অক্টোবর ২২, ২০২৫, ০৫:৪৮ পিএম
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে বিভিন্ন মেরুকরণ ও জোটগত তৎপরতা জোরদার হচ্ছে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিতব্য এই নির্বাচনকে ঘিরে কোন দল ক্ষমতায় আসবে, কিংবা কোন দল কার সঙ্গে সমঝোতা বা জোট করে ভোটের মাঠে নামবে—এসব এখন আলোচনার কেন্দ্রে। জুলাই বিপ্লব-পরবর্তী এই নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় ইসলামি দলগুলোকে নিয়ে সাধারণ ভোটারদের পাশাপাশি রাজনৈতিক বিশ্লেষক মহলে বিশেষ আগ্রহ তৈরি হয়েছে।
এই দলগুলো কি একক প্ল্যাটফর্মে একত্রিত হবে, নাকি প্রধান দুই প্রতিযোগী শক্তির কোনো একটির সঙ্গে গাঁটছড়া বাঁধবে, তা নিয়ে চলছে চুলচেরা বিশ্লেষণ।বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) এবং বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীকে দুটি প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তি হিসেবে দেখা হচ্ছে। ফলে অন্যান্য ইসলামি দলগুলোর নির্বাচনী পরিকল্পনাও প্রধানত এই দুটি দলকে কেন্দ্র করেই আবর্তিত হচ্ছে।
বিএনপি এবং জামায়াত উভয় দলই নিজ নিজ অবস্থান থেকে সমমনা ইসলামি দলগুলোর সঙ্গে সমঝোতা বা ঐক্যের প্রক্রিয়া চালিয়ে যাচ্ছে। তবে এই প্রক্রিয়ার চূড়ান্ত রূপ পেতে আরও কিছু সময় অপেক্ষা করতে হবে। সংশ্লিষ্ট নেতারা জানিয়েছেন, ইসলামপন্থি দলগুলো শেষ পর্যন্ত একত্রিত হবে কি না, কিংবা কে কোন জোটে ভিড়বে, সে বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার আগে বা পরে নির্ধারিত হতে পারে।
নির্বাচনী জোট গঠনের প্রক্রিয়া সম্পর্কে জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল অধ্যাপক মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, তাদের নির্বাচনী ঐক্য প্রক্রিয়া আগে থেকেই চলমান রয়েছে। তিনি জানান, সব ইসলামি দলের সঙ্গেই জামায়াতের কথাবার্তা হচ্ছে এবং এর বাইরেও আরও কিছু দেশপ্রেমিক দলের সঙ্গে আলোচনা চলছে। এই প্রক্রিয়া এখনো শেষ হয়নি উল্লেখ করে তিনি বলেন, জামায়াতে ইসলামী ইসলামি দলগুলোর একটি কার্যকর ঐক্যের সম্ভাবনা দেখতে পাচ্ছে। জামায়াত চাইছে ইসলামপন্থি ভোটের এই বড় অংশটিকে এক ছাতার নিচে নিয়ে আসতে এবং সে লক্ষ্যেই তারা কাজ করে যাচ্ছে বলে জানা গেছে।
ঐক্যের এই সুরে সবচেয়ে জোরালোভাবে কথা বলছে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ। দলটির যুগ্ম মহাসচিব ও মুখপাত্র গাজী আতাউর রহমান এ বিষয়ে বলেন, তৃণমূল পর্যায়ে ইসলামপন্থিদের মধ্যে মানসিক ঐক্য ইতোমধ্যেই হয়ে গেছে এবং সাধারণ কর্মীরা আর বিভক্তি দেখতে চান না। তিনি দাবি করেন, বর্তমানে ইসলামি দলগুলোর মধ্যে ঐক্য সৃষ্টির পথে বড় কোনো বাধা নেই এবং অতীতের যেকোনো সময়ের তুলনায় দলগুলো এখন অনেক কাছাকাছি এসেছে। গাজী আতাউর রহমান দৃঢ় আশা প্রকাশ করে বলেন
, ইসলামি দলগুলো যদি এবারের নির্বাচনে একত্রিত হতে পারে, তবে তারা একটি অত্যন্ত শক্তিশালী রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হবে, যা নির্বাচনের ফলাফল নির্ধারণে বড় ভূমিকা রাখবে। তিনি মনে করেন, এবারের পরিস্থিতি ভিন্ন। তার ভাষায়, বর্তমানে আওয়ামী লীগ রাজনৈতিকভাবে মাঠে নেই এবং বিএনপিকেও দেশের মানুষ বারবার দেখেছে। তাই ইসলামপন্থিদের যাওয়ার একটি নির্দিষ্ট জায়গা তৈরি হয়েছে এবং সাধারণ মানুষ এবার ইসলামপন্থিদের ক্ষমতায় দেখতে আগ্রহী। তিনি মনে করেন, ইসলামি দলগুলোর জন্য শুধু কিছু আসনে জয়লাভ করাই নয়, বরং এবার ক্ষমতায় যাওয়ার একটি বড় সুযোগ তৈরি হয়েছে।
গাজী আতাউর রহমান আরও জানান, বর্তমানে যুগপৎ আন্দোলনে থাকা দলগুলোর চিন্তাভাবনা প্রায় একই রকম এবং তিনি আশা করেন, নির্বাচন পর্যন্ত এই অবস্থান ধরে রাখা সম্ভব হবে।ঐক্যের এই আকাঙ্ক্ষা অন্যান্য দলের নেতাদের কণ্ঠেও প্রতিধ্বনিত হচ্ছে। খেলাফত মজলিসের যুগ্ম মহাসচিব অধ্যাপক আব্দুল জলিল জানান, দলের তৃণমূল কর্মী এবং সাধারণ মানুষ—সবাই ইসলামি দলগুলোর ঐক্য চান। তিনি জানান, এই মুহূর্তে ঐক্য প্রক্রিয়া নিয়ে দৃশ্যমান কোনো বাধা নেই এবং যথাসময়েই এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
তিনি আশাবাদী যে, ইসলামি দলগুলো শেষ পর্যন্ত আসন ভাগাভাগির মাধ্যমে একটি ঐক্যবদ্ধ প্ল্যাটফর্ম থেকেই নির্বাচনে অংশ নেবে। খেলাফত আন্দোলনের নায়েবে আমির মাওলানা মুজিবুর রহমান হামিদীও একই কথা বলেন। তিনি উল্লেখ করেন, তৃণমূলের মানুষের মধ্যে ব্যাপক আগ্রহ তৈরি হয়েছে যে, ইসলামি দলগুলো যেন একক প্রার্থী দেয়। তিনিও ঐক্যের ভিত্তিতে নির্বাচনে অংশগ্রহণের ব্যাপারে আশাবাদী। মাওলানা হামিদী বলেন, জনগণ পরিবর্তন চায় এবং ইসলামি দলগুলো ক্ষমতায় গেলে দেশ থেকে দুর্নীতি ও চাঁদাবাজি দূর হবে এবং ইনসাফ প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হবে।
নেজামে ইসলাম পার্টির মহাসচিব মাওলানা মুসা বিন ইযহারও জানান, তৃণমূলের মধ্যে ইসলামি ঐক্য নিয়ে ব্যাপক আগ্রহ রয়েছে। তিনি বলেন, ‘আমরা জামায়াতসহ মোট আটটি দলের সঙ্গে যুগপৎ কর্মসূচিতে আছি। তবে নির্বাচনের বিষয়ে এখনো কোনো সুনির্দিষ্ট সিদ্ধান্ত হয়নি। নির্বাচনি তফসিল ঘোষণা হলেই এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।’
তবে ঐক্যের এই আলোচনায় কিছুটা ভিন্ন সুরও রয়েছে। জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের সিনিয়র সহসভাপতি মাওলানা আব্দুর রব ইউসুফী বলেন, ইসলামি ঐক্য হওয়া অবশ্যই ভালো জিনিস, তবে সেই ঐক্য কিসের ভিত্তিতে হচ্ছে তা দেখতে হবে। তিনি প্রশ্ন তোলেন, ‘ঐক্যটা ইসলামের জন্য হচ্ছে কি না, সেটা আগে নিশ্চিত হতে হবে।’ তিনি চূড়ান্ত না হলেও বিএনপির সঙ্গেই তাদের একটি সমঝোতা হতে পারে বলে ইঙ্গিত দেন। মাওলানা ইউসুফী মাঠের বাস্তবতা তুলে ধরে বলেন, বিএনপির প্রতি যেমন মানুষের এক ধরনের খারাপ ধারণা আছে, তেমনি জামায়াতের প্রতিও আছে।
তবে তিনি এও দাবি করেন যে, বর্তমানে মাঠে জামায়াতমুখী যে অবস্থান, সেটির কিছুটা পরিবর্তন হয়েছে। তার এই বক্তব্য প্রমাণ করে, ইসলামি দলগুলোর ভেতরেও জোট গঠনের ক্ষেত্রে আদর্শিক ও কৌশলগত ভিন্ন ভিন্ন মত রয়েছে। সব মিলিয়ে, ত্রয়োদশ নির্বাচনকে সামনে রেখে ইসলামি দলগুলো একটি জটিল সমীকরণের মুখোমুখি। তৃণমূলের চাপ রয়েছে ঐক্যের জন্য, অন্যদিকে কৌশলগত লাভ-ক্ষতির হিসাব রয়েছে শীর্ষ নেতৃত্বে। তাই এই দলগুলো শেষ পর্যন্ত একমঞ্চে আসবে, নাকি বিএনপি বা জামায়াতের বলয়ে বিভক্ত হয়ে পড়বে, তা জানতে তফসিল ঘোষণা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে।




দিনাজপুর টিভির সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন