রবিবার, ২৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬,

বিশ্বনাথে অসময়ের তরমুজ চাষ, মাচায় ঝুলছে লাভের স্বপ্ন

দিনাজপুর টিভি ডেস্ক

অক্টোবর ২২, ২০২৫, ১০:৫০ এএম

বিশ্বনাথে অসময়ের তরমুজ চাষ, মাচায় ঝুলছে লাভের স্বপ্ন

ছবি - সংগৃহীত

প্রচলিত ধারণা অনুযায়ী, তরমুজ মূলত গ্রীষ্মকালীন ফসল। খরতাপে শুকিয়ে যাওয়া প্রান্তরে রসালো এই ফলের যে দৃশ্য পরিচিত, সিলেটের বিশ্বনাথ উপজেলার চিত্রটি তার সম্পূর্ণ বিপরীত। মৌসুম না হওয়া সত্ত্বেও এখানে মাচায় ঝুলছে সবুজ ও রসালো তরমুজ। অসময়ে এই ফসল ফলিয়ে রীতিমতো তাক লাগিয়ে দিয়েছেন স্থানীয় কৃষক রশিদ আলী। মাত্র তিন মাসের পরিশ্রমে আশানুরূপ ফলন আসায় তার মুখে এখন তৃপ্তির হাসি।

স্বল্প পুঁজি বিনিয়োগ করে কয়েক গুণ লাভের স্বপ্ন দেখছেন তিনি। এই সাফল্য শুধু একজন কৃষকের ব্যক্তিগত অর্জন নয়, বরং এটি সিলেটের মতো অঞ্চলে নতুন কৃষি সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করেছে।সরেজমিন সিলেটের বিশ্বনাথ উপজেলার দশঘর ইউনিয়নের নাচুনী গ্রামে গেলে চোখে পড়ে এই অভিনব কৃষিক্ষেত্র। কৃষক রশিদ আলীর তরমুজ ক্ষেতে দেখা যায়, সমতল জমির দুই পাশে পৃথক মাচায় ঝুলছে সারি সারি তরমুজ।

জমি থেকে সামান্য উঁচুতে বাঁশ, চিকন রশি আর চওড়া নেট ব্যবহার করে এই বিশেষ মাচা তৈরি করা হয়েছে। বর্ষার পানি ও মাটির সংস্পর্শ এড়িয়ে ফলকে রক্ষা করার জন্যই এই বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির আশ্রয় নেওয়া হয়েছে। ক্ষেতে গিয়ে দেখা যায়, কৃষক রশিদ আলী তখন গাছের পরিচর্যায় ব্যস্ত সময় পার করছেন। তার সঙ্গে কথা হলে জানা যায়, তিনি পেশায় একজন রাজমিস্ত্রি। সম্প্রতি বেশ কিছুদিন হাতে কাজ না থাকায় তিনি বিকল্প আয়ের পথ খুঁজছিলেন।

ঠিক সেই সময়েই তিনি স্থানীয় কৃষি অফিস থেকে অসময়ের তরমুজ চাষের জন্য একটি প্রদর্শনীর সুযোগ পান।রশিদ আলী জানান, তিনি অন্যের এক বিঘা জমি বর্গা বা লিজ নিয়ে এই চাষাবাদ শুরু করেন। গত জুলাই মাসে তিনি জমিতে ‘টিআই-১৭৬’ জাতের তরমুজের প্রায় একশ গ্রাম বীজ বপন করেন। এরপর থেকে কৃষি অফিসের নিবিড় তত্ত্বাবধান আর নিজের অক্লান্ত পরিশ্রমে মাত্র তিন মাসের মধ্যেই গাছগুলো সবল হয়ে ওঠে এবং মাচা জুড়ে ফল আসতে শুরু করে।

এই প্রকল্পে প্রয়োজনীয় সার, বীজ, কীটনাশকসহ বিভিন্ন উপকরণ ও আর্থিক সহায়তা দিয়েছে স্থানীয় কৃষি অফিস। মাচায় ঝুলতে থাকা তরমুজের আকার ও সতেজতা দেখে যে কেউ মুগ্ধ হবেন। রশিদ আলী আশা প্রকাশ করে বলেন, যে হারে ফলন এসেছে, তাতে আগামী চার মাস পর্যন্ত তিনি তরমুজ বিক্রি করতে পারবেন। সব ঠিক থাকলে লক্ষাধিক টাকার তরমুজ বিক্রি করা সম্ভব হবে বলে তিনি মনে করেন। এই আয় থেকে চাষাবাদের সব ব্যয় বাদ দিলেও প্রায় ৬০ হাজার টাকা মুনাফা অর্জনের ব্যাপারে তিনি আশাবাদী।

অসময়ের এই চাষাবাদ প্রসঙ্গে কথা হয় দশঘর ব্লকের দায়িত্বপ্রাপ্ত উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা জাকারিয়া আহমদের সঙ্গে। তিনি জানান, সিলেটের এই এলাকায় অসময়ে, বিশেষ করে বর্ষা মৌসুমে তরমুজ চাষ করা অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং একটি কাজ। অতিবৃষ্টি ও জলাবদ্ধতা এই চাষের প্রধান অন্তরায়। কিন্তু কৃষক রশিদ আলী কৃষি অফিসের সার্বিক সহযোগিতা গ্রহণ করে এবং নিজে কঠোর পরিশ্রম করে সেই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সফল হয়েছেন।

জাকারিয়া আহমদ বলেন, রশিদ আলী জমিতেসোনা ফলিয়েছেন। তিনি জানান, আর মাত্র দশ থেকে বারো দিনের মধ্যেই এই ক্ষেতের তরমুজ সংগ্রহ ও বিক্রি শুরু করা যাবে। কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকে আশা করা হচ্ছে, রশিদ আলী এই ফসল থেকে আর্থিকভাবে দারুণ লাভবান হবেন। এই সাফল্য দেখে এলাকার অন্য কৃষকরাও উদ্বুদ্ধ হচ্ছেন।

বিশ্বনাথ উপজেলায় এই নতুন কৃষি প্রবণতা সম্পর্কে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা বিল্লাল হোসেন বলেন, বিশ্বনাথ উপজেলায় কৃষকদের উদ্বুদ্ধ করে অফসিজনের বা অসময়ের তরমুজ চাষাবাদ শুরু করা হয়েছে। এটি সরকারের কৃষি বৈচিত্র্যকরণ কর্মসূচির অংশ। আমরা কৃষি অফিসের মাধ্যমে কৃষকদের সব ধরনের প্রযুক্তিগত সহায়তা, পরামর্শ এবং প্রয়োজনীয় উপকরণ দিয়ে যাচ্ছি। রশিদ আলীর ক্ষেতের ফলন খুব ভালো হয়েছে।

আশা করি তিনি যেমন ভালো মুনাফা পাবেন, তেমনি তার এই সাফল্য অন্য কৃষকদের জন্য একটি অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে। রাজমিস্ত্রি রশিদ আলীর এই উদ্যোগ প্রমাণ করে, সঠিক পরিকল্পনা, আধুনিক কৃষি প্রযুক্তি এবং পরিশ্রমের সমন্বয় ঘটাতে পারলে প্রচলিত পেশার বাইরেও কৃষি ক্ষেত্রে নতুন কর্মসংস্থান এবং অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতা অর্জন সম্ভব।