৈধ বাজার ও পার্কিং থাকার কারণে দীর্ঘদিন ধরে এ সমস্যা চললেও জনদুর্ভোগ দিন দিন বেড়েই চলেছে।
কুতুপালং বাজারের অনিয়ম প্রকাশ পাওয়ার আশঙ্কায় সরকারের নির্ধারিত মূল্যের দ্বিগুণেরও বেশি দামে বাজার ইজারা নেওয়া এবং ইজারার মাধ্যমে তা নিয়ন্ত্রণে রাখার পেছনে হেলাল উদ্দিন মেম্বারের পরিবারের বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে। তবে সর্বশেষ সরাসরি দুই কোটি একচল্লিশ লাখ চল্লিশ হাজার টাকায় বাজারটি ইজারা নিয়েছেন বোরহান উদ্দিন। সরেজমিনে দেখা যায়, কুতুপালং সড়কের উভয় পাশে সারিবদ্ধভাবে অবৈধ বাজার বসানো হয়েছে এবং পার্ক করে রাখা হয়েছে সিএনজিচালিত অটোরিকশা, ইজিবাইকসহ বিভিন্ন ছোট যানবাহন। অন্যদিকে, সড়কের পশ্চিম পাশে গড়ে তোলা হয়েছে ঝুপড়ি দোকান। ফলে বাজার এলাকায় প্রতিনিয়ত তীব্র যানজটের সৃষ্টি হচ্ছে।
শুধু কুতুপালং নয়, কোটবাজার, মরিচ্যা বাজার, বালুখালী, থাইংখালী ও পালংখালী বাজারের চিত্রও প্রায় একই রকম। এলাকাবাসীর অভিযোগ, প্রভাবশালী মহল ও প্রশাসনের নীরবতার সুযোগ নিয়ে একটি সিন্ডিকেট সড়ক দখল করে প্রতিনিয়ত লাখ লাখ টাকা চাঁদা আদায় করছে। সরেজমিনে আরও দেখা যায়, প্রতিটি দোকান থেকে দৈনিক আড়াইশ থেকে চারশ টাকা এবং প্রতিটি গাড়ি পার্কিংয়ের বিপরীতে পঞ্চাশ থেকে একশ টাকা করে চাঁদা আদায় করা হচ্ছে। অভিযোগ রয়েছে, এসব অবৈধ লেনদেনের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের একাংশকে ম্যানেজ করে দখল ও অবৈধ বাজারের কার্যক্রম অব্যাহত রাখা হয়েছে।
সবচেয়ে হতাশাজনক বিষয় হলো, এসব অবৈধ দখলের ঘটনা চোখের সামনে ঘটলেও ট্রাফিক ও হাইওয়ে পুলিশসহ প্রশাসনের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের কার্যকর ভূমিকা না থাকা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন স্থানীয়রা। বিশেষ করে উপজেলা সহকারী কমিশনার ভূমি ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নিয়মিত এ সড়ক দিয়ে যাতায়াত করলেও সরকারি গাড়িতে চলাচলের সময় তাঁরা এ দুর্ভোগ উপলব্ধি করছেন না বলে স্থানীয়দের দাবি। কুতুপালং এলাকার আমিন নামের এক পথচারী জানান, বাজারে একটু যাওয়া মানেই ঘণ্টার পর ঘণ্টা যানজটে বসে থাকা। জরুরি রোগী নিয়েও অনেক সময় বিপাকে পড়তে হয়। এই গুরুত্বপূর্ণ সড়কের এক পাশে সিএনজি, অন্য পাশে ঝুপড়ি দোকান—সব মিলিয়ে সড়কের অবস্থা একেবারে নাজুক।
সড়কের ওপর অবৈধভাবে জাম্বুরা বিক্রি করা সৈয়দুর রহমান বলেন, বাজারে জায়গা দিতে না পেরে আমাকে এখানে বসানো হয়েছে। আমি আড়াইশ টাকা হাসিল বা টোল দিয়ে ব্যবসা পরিচালনা করছি। এখানে আমার কোনো দোষ নেই। কুতুপালং উচ্চবিদ্যালয়ের একাধিক শিক্ষার্থী জানায়, প্রতিদিন স্কুলে যেতে তাদের দেরি হয়ে যায়। বাড়ি থেকে পৌঁছাতে যেখানে পাঁচ মিনিট লাগার কথা, সেখানে কোটবাজারের যানজটের কারণে হাতে এক ঘণ্টা সময় নিয়ে বের হতে হয়। সকালে রাস্তায় গাড়ি একেবারেই এগোতে চায় না। এসব দেখভালের দায়িত্বে থাকা ট্রাফিক পুলিশ থাকা আর না-থাকা সমান।
কুতুপালং বাজার এলাকার জাবেদ নামের এক চাকরিজীবী বলেন, সকালে অফিসে যাওয়ার সময় প্রায় দেড় ঘণ্টা হাতে নিয়ে বের হতে হয়। কারণ, কুতুপালং বাজারের যানজটে অফিসে পৌঁছাতে প্রচুর সময় নষ্ট হয়। এই বাজারের রাস্তা এখন ব্যবসায়ী ও পার্কিংয়ের দখলে চলে যাওয়ায় আমাদের স্বাভাবিক চলাচল ব্যাহত হচ্ছে। কোটবাজারে সড়ক দখল করে ব্যবসা পরিচালনাকারী এক দোকানদার বলেন, আমরা অতিরিক্ত টাকা দিয়ে এই দোকান করি। আমরা কেন শৌখিনভাবে সড়ক দখল করব? টাকার বিনিময়ে এখানে বাজার বসিয়েছি। প্রতিদিন প্রতি দোকান থেকে দেড়শ থেকে আড়াইশ টাকা করে এক ভাই সংগ্রহ করেন। টাকা দিয়েই আমরা নিরাপদে ব্যবসা করছি।
গাড়ি পার্কিংয়ের দায়িত্বে থাকা এক লাইনম্যান জানান, এই পার্কিংয়ের বিনিময়ে নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকা আমাদের দিতে হয়। কারা এই টাকা নেয়, তা আমরা জানি না। আমরা শুধু ওপরের নির্দেশ পালন করি। টাকা না দিলে এখানে পার্কিং করতে দেওয়া হবে না। আমাদের পার্কিং বন্ধ করতে হলে আগে নিরাপদ পার্কিংয়ের ব্যবস্থা করে দিতে হবে। কুতুপালং বাজার ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক রুবেল বলেন, আমরা চাই, অবৈধ দোকানগুলো দ্রুত উচ্ছেদ করা হোক। উপজেলার গুরুত্বপূর্ণ সড়কে প্রতিদিন সকাল-বিকেল যানজট থাকলে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়। এ সমস্যা স্থায়ীভাবে সমাধান করতে হলে বাজার ইজারাদারকে কঠোর নিয়ন্ত্রণে আনতে হবে। অন্যথায় যানজট লেগেই থাকবে।
শাহপরী হাইওয়ে পুলিশের দায়িত্বরত কর্মকর্তা উপপরিদর্শক ফজলুল হক জানান, কুতুপালং বাজারে যানজট নিরসনে বাজার সমিতি, ইজারাদারসহ সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের সহযোগিতায় শিগগিরই উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করা হবে। কোটবাজারের যানজট নিরসনে ট্রাফিক পুলিশ কাজ করছে এবং নিয়মিত অভিযানও পরিচালিত হচ্ছে। তবে প্রশাসনের সুনির্দিষ্ট সমন্বয় ছাড়া এর স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা পান্না আক্তার বলেন, এ বিষয়ে আমরা শিগগিরই যৌথ অভিযান পরিচালনা করব। কেউই আইনের ঊর্ধ্বে নয়। সড়ক দখল করে গড়ে তোলা অবৈধ ঝুপড়ি দোকান ও পার্কিং উচ্ছেদের জন্য ইতিমধ্যে কাজ চলছে। যারা কুতুপালং সড়ক দখল করে বাজার বসিয়েছেন, তাঁদের বিরুদ্ধে অবশ্যই আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তিনি আরও বলেন, নিয়ম অনুযায়ী, ইজারা দেওয়ার শুরুতেই বাজারের মূল্যতালিকা প্রকাশ ও টাঙাতে হয়। কিন্তু অদৃশ্য কারণে তা করা হয়নি। আমি যোগদানের পরপরই বাজারের মূল্যতালিকা তৈরি করে অনুমোদনের জন্য কক্সবাজারে পাঠিয়েছি। অনুমোদন পেয়ে এলে শিগগিরই তা প্রকাশ্যে টাঙিয়ে দেওয়া হবে।

দিনাজপুর টিভির সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন