জুলাই ২৩, ২০২৬, ১১:০৩ এএম
চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের ঐতিহাসিক দিনপঞ্জিতে তেইশে জুলাই এক তাৎপর্যপূর্ণ দিন হিসেবে স্মরণীয়। দুই হাজার চব্বিশ সালের এই দিনে সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলনরত বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতা তাদের চার দফা জরুরি দাবি মেনে নিতে তৎকালীন সরকারকে আটচল্লিশ ঘণ্টার কঠোর আলটিমেটাম দিয়েছিল। রাজধানী ঢাকার ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক সারজিস আলম এই সময়সীমা বেঁধে দিয়েছিলেন।
দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত সরকারের সঙ্গে সব ধরনের আলোচনা বর্জনের ঘোষণা দিয়েছিলেন ছাত্রনেতারা।শিক্ষার্থীদের পক্ষ থেকে উত্থাপিত চার দফার মধ্যে ছিল অবিলম্বে দেশজুড়ে ইন্টারনেট সংযোগ সম্পূর্ণ সচল করা, কারফিউ প্রত্যাহার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো থেকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সরিয়ে আবাসিক হল খুলে দেওয়া এবং আন্দোলনের সমন্বয়কদের শতভাগ নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।
সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়েছিল যে আন্দোলনের গুরুত্বপূর্ণ তিন সমন্বয়ক আসিফ মাহমুদ, আবু বাকের মজুমদার ও রিফাত রশীদ আঠারো জুলাই থেকে নিখোঁজ রয়েছেন। সন্তানের সন্ধানে আসিফ মাহমুদের বাবা ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গ পর্যন্ত ঘুরেও কোনো সন্ধান পাননি বলে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়। দাবিগুলো পূরণ হলেই কেবল সংলাপের পরিবেশ তৈরি হতে পারে বলে স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছিলেন শিক্ষার্থীরা।
অন্যদিকে আন্দোলন দমনের নামে ইন্টারনেট বন্ধ রেখে রাজধানীসহ সারা দেশে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সাঁড়াশি অভিযান চলছিল। ওই এক দিনেই ঢাকায় নতুন করে আটত্রিশটি মামলা দায়ের করা হয় এবং সতেরো থেকে তেইশে জুলাই পর্যন্ত এক সপ্তাহে দেশজুড়ে গ্রেপ্তারের সংখ্যা তিন হাজার ছাড়িয়ে যায়। গভীর রাতে পুলিশ ও তৎকালীন ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীরা শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন ফ্ল্যাট ও মেসে হানা দিয়ে ব্যাপক ধরপাকড় চালায়, যার ফলে সাধারণ শিক্ষার্থী ও তাদের পরিবারের মধ্যে চরম আতঙ্ক তৈরি হয়।
সিএমএম আদালত প্রাঙ্গণে গ্রেপ্তারকৃতদের স্বজনরা পরিচয়পত্র ও প্রয়োজনীয় সামগ্রী নিয়ে অপেক্ষায় থাকার পাশাপাশি পুলিশের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তার বাণিজ্যের গুরুতর অভিযোগ তুলেছিলেন।এমন এক অস্থিতিশীল পরিস্থিতির মধ্যেই সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশনা অনুযায়ী সরকারি চাকরিতে তিরানব্বই শতাংশ মেধা ও সাত শতাংশ কোটা পদ্ধতি কার্যকর করে প্রজ্ঞাপন জারি করেছিল তৎকালীন সরকার। সে সময় সাবেক আইনমন্ত্রী আনিসুল হক প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন যে বিনা অপরাধে কাউকে হয়রানি করা হবে না, তবে শিক্ষামন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী নিরাপত্তা নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত হল খোলার দাবি সরাসরি নাকচ করে দেন।
এমনকি র্যাবের তৎকালীন মহাপরিচালক হারুন অর রশিদ আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার প্রকাশ্য হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন এবং সে সময় পর্যন্ত নিহতের সংখ্যা তিন শত পেরিয়ে গিয়েছিল।টানা ছয় দিন ইন্টারনেট সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন থাকার পর ওই দিন রাতে ঢাকা ও চট্টগ্রামে সীমিত পরিসরে ব্রডব্যান্ড চালু করা হলেও সাধারণ ব্যবহারকারীদের বড় অংশই এর বাইরে ছিল। সংবাদপত্রের সম্পাদক ও প্রকাশকরা সাংবাদিকদের ওপর হামলা, প্রাণহানি এবং তথ্যগত ব্ল্যাকআউটের কারণে গুজব ছড়িয়ে পড়ার বিষয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছিলেন। সরকার ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সেই নির্বিচার দমন-পীড়নই পরবর্তী সময়ে দেশব্যাপী অসন্তোষের স্ফুলিঙ্গকে আরও তীব্র করে তুলেছিল।

দিনাজপুর টিভির সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন