নভেম্বর ৫, ২০২৬, ০৪:২৬ পিএম
বিশ্বের বৃহত্তম গণতান্ত্রিক দেশ ভারতে প্রায় ২০ কোটি মুসলিমের রাজনৈতিক অধিকার ও প্রতিনিধিত্ব কতটা নিশ্চিত এবং দেশটির গণতন্ত্র মুসলিম সংখ্যালঘুদের প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ হচ্ছে কি না—তা নিয়ে নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়েছে। কারাবন্দি মুসলিম গবেষক শারজিল ইমামের দেওয়া একটি সাক্ষাৎকার ঘিরে এই আলোচনার সূত্রপাত হয়েছে। বৃহস্পতিবার আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরা এই তথ্য প্রকাশ করে।
গত ২৯ সেপ্টেম্বর দিল্লির কারাগার থেকে ভারতীয় সংবাদমাধ্যম দ্য কুইন্ট-কে দীর্ঘ সাক্ষাৎকার দেন ৩৮ বছর বয়সী শারজিল ইমাম। ২০২০ সাল থেকে তিনি কারাবন্দি রয়েছেন। ওই সাক্ষাৎকারে ভারতের জাতীয়তাবাদ, ধর্মনিরপেক্ষতা ও সংবিধান নিয়ে নানা প্রশ্ন তোলেন তিনি। তার দাবি, ভারতে প্রায় ২১ কোটি মুসলিম বসবাস করলেও গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় তাদের রাজনৈতিক প্রভাব ও প্রতিনিধিত্ব অত্যন্ত সীমিত। দেশের জনসংখ্যার প্রায় ১৪ শতাংশ মুসলিম হওয়া সত্ত্বেও রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণে তাদের অংশগ্রহণ পর্যাপ্ত নয় বলে মন্তব্য করেন তিনি।
শারজিল অভিযোগ করেন যে ভারতের সংবিধানে ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ এবং দেশটির ধর্মনিরপেক্ষতার ধারণা মুসলিমদের রাজনৈতিক অধিকার নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয়েছে। তার মতে, কার্যকর রাজনৈতিক অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ ও আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব চালুর বিকল্প নেই।
বিহার রাজ্যের জাহানাবাদ জেলার বাসিন্দা শারজিল ইমাম মুম্বাইয়ের ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি থেকে কম্পিউটার বিজ্ঞানে পড়াশোনা শেষ করে সফটওয়্যার প্রকৌশলী হিসেবে কাজ করেন। পরবর্তী সময়ে তিনি গবেষণায় ফিরে যান এবং দিল্লির জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ে ভারতের মুসলিমদের রাজনৈতিক ইতিহাস নিয়ে গবেষণা শুরু করেন। ২০১৯ সালে নরেন্দ্র মোদি সরকারের নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন পাসের পর দেশজুড়ে প্রতিবাদ শুরু হলে মুসলিম নারীদের নেতৃত্বে দিল্লির শাহিনবাগে গড়ে ওঠা আন্দোলনের অন্যতম সংগঠক ছিলেন তিনি। ২০২০ সালের জানুয়ারিতে আন্দোলনের সময় দেওয়া একটি বক্তব্যের জেরে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে দিল্লির সাম্প্রদায়িক সহিংসতায় উসকানি ও ষড়যন্ত্রসহ বিভিন্ন অভিযোগে মামলা করা হয় তার বিরুদ্ধে। ওই সহিংসতা শুরু হওয়ার সময় তিনি কারাগারে ছিলেন। তার সঙ্গে আরও বেশ কয়েকজন মুসলিম শিক্ষার্থী ও অধিকারকর্মী দীর্ঘদিন ধরে বিচার ছাড়াই কারাবন্দি রয়েছেন বলে মানবাধিকার সংগঠনগুলোর অভিযোগ।
সাক্ষাৎকারে ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের অন্যতম নেতা মহাত্মা গান্ধী ও প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরুর রাজনৈতিক দর্শন নিয়েও সমালোচনা করেন শারজিল। তার দাবি, কংগ্রেসের ধর্মনিরপেক্ষ রাজনীতি এবং ক্ষমতাসীন বিজেপির হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির মধ্যে মৌলিক কিছু মিল রয়েছে। উভয় ধারাই ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ ও রাজনৈতিক ক্ষমতা ভাগাভাগির ক্ষেত্রে একই ধরনের ধারণা অনুসরণ করে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
তবে শারজিলের এসব বক্তব্যের সঙ্গে একমত নন অনেক বিশ্লেষক। আইন গবেষক মোহাম্মদ জিশান আহমদের মতে, শারজিল গুরুত্বপূর্ণ কিছু ঐতিহাসিক ও রাজনৈতিক প্রশ্ন তুলেছেন, তবে ধর্মনিরপেক্ষতা ও হিন্দুত্ববাদকে একইভাবে দেখা যুক্তিসংগত নয়। তার মতে, মুসলিম সমাজের ভেতরে শ্রেণি, জাতপাত, নারী অধিকার ও মতাদর্শগত পার্থক্যও সমানভাবে গুরুত্ব পাওয়া প্রয়োজন। অন্যদিকে তুরস্কের ইবনে খালদুন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ইরফান আহমদ মনে করেন, ভারতের মুসলিমদের রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বের সংকট কেবল কোনো একটি রাজনৈতিক দলের কারণে তৈরি হয়নি; বরং দেশটির জাতীয়তাবাদের ধারণার মধ্যেই এর গভীরে শিকড় রয়েছে।
শারজিল ভারতের নির্বাচনী ব্যবস্থায় আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব চালুর পক্ষে মত দিয়েছেন। তার মতে, বর্তমান নির্বাচনী পদ্ধতিতে সংখ্যাগরিষ্ঠদের প্রভাব বেশি থাকায় মুসলিমরা দীর্ঘমেয়াদে রাজনৈতিকভাবে পিছিয়ে পড়ছেন। এ ক্ষেত্রে কবি ও দার্শনিক মুহাম্মদ ইকবালের রাজনৈতিক চিন্তাধারার কথাও তুলে ধরেন তিনি। তবে তার এসব প্রস্তাব ভারতের সংবিধান ও ধর্মনিরপেক্ষ গণতন্ত্রের ধারণার সঙ্গে সাংঘর্ষিক হতে পারে বলে মনে করেন বিরোধীরা।
এদিকে শারজিলের সঙ্গে একই মামলায় কারাবন্দি অপর সাবেক শিক্ষার্থী নেতা উমর খালিদের বিষয়টিও নতুন করে আলোচনায় এসেছে। উমর খালিদ ভারতের সংবিধান ও ধর্মনিরপেক্ষতার কাঠামোর মধ্যেই থেকে রাজনৈতিক আন্দোলনের পক্ষে কথা বলে আসছেন। তার মুক্তির দাবিতে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বিভিন্ন ব্যক্তি ও মানবাধিকার সংগঠন সরব থাকলেও শারজিলের ক্ষেত্রে ভিন্ন চিত্র দেখা যায়। বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, উমর খালিদের বিষয়ে উদারপন্থী ও বামপন্থীদের সরব অবস্থান থাকলেও শারজিলের রাজনৈতিক বক্তব্যে ধর্মীয় পরিচয় ও মুসলিমদের স্বতন্ত্র রাজনৈতিক অধিকারকে গুরুত্ব দেওয়ার কারণে তাদের অনেকেই এ ক্ষেত্রে নীরব ভূমিকা পালন করছেন। সব মিলিয়ে শারজিল ইমামের এই সাক্ষাৎকার ভারতের রাজনীতিতে সংখ্যালঘু অধিকার ও প্রতিনিধিত্বের প্রশ্নটিকে আবারও সামনে নিয়ে এসেছে।

দিনাজপুর টিভির সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন