এপ্রিল ১৮, ২০২৬, ০৯:৪৩ এএম
বহু প্রতীক্ষিত ‘মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশ’ শেষ পর্যন্ত আইনে রূপান্তর না করে বাতিলের সিদ্ধান্ত নেওয়ায় গভীর হতাশা ও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন মানবাধিকার বিশ্লেষক, ভুক্তভোগী পরিবার এবং কমিশনের কর্মকর্তারা। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের বিচারে কমিশনকে শক্তিশালী করতে যে পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল, তা বর্তমান সরকারের এই সিদ্ধান্তে কার্যকারিতা হারাবে বলে মনে করা হচ্ছে।
সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, সরকার মূলত গুম ও ক্রসফায়ারে জড়িত প্রভাবশালী ব্যক্তিদের আইনি সুরক্ষা বা ‘দায়মুক্তি’ দিতেই এই নজিরবিহীন পদক্ষেপ নিচ্ছে।
সংবিধানের বিধান অনুযায়ী, কোনো অধ্যাদেশ সংসদের প্রথম অধিবেশন শুরু হওয়ার ৩০ দিনের মধ্যে বিল আকারে উত্থাপন ও পাস না হলে তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে যায়। ১২ এপ্রিল সেই সময়সীমা শেষ হতে চলায় অধ্যাদেশটি এখন বাতিলের দ্বারপ্রান্তে।
এর ফলে মানবাধিকার কমিশনের যে বিশেষ ক্ষমতা—যেমন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থার বিরুদ্ধে সরাসরি তদন্ত চালানো এবং নথিপত্র তলব করার ক্ষমতা—তা পুরোপুরি বিলুপ্ত হয়ে যাবে।আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান সংসদে দাবি করেছেন, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (আইসিটি) আইনে গুমের সংজ্ঞা ও সাজার সঙ্গে এই অধ্যাদেশের কিছু সাংঘর্ষিক অবস্থা রয়েছে। আইসিটি আইনে গুমের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড রাখা হলেও এই অধ্যাদেশে তা ছিল ১০ বছর।
মন্ত্রীর যুক্তি, ভুক্তভোগীদের সুবিচারের স্বার্থেই এই যাচাই-বাছাই প্রয়োজন। তবে গুমের শিকার পরিবারের স্বজন ও সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার আরমান এই যুক্তি খণ্ডন করে বলেন, "সরকারের সদিচ্ছা থাকলে অধ্যাদেশটি প্রথমে পাস করে পরে সংশোধনী আনা যেত। এভাবে সরাসরি বাতিল করে দেওয়া মানে হলো বিচারপ্রক্রিয়াকে দীর্ঘসূত্রিতায় ফেলা।"
জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের (এনএইচআরসি) চেয়ারম্যান ও সাবেক বিচারপতি মইনুল ইসলাম চৌধুরী এই পদক্ষেপকে ‘দুর্ভাগ্যজনক ও নজিরবিহীন’ বলে আখ্যা দিয়েছেন। তিনি জানান, কমিশনকে বিশ্বমানের ‘এ’ ক্যাটাগরিতে উন্নীত করার যে লক্ষ্য ছিল, এই সিদ্ধান্তে তা মুখ থুবড়ে পড়বে। বর্তমানে কমিশনের কাছে গুম ও নির্যাতনের হাজার হাজার অভিযোগ জমা আছে, যেগুলোর তদন্ত শুরু করা এখন অনিশ্চিত হয়ে পড়ল।
ভুক্তভোগীদের আহাজারি এখন আরও তীব্র হয়েছে। ২০১৬ সালে গুম ও পরে নির্যাতনে নিহত মোস্তাফিজুর রহমান সিফাতের ভাই মাহফুজ শাকিল বলেন, "ফ্যাসিস্ট সরকারের আমলে আমরা বিচার পাইনি, এখন নতুন সরকারের এই সিদ্ধান্তে আমরা স্তম্ভিত।" সাতক্ষীরায় ক্রসফায়ারে পা হারানো জাহাঙ্গীর আলম ও সামসুল হক বুলবুলদের কণ্ঠেও একই সুর। তারা মনে করছেন, হাসিনার আমলের ‘নখদন্তহীন’ কমিশনের মতো এই কমিশনকেও অকেজো করে রাখা হচ্ছে। এদিকে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা রাইট টু ফ্রিডম ও টিআইপি-র মতো প্রতিষ্ঠানগুলোও বাংলাদেশ সরকারের এই উদ্যোগে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।


দিনাজপুর টিভির সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন