নভেম্বর ৩, ২০২৫, ১১:২৭ এএম
মানুষের জীবন কেবল তার দৃশ্যমান কর্মের সমষ্টি নয়; বরং তার অন্তর, নিয়্যাত (উদ্দেশ্য) এবং আল্লাহর নির্ধারিত অদৃশ্য তাকদীর—এই তিনের জটিল রহস্যেই লুকিয়ে আছে তার চূড়ান্ত পরিণতি। ইসলামি বিশ্বাস অনুযায়ী, পৃথিবী মানবজাতির জন্য একটি ‘পরীক্ষার হল’ এবং পরকাল হলো তার ফলাফল। তবে এই পরীক্ষার ফলাফল কখনো কখনো দুনিয়ার বাহ্যিক আমলের বিপরীতও হতে পারে। এই গভীর সত্যটিই মহানবী (সা.) একটি হাদিসে তুলে ধরেছেন, যা তাকদীর, নিয়্যাত ও জীবনের শেষ পরিণতির এক বাস্তব চিত্র স্পষ্ট করে দেয়।
প্রখ্যাত সাহাবী আবদুল্লাহ্ ইবনু মাসঊদ (রা.) হতে বর্ণিত আছে, সত্যবাদী ও সত্যবাদী হিসেবে স্বীকৃত রাসুলুল্লাহ্ (সা.) বলেছেন, ‘তোমাদের প্রত্যেকেই আপন আপন মাতৃগর্ভে চল্লিশ দিন পর্যন্ত (শুক্র হিসেবে) জমা থাকে। তারপর ঐরকম চল্লিশ দিন রক্তপিন্ড, তারপর ঐরকম চল্লিশ দিন মাংসপিন্ড আকারে থাকে। তারপর আল্লাহ্ একজন ফেরেশতা পাঠান এবং তাকে চারটি বিষয় লিখার জন্য আদেশ দেয়া হয়—তার রিযিক, তার মৃত্যু, সে দুর্ভাগ্যবান না সৌভাগ্যবান।’
হাদিসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশে নবীজি (সা.) বলেন, ‘আল্লাহর কসম! তোমাদের মাঝে কোনো ব্যক্তি জাহান্নামীদের আমল করতে থাকে। এমনকি তার ও জাহান্নামের মাঝে মাত্র একহাত বা এক গজের তফাৎ থাকে। এমন সময় তাক্দীর (ভাগ্য) তার ওপর প্রাধান্য লাভ করে আর তখন সে জান্নাতীদের আমল করা শুরু করে দেয়। ফলে সে জান্নাতে প্রবেশ করে। ঠিক তেমনি, আর এক ব্যক্তি সারা জীবন জান্নাতীদের আমল করতে থাকে। এমন কি তার ও জান্নাতের মাঝে মাত্র এক হাত বা দু’হাত তফাৎ থাকে।
এমন সময় তাক্দীর তার উপর প্রাধান্য লাভ করে আর অমনি সে জাহান্নামীদের আমল শুরু করে দেয়। ফলে সে জাহান্নামে প্রবেশ করে।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৬৫৯৪; সহিহ মুসলিম, হাদিস : ২৬৪৩)এই হাদিসটি শোনার পর স্বাভাবিকভাবেই মনে প্রশ্ন জাগতে পারে যে, একজন মানুষ সারা জীবন ভালো কাজ করার পরও কীভাবে জাহান্নামী হতে পারে? বিখ্যাত মুহাদ্দিস ও ইমামগণ এর সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা দিয়েছেন।
বিশিষ্ট হাদিস ব্যাখ্যাকার ইমাম নববী (রহ.) বলেন, ‘এই হাদিসের অর্থ এই নয় যে, মানুষ সত্যিকার অর্থে ও বিশুদ্ধ নিয়্যাতে জান্নাতিদের আমল করছিল অথচ তার পরিণতি উল্টো হয়ে গেল; বরং এর প্রকৃত অর্থ হলো—সে লোকদেখানো বা বাহ্যিকভাবে জান্নাতিদের আমল করছিল, অথচ তার অন্তরে ছিল না খালিস নিয়্যাত বা খাঁটি ঈমান। তাই জীবনের শেষ মুহূর্তে এসে তার অন্তরে লুকিয়ে রাখা সেই কপটতা বা অবিশ্বাসেরই প্রকাশ ঘটেছে।’ (শরহ সহিহ মুসলিম)
ইমাম ইবনে হাজর আল-আসকালানী (রহ.) ব্যাখ্যা করেন, ‘এই হাদিস তাকদীরের সত্যতার ওপর এক দৃঢ় প্রমাণ। আল্লাহ তার অসীম জ্ঞানে আগে থেকেই জানেন, এই ব্যক্তির অন্তরের অবস্থা কলুষিত এবং তার শেষ পরিণতি কী হবে। মানুষের আমল তার নিয়্যাত অনুযায়ী ফলপ্রসূ হয়; যদি নিয়্যাত বিকৃত হয়, তবে আল্লাহ শেষ পর্যন্ত সেটি প্রকাশ করে দেন।’ (ফাতহুল বারী)
ইমাম ইবনুল কাইয়্যিম (রহ.) বলেন, ‘মানুষের শেষ অবস্থা তার অভ্যন্তরীণ গুণাবলী ও নফসের অবস্থারই প্রতিফলন। যদি কেউ আমল করে কিন্তু তার মনোভাব কলুষিত থাকে, তবে মৃত্যুর আগে তার অন্তর যা লুকিয়ে রেখেছিল, তা-ই প্রকাশ পায়—এটাই হলো তাকদীরের প্রাধান্য।’সুতরাং, এই হাদিস থেকে মূল শিক্ষা হলো, তাকদীর সত্য এবং আল্লাহ কর্তৃক পূর্বনির্ধারিত। কোনো মানুষই তার শেষ পরিণতি সম্পর্কে জানে না, তাই নিজের আমল নিয়ে কখনো গর্ব বা অহংকার করা উচিত নয়।
বাহ্যিক আমল যতই ভালো হোক, যদি অন্তরের নিয়্যাত বিশুদ্ধ না হয়, তবে সেই আমল আল্লাহর কাছে গ্রহণযোগ্য নাও হতে পারে এবং শেষ পরিণতি বিপর্যয়কর হতে পারে। তাই প্রত্যেক মুমিনের উচিত আমল অব্যাহত রাখার পাশাপাশি সর্বদা নিজের নিয়্যাতকে বিশুদ্ধ রাখা এবং আল্লাহর কাছে উত্তম পরিণতির (হুসনুল খাতিমা) জন্য দোয়া করা।



দিনাজপুর টিভির সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন