রবিবার, ০৪ অক্টোবর, ২০২৬,
জ্বালানি নিরাপত্তা

সৌরবিদ্যুৎ থেকে ১০ হাজার মেগাওয়াট উৎপাদনের নতুন লক্ষ্য

জাতীয় ডেস্ক

অক্টোবর ৪, ২০২৬, ০৪:২৮ পিএম

সৌরবিদ্যুৎ থেকে ১০ হাজার মেগাওয়াট উৎপাদনের নতুন লক্ষ্য

বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদার ও বিদ্যুতের বাড়তি চাহিদা পূরণে নতুন রোডম্যাপ হাতে নিয়েছে সরকার। গত ১৪ সেপ্টেম্বর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কাছে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় এই মহাপরিকল্পনা উপস্থাপন করে।

এতে স্বল্প, মধ্যম ও দীর্ঘমেয়াদি সুস্পষ্ট লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। দেশে বর্তমানে বিদ্যুতের চাহিদা দ্রুত বাড়ছে। গত বছরের সেপ্টেম্বরে মোট চাহিদা ছিল ১৫ হাজার ৫৭০ মেগাওয়াট। ঠিক এক বছরের ব্যবধানে তা ১৭ শতাংশ বেড়েছে। ২০২৬ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর এই চাহিদা ১৮ হাজার ১৭৮ মেগাওয়াটে দাঁড়িয়েছে।

তাৎক্ষণিক চাহিদা মেটাতে ২০২৬-২০২৭ মেয়াদের জন্য ২০ হাজার মেগাওয়াট সরবরাহের পরিকল্পনা করা হয়েছে। এর মধ্যে গ্যাস ও কয়লা থেকে ছয় হাজার মেগাওয়াট করে, তরল জ্বালানি থেকে চার হাজার, আঞ্চলিক আমদানি থেকে দুই হাজার ৫০০ এবং ছাদে স্থাপিত সৌরবিদ্যুৎ থেকে সর্বোচ্চ চার হাজার মেগাওয়াট আসবে।

সৌর সরঞ্জাম আমদানিতে শুল্ক ৬৪ শতাংশ থেকে কমিয়ে মাত্র এক শতাংশ করা হয়েছে। অগ্রিম আয়করও ১৫ শতাংশ থেকে এক শতাংশে নামানো হয়েছে। প্রতি ইউনিট সৌরবিদ্যুতের দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ১০ টাকা ৫০ পয়সা।

মধ্যমেয়াদে ২০২৮-২০৩০ সালের মধ্যে জাতীয় গ্রিডে আরও ১২ হাজার ৯৪০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ যুক্ত করার লক্ষ্য রয়েছে। প্রক্ষেপিত ২৫ হাজার মেগাওয়াট সর্বোচ্চ চাহিদা মেটাতে এই উদ্যোগ। এর মধ্যে সৌরবিদ্যুৎ থেকেই আসবে ১০ হাজার মেগাওয়াট। সিরাজগঞ্জ, সোনাগাজী ও রামপালে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্ব বা পিপিপি মডেলে বড় সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প গড়ে তোলা হবে।

এ ছাড়া ওপেক্স মডেলের অধীনে বেসরকারি উদ্যোক্তাদের যুক্ত করা হচ্ছে। গত ২৮ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এক হাজার ৪০০ জন আবেদনকারী ফর্ম সংগ্রহ করেছেন। এই উদ্যোগে বিশ্বব্যাংকের ৩৫ কোটি ডলারের ঋণের প্রাথমিক অনুমোদন মিলেছে। পাশাপাশি এশীয় অবকাঠামো বিনিয়োগ ব্যাংক ও এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের সঙ্গে অর্থায়নের আলোচনা চলছে।

বড়পুকুরিয়ায় ৩০০, পায়রায় এক হাজার ৩২০ এবং মাতারবাড়ীতে এক হাজার ৩২০ মেগাওয়াট কয়লাভিত্তিক প্রকল্প থেকে মোট দুই হাজার ৯৪০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্য রয়েছে। গ্রিড আধুনিকায়নের পাশাপাশি ব্যাটারি এনার্জি স্টোরেজ সিস্টেম বা বিইএসএস স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

দীর্ঘমেয়াদি বা ২০৩১-২০৪০ সালের পরিকল্পনায় মোট উৎপাদনের অন্তত ৩০ শতাংশ আসবে নবায়নযোগ্য উৎস থেকে। তখন ব্যয়বহুল তেলভিত্তিক কেন্দ্রগুলো পর্যায়ক্রমে বন্ধ করা হবে। অন্তর্ভুক্ত হবে ক্ষুদ্র মড্যুলার রিয়্যাক্টর বা এসএমআর পারমাণবিক প্রযুক্তি। প্রায় ৪০ হাজার মেগাওয়াট প্রক্ষেপিত চাহিদা মেটাতে প্রতিবেশী দেশ থেকে বিদ্যুৎ আমদানির পরিকল্পনাও থাকছে।

সমান্তরালভাবে গ্যাস সরবরাহ বাড়ানোর কৌশল নেওয়া হয়েছে। স্থলভাগে এক হাজার এমএমসিএফডি ক্ষমতার একটি এলএনজি টার্মিনাল এবং কুতুবদিয়ায় ৬০০ এমএমসিএফডি ক্ষমতার এফএসআরইউ স্থাপনে চীনা রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চূড়ান্ত আলোচনা চলছে। ৯৬ কিলোমিটার দীর্ঘ ফেনী-বাখরাবাদ পাইপলাইনের জরিপও শেষ করার পরিকল্পনা রয়েছে।

স্থলভাগে প্রথম ধাপে নির্ধারিত ১৫০টি অনুসন্ধান কূপের মধ্যে ৩১টির খনন শেষ হয়েছে। ২০৩১-২০৩৫ মেয়াদের মধ্যে দ্বিতীয় ধাপে আরও ১৫০টি কূপ খনন করা হবে। অফশোরে আন্তর্জাতিক কোম্পানিগুলোর জন্য ‍‍`বাংলাদেশ অফশোর মডেল পিএসসি-২০২৬‍‍` অনুযায়ী দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে।

উৎপাদনের পরিসংখ্যানেও পরিবর্তন আসছে। গত বছরের সেপ্টেম্বরে দেশে মোট ১৫ হাজার ২৭১ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদিত হয়। এর মধ্যে গ্যাস থেকে পাঁচ হাজার ৮৭৫, কয়লা থেকে চার হাজার ৭১৯ এবং তরল জ্বালানি থেকে দুই হাজার ৮১২ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ গ্রিডে যুক্ত হয়েছিল।

অপরদিকে, ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরের জন্য ১৫ হাজার ৮৫৯ মেগাওয়াট উৎপাদনের প্রাক্কলন করা হয়েছে। এই সময়ে গ্যাসভিত্তিক উৎপাদন বেড়ে পাঁচ হাজার ৯৭৭ মেগাওয়াট হলেও কয়লাভিত্তিক উৎপাদন কমে চার হাজার ৩৬৩ মেগাওয়াটে নামতে পারে। কয়লার ঘাটতি সামাল দিতে তরল জ্বালানিভিত্তিক কেন্দ্রগুলো থেকে উৎপাদন বাড়িয়ে তিন হাজার ৭৯১ মেগাওয়াট নির্ধারণের পরিকল্পনা চলছে। জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা সরকারের নবায়নযোগ্য শক্তির অগ্রাধিকারকে প্রশংসনীয় বলছেন। বিশ্বব্যাপী কয়লা প্রকল্পে অর্থায়ন কমে আসায় অভ্যন্তরীণ গ্যাস অনুসন্ধান দ্রুত এগিয়ে নেওয়ার তাগিদ দিয়েছেন তারা।