বৃহস্পতিবার, ০৫ নভেম্বর, ২০২৬,
দক্ষিণ এশিয়া রাজনীতি

মার্কিন নির্বাচনে ট্রাম্পের পরাজয় ভারত ও পাকিস্তানের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে কী প্রভাব ফেলবে

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

নভেম্বর ৫, ২০২৬, ০১:০০ পিএম

মার্কিন নির্বাচনে ট্রাম্পের পরাজয় ভারত ও পাকিস্তানের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে কী প্রভাব ফেলবে

ছবি: সংগৃহীত

যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে কংগ্রেসের উভয় কক্ষের নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের রিপাবলিকান পার্টি। এর ফলে মেয়াদের বাকি সময়টায় আইন প্রণয়ন থেকে শুরু করে পররাষ্ট্রনীতি বাস্তবায়ন—বিভিন্ন ক্ষেত্রে নতুন রাজনৈতিক বাধার মুখে পড়তে পারেন ট্রাম্প। ওয়াশিংটনের এই ক্ষমতার পালাবদলের প্রভাব শুধু যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেই সীমাবদ্ধ থাকার সম্ভাবনা নেই; দক্ষিণ এশিয়ার ভারত ও পাকিস্তানের সঙ্গেও দেশটির সম্পর্কের হিসাব-নিকাশে আসতে পারে পরিবর্তন। ভারতের জন্য বাণিজ্য চুক্তি ও এইচ-১বি ভিসা নিয়ে নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে। অন্যদিকে, ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ মহলের সঙ্গে পাকিস্তানের করা ব্যবসায়িক ও প্রতিরক্ষা চুক্তি পড়তে পারে মার্কিন কংগ্রেসের তদন্তের আওতায়।

ইন্ডিয়া টুডের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কংগ্রেসের উভয় কক্ষের নিয়ন্ত্রণ হারানো ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করবে। ২০২৯ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত প্রেসিডেন্টের দায়িত্বে থাকলেও ডেমোক্র্যাটদের সংখ্যাগরিষ্ঠতার কারণে আইন পাস ও প্রশাসনিক কর্মসূচি বাস্তবায়নে বাধার মুখে পড়তে পারেন তিনি। ইতিমধ্যে ট্রাম্পের পররাষ্ট্রনীতি এবং তাঁর পরিবারের ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ড নিয়ে তদন্তের ইঙ্গিত দিয়েছেন ডেমোক্র্যাট আইনপ্রণেতারা। এতে ভারতের সঙ্গে ওয়াশিংটনের বাণিজ্য আলোচনায় যেমন নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে, তেমনি পাকিস্তানের সঙ্গে ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ মহলের বিভিন্ন চুক্তিও নতুন করে আলোচনায় আসতে পারে।

মধ্যবর্তী নির্বাচনে পরাজয়ের পর নিজের রাজনৈতিক অবস্থান ধরে রাখতে নতুন কিছু সাফল্য দেখানোর চেষ্টা করতে পারেন ট্রাম্প। সে ক্ষেত্রে ভারতের সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে থাকা বাণিজ্য চুক্তি তাঁর অগ্রাধিকারের তালিকায় আসতে পারে। অন্যদিকে, নয়াদিল্লিও এই পরিস্থিতিকে নিজেদের স্বার্থে কাজে লাগানোর সুযোগ হিসেবে দেখতে পারে। কয়েক মাস ধরে দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে আলোচনা চললেও এখনো চূড়ান্ত সমাধান আসেনি। চীন ও ভিয়েতনামের মতো প্রতিযোগী দেশগুলোর তুলনায় যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে সুবিধাজনক শুল্ক পাওয়ার নিশ্চয়তা চাইছে ভারত।

এদিকে, মার্কিন বাণিজ্য আইনের ৩০১ ধারার আওতায় ভারতসহ কয়েকটি দেশের বিরুদ্ধে তদন্ত চালাচ্ছে ট্রাম্প প্রশাসন। এসব দেশ অতিরিক্ত উৎপাদন সক্ষমতা ব্যবহার করে মার্কিন অর্থনীতির ক্ষতি করছে কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এই তদন্তও দুই দেশের বাণিজ্য চুক্তির পথে জটিলতা তৈরি করেছে। বিশ্লেষকদের মতে, নির্বাচনের পর ট্রাম্পের রাজনৈতিক অবস্থান ও কংগ্রেসে তাঁর দলের নিয়ন্ত্রণ কমে যাওয়ায় আলোচনার টেবিলে ভারতের দর-কষাকষির সুযোগ বাড়তে পারে। একই সঙ্গে চুক্তি করতে নয়াদিল্লির ওপর মার্কিন চাপও কিছুটা কমতে পারে। তবে এতে দুই দেশের বাণিজ্যিক বিরোধের সব সমস্যার সমাধান হবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। কারণ, নির্বাহী ক্ষমতা ব্যবহার করে ট্রাম্প এখনো শুল্ক আরোপের সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন। ডেমোক্র্যাটদের নিয়ন্ত্রণে থাকা কংগ্রেস সরাসরি তাঁর এসব সিদ্ধান্ত বাতিল করতে না পারলেও শুল্কনীতির কারণে মার্কিন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও সাধারণ মানুষ কীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন, তা নিয়ে তদন্ত ও আলোচনা বাড়াতে পারবে। এর মাধ্যমে প্রশাসনের ওপর নীতিগত পরিবর্তনের চাপ তৈরি হতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসননীতিতেও রাজনৈতিক পালাবদলের প্রভাব পড়তে পারে। বিশেষ করে দক্ষ বিদেশি কর্মীদের জন্য চালু থাকা এইচ-১বি ভিসা কর্মসূচি নিয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের কঠোর অবস্থান ভারতীয় পেশাজীবীদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি করেছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই ভিসার ক্ষেত্রে এক লাখ ডলারের ফি নির্ধারণ করেছে ট্রাম্প প্রশাসন। পাশাপাশি যেসব প্রতিষ্ঠান মার্কিন কর্মীদের ছাঁটাই করছে, তাদের এইচ-১বি ভিসার আবেদন আরও কঠোরভাবে যাচাই করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকে। এতে সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়েছে ভারতীয় প্রযুক্তি পেশাজীবীদের ওপর। অনুমোদিত এইচ-১বি ভিসার প্রায় চার ভাগের তিন ভাগই ভারতীয় নাগরিকদের দেওয়া হয়। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তি খাতে ভারতীয় কর্মীদের গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান রয়েছে।

ট্রাম্প প্রশাসনের এই নীতির সমালোচনা করেছেন ডেমোক্র্যাট আইনপ্রণেতাদের অনেকে। কংগ্রেসে দলটির নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হওয়ায় দক্ষ বিদেশি কর্মী নিয়োগ সীমিত করার অর্থনৈতিক প্রভাব নিয়ে আরও আলোচনা ও তদন্ত হতে পারে। বিশেষ করে মার্কিন প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো এই নীতির কারণে কী ধরনের সমস্যায় পড়ছে, তা গুরুত্ব পেতে পারে। তবে এর অর্থ এই নয় যে, রাতারাতি ভিসানীতিতে পরিবর্তন আসবে। বরং দীর্ঘ মেয়াদে এইচ-১বি কর্মসূচি নিয়ে প্রশাসনের অবস্থানে পরিবর্তনের চাপ তৈরি হতে পারে, যা ভারতীয় পেশাজীবীদের জন্য কিছুটা স্বস্তির সম্ভাবনা তৈরি করবে। তবে ভারতের জন্য পরিস্থিতির সব দিক ইতিবাচক নয়। দেশটির মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে ডেমোক্র্যাটদের সমালোচনা দীর্ঘদিনের। বিশেষ করে ধর্মীয় স্বাধীনতা ও সংখ্যালঘুদের অধিকার নিয়ে তারা আরও কঠোর অবস্থান নিতে পারেন। এতে নয়াদিল্লি ও ওয়াশিংটনের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে নতুন করে টানাপড়েন তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

ভারতের ক্ষেত্রে যেখানে বাণিজ্য ও ভিসানীতিতে নতুন সম্ভাবনার কথা বলা হচ্ছে, সেখানে পাকিস্তানের জন্য পরিস্থিতি ভিন্ন হতে পারে। গত দেড় বছরে ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তুলতে নানা উদ্যোগ নিয়েছে ইসলামাবাদ। এর অংশ হিসেবে ট্রাম্পের পরিবারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গেও চুক্তি ও সমঝোতা করেছে পাকিস্তান। এর মধ্যে রয়েছে ট্রাম্প পরিবারের ক্রিপ্টোকারেন্সি প্রতিষ্ঠান ওয়ার্ল্ড লিবার্টি ফিন্যানশিয়ালের একটি সহযোগী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে পাকিস্তানের সমঝোতা স্মারক। প্রতিষ্ঠানটির অন্যতম সহপ্রতিষ্ঠাতা মার্কিন বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ। এ ছাড়া চলতি বছরের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক প্রতিষ্ঠান পাওয়ারাসের সঙ্গে চালকবিহীন আকাশযান বা ড্রোন ব্যবস্থাসংক্রান্ত চুক্তি করে পাকিস্তান। এসব উদ্যোগে নেতৃত্ব দিয়েছেন দেশটির সেনাপ্রধান আসিম মুনির। ট্রাম্প তাঁকে ‘আমার প্রিয় ফিল্ড মার্শাল’ বলেও অভিহিত করেছেন। গত সেপ্টেম্বরে গুরুত্বপূর্ণ খনিজ সম্পদ উন্নয়নে মার্কিন প্রতিষ্ঠান ইউএস স্ট্র্যাটেজিক মেটালসের সঙ্গে ৫০ কোটি ডলারের সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করে পাকিস্তান। পাশাপাশি নিউইয়র্কে পাকিস্তানের রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন রুজভেল্ট হোটেল সংস্কার নিয়েও একটি চুক্তি রয়েছে।

এখন কংগ্রেসের উভয় কক্ষের নিয়ন্ত্রণ ডেমোক্র্যাটদের হাতে যাওয়ায় এসব চুক্তি নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে। বিশেষ করে ট্রাম্প পরিবারের ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ড, শেয়ার লেনদেন ও ক্রিপ্টোকারেন্সি ব্যবসা তদন্তের আওতায় আনার ইঙ্গিত দিয়েছেন ডেমোক্র্যাট আইনপ্রণেতারা। ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনার এবং ছেলে ডোনাল্ড ট্রাম্প জুনিয়রের ব্যবসায়িক লেনদেনও বাড়তি নজরদারির মুখে পড়তে পারে। সে ক্ষেত্রে ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ মহলের সঙ্গে পাকিস্তানের করা বিভিন্ন ব্যবসায়িক ও প্রতিরক্ষা চুক্তিও তদন্তকারীদের আগ্রহের বিষয় হয়ে উঠতে পারে। এ ধরনের তদন্তে পাকিস্তানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট চুক্তিগুলো আলোচনায় এলে ইসলামাবাদের পাশাপাশি দেশটির সামরিক নেতৃত্বও অস্বস্তিকর পরিস্থিতিতে পড়তে পারে।

মার্কিন কংগ্রেসে ক্ষমতার পরিবর্তন দক্ষিণ এশিয়ার দুই প্রতিদ্বন্দ্বী দেশ ভারত ও পাকিস্তানের জন্য ভিন্ন পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে। ভারতের ক্ষেত্রে বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে নিজেদের শর্ত আদায়ের সুযোগ তৈরি হতে পারে। পাশাপাশি এইচ-১বি ভিসা কর্মসূচি নিয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের কঠোর অবস্থানে পরিবর্তনের জন্য ডেমোক্র্যাটদের চাপ ভূমিকা রাখতে পারে। তবে মানবাধিকার ও ধর্মীয় স্বাধীনতার প্রশ্নে নয়াদিল্লির ওপর রাজনৈতিক চাপ বাড়ার সম্ভাবনাও রয়েছে। অন্যদিকে, ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ মহলের সঙ্গে পাকিস্তানের গড়ে তোলা ব্যবসায়িক, প্রতিরক্ষা ও কৌশলগত সম্পর্ক নতুন করে মার্কিন কংগ্রেসের নজরদারিতে আসতে পারে। 

বিশেষ করে ট্রাম্প পরিবারের ব্যবসায়িক স্বার্থ নিয়ে তদন্ত শুরু হলে এসব চুক্তির স্বচ্ছতা ও প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে। সব মিলিয়ে, ওয়াশিংটনের রাজনৈতিক পরিবর্তন ভারত ও পাকিস্তানের জন্য একই ধরনের বার্তা দিচ্ছে না। ভারতের সামনে যেমন বাণিজ্য ও অভিবাসননীতি নিয়ে আলোচনার নতুন ক্ষেত্র তৈরি হতে পারে, তেমনি পাকিস্তানকে ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ মহলের সঙ্গে করা চুক্তিগুলোর বিষয়ে বাড়তি রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক চাপ মোকাবিলা করতে হতে পারে।