অক্টোবর ৩১, ২০২৬, ০২:৫৭ পিএম
গ্রামীণ উন্নয়ন এবং সামাজিক নিরাপত্তা কার্যক্রমে প্রান্তিক মানুষের সরাসরি সম্পৃক্ততা বাড়াতে চার দশকের বেশি সময় পর আবার কার্যকর হতে যাচ্ছে গ্রাম সরকার ব্যবস্থা। ইতিমধ্যে ‘গ্রাম সরকার আইন ২০২৬’-এর খসড়া তৈরি করে জনসাধারণের মতামত আহ্বান করেছে স্থানীয় সরকার বিভাগ। আগামী ১৭ নভেম্বরের মধ্যে যে কেউ এই খসড়ার ওপর মতামত পাঠাতে পারবেন।
স্থানীয় সরকার বিভাগের নিজস্ব ওয়েবসাইটে প্রবেশ করে বিজ্ঞপ্তিতে দেওয়া নির্দিষ্ট ই-মেইলে মতামত পাঠানো যাবে।
নাগরিকদের মতামত পাওয়ার পর আইনের খসড়াটি চূড়ান্ত করে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে পাঠানো হবে। নতুন এই কাঠামোয় থাকছে ১৭ সদস্যের পরিচালনা পরিষদ।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, গত ৫ অক্টোবর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার নিয়মিত বৈঠকে গ্রাম সরকার পুনর্বহালের বিষয়ে প্রস্তাব ওঠে। পরবর্তীতে ২০০৯ সালে রহিত হওয়া ২০০৩ সালের গ্রাম সরকার আইন পরিমার্জন করে এই নতুন খসড়া প্রণয়ন করা হয়েছে। সংসদে বিলটি পাস হলে এটি আইন হিসেবে কার্যকর হবে।
নতুন খসড়ায় গ্রাম সরকারকে একাধিক দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে উন্নয়ন পরিকল্পনা তৈরি, স্থানীয় অবকাঠামো সংস্কার, নারী ও শিশু নির্যাতন দমন এবং মাদক ও জুয়া প্রতিরোধ। এর পাশাপাশি প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা, পরিবার পরিকল্পনা, পুষ্টি, টিকাদান, নিরাপদ পানি সরবরাহ ও স্যানিটেশন দেখভালের দায়িত্বও থাকছে। কৃষি, সমবায়, মৎস্য, প্রাণিসম্পদ, কুটিরশিল্প ও পরিবেশ সংরক্ষণের মতো কাজও তাদের তালিকায় রয়েছে।
স্থানীয় পর্যায়ের ছোটখাটো বিরোধ মীমাংসা এবং এলাকায় চলমান বিভিন্ন সরকারি প্রকল্পের কাজের অগ্রগতি ও আর্থিক হিসাব পর্যালোচনায় ভূমিকা রাখবে গ্রাম সরকার।
সময়ের প্রয়োজনে খসড়ায় বেশ কিছু আধুনিক দায়িত্বও যুক্ত হয়েছে। এর আওতায় সরকারের ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড, স্বাস্থ্য কার্ড, ক্রীড়া কার্ড এবং ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান প্রধানদের কার্ড বিতরণ ও তথ্য সংগ্রহে সহায়তা করবে তারা। এর বাইরে ভিজিএফ ও ভিজিডি খাদ্য সহায়তা কার্যক্রমে সহযোগিতা, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা অভিযান পরিচালনা এবং ব্যক্তি উদ্যোগে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনে সাধারণ মানুষকে উৎসাহ দেওয়ার দায়িত্বও দেওয়া হয়েছে।
সাবেক সচিব এবং সুশাসন কর্মী একেএম আবদুল আউয়াল মজুমদার এ বিষয়ে ইতিবাচক মূল্যায়ন তুলে ধরেছেন।
তিনি বলেন, গ্রাম সরকার ব্যবস্থা নিঃসন্দেহে একটি ভালো উদ্যোগ। এর মাধ্যমে সাধারণ মানুষের সাথে সরাসরি রাজনৈতিক নেতৃত্বের কাজের পথ তৈরি হবে। তবে দায়িত্বে সৎ ও যোগ্য ব্যক্তিদের আনতে হবে। আইন মেনে চললে জনগণের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অনীহা অনেকটাই দূর হতে পারে।
খসড়া প্রস্তাব অনুযায়ী, দেশের প্রতিটি ইউনিয়ন পরিষদের ওয়ার্ডে একটি করে গ্রাম সরকার গঠিত হবে। এতে থাকবেন একজন প্রধান, একজন উপদেষ্টা এবং ১৫ জন সাধারণ সদস্য। সংশ্লিষ্ট ওয়ার্ডের নির্বাচিত ইউনিয়ন পরিষদ সদস্য পদাধিকারবলে গ্রাম সরকারের প্রধান হবেন। সংরক্ষিত আসনের নারী সদস্য হবেন উপদেষ্টা। বাকি ১৫ জন সদস্য সংশ্লিষ্ট ওয়ার্ডের ভোটারদের প্রত্যক্ষ ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ ভোটের মাধ্যমে পাঁচ বছরের জন্য নির্বাচিত হবেন। এই নির্বাচনে মোট ভোটারের অন্তত ১০ শতাংশের উপস্থিতি বাধ্যতামূলক রাখা হয়েছে।
আইনটি কার্যকর হলে সারাদেশে সাড়ে চার হাজারের বেশি ইউনিয়নের প্রায় ৪১ হাজার ওয়ার্ডে সব মিলিয়ে প্রায় সাত লাখ স্থানীয় মানুষের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত হবে।
গ্রাম সরকারের কাজের ধারাবাহিকতা রক্ষায় প্রতি দুই মাসে অন্তত একবার পরিচালনা পরিষদের সভা করতে হবে। এছাড়া প্রতি ছয় মাসে অন্তত একবার সাধারণ ভোটারদের উপস্থিতিতে সাধারণ সভা ডাকতে হবে, যেখানে ওয়ার্ডের অন্তত ১০ শতাংশ ভোটারের উপস্থিতি প্রয়োজন। কাজের সুবিধার জন্য প্রয়োজন অনুযায়ী বিভিন্ন কমিটি বা সাব-কমিটি গঠনের সুযোগ রাখা হয়েছে।
এই ব্যবস্থার জন্য থাকছে পৃথক একটি তহবিল। ইউনিয়ন পরিষদের অনুদান এবং অন্যান্য বৈধ উৎস থেকে আসা অর্থ সেখানে জমা হবে। উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান, ভাইস চেয়ারম্যান, সংরক্ষিত নারী ভাইস চেয়ারম্যান, ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান এবং সরকারি তদারকি কর্তৃপক্ষ যেকোনো সময় এর কার্যক্রম পরিদর্শন করতে পারবেন। কোনো অনিয়ম প্রমাণিত হলে কারণ দর্শানোর সুযোগ দিয়ে জেলা প্রশাসক সংশ্লিষ্ট গ্রাম সরকার বাতিল করতে পারবেন।
বাংলাদেশে গ্রাম সরকার কাঠামোর সূচনা হয় তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের হাত ধরে। গ্রামীণ জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে ১৯৮০ সালের আইনের মাধ্যমে এটি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায়। পরে ১৯৮২ সালে সামরিক শাসনামলে তা বিলুপ্ত করা হয়। পরবর্তীতে ১৯৯৭ সালে গ্রাম পরিষদ আইন প্রণয়ন করা হলেও ২০০৩ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি নতুন করে ‘গ্রাম সরকার আইন ২০০৩’ পাস হয়। তবে ২০০৯ সালের ৬ এপ্রিল সংসদে রহিতকরণ বিল পাসের মাধ্যমে এটি বাতিল করেছিল তৎকালীন সরকার।

দিনাজপুর টিভির সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন