অক্টোবর ২২, ২০২৫, ০১:২৪ পিএম
প্রচলিত কৃষির বাইরেও যে নতুন নতুন উদ্ভাবনী উদ্যোগে বিপুল সম্ভাবনার দুয়ার খোলা আছে, তা-ই যেন প্রমাণ করেছেন পাবনার আটঘরিয়া উপজেলার পারসিধাই গ্রামের তরুণ উদ্যোক্তা শিমুল। প্রথাগত চাকরির প্রতি অনীহা এবং উদ্যোক্তা হওয়ার তীব্র আকাঙ্ক্ষা তাকে প্রথমে নিয়ে গিয়েছিল বড় ধরনের আর্থিক বিপর্যয়ের মুখে। হাঁসের খামার করে ১৮ লাখ টাকা লোকসানের বোঝায় যখন তিনি প্রায় নুয়ে পড়েছিলেন, ঠিক তখনই এক অভিনব পোকা চাষের ধারণা তার জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়।
ইউটিউবের একটি ভিডিও থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে ‘ব্ল্যাক সোলজার ফ্লাই’ নামের এই পোকা চাষ শুরু করে শিমুল এখন শুধু স্বাবলম্বীই নন, তিনি এখন একজন সফল খামারি ও রপ্তানিকারক। তার খামার থেকে প্রতি মাসে গড় আয় হচ্ছে প্রায় দুই লাখ টাকা। শিমুলের এই অভাবনীয় সাফল্য এলাকার অন্য তরুণদেরও অনুপ্রাণিত করছে, ফলে পাবনায় বাড়ছে এই বিশেষ পোকার খামারের সংখ্যা।
শিমুলের চলার পথটি মোটেও মসৃণ ছিল না। পাবনার একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে ফ্যাশন ডিজাইনের ওপর ডিপ্লোমা কোর্স সম্পন্ন করার পর তিনি আর দশজনের মতোই চাকরির মাধ্যমে পেশাগত জীবন শুরু করেন। ঢাকায় একটি প্রতিষ্ঠানে যোগ দিলেও সেই ছোট চাকরি ও বাঁধাধরা আয়ে তার মন বসছিল না। তার মধ্যে কাজ করছিল নিজে কিছু একটা করার, উদ্যোক্তা হওয়ার তীব্র বাসনা।
সেই চিন্তা থেকেই ২০১৮ সালে চাকরি ছেড়ে গ্রামে ফিরে আসেন এবং বাণিজ্যিকভাবে হাঁস পালনের একটি বড় খামার গড়ে তোলেন। কিন্তু সঠিক পরিকল্পনা বা অভিজ্ঞতার অভাবে সেই উদ্যোগে তিনি সফল হতে পারেননি। উল্টো খামার পরিচালনা করতে গিয়ে তিনি বিশাল লোকসানের মুখে পড়েন। একপর্যায়ে ঋণের দায়ে জর্জরিত হয়ে পড়েন শিমুল, লোকসানের পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ১৮ লাখ টাকা। এই বিপুল ঋণের বোঝা তাকে প্রায় দিশেহারা করে ফেলেছিল।
ব্যর্থতার সেই অন্ধকার সময়েই শিমুলের সামনে আশার আলো হয়ে আসে ইন্টারনেট। একদিন হতাশ হয়ে ইউটিউবে বিভিন্ন ভিডিও দেখার সময় হঠাৎ করেই ‘ব্ল্যাক সোলজার ফ্লাই’ নামের এক ধরনের পোকা চাষের ভিডিও তার চোখে পড়ে। তিনি কৌতূহলী হয়ে বিষয়টি নিয়ে গবেষণা শুরু করেন। জানতে পারেন, এই পোকার লার্ভা মাছ, হাঁস-মুরগি ও গবাদিপশুর অত্যন্ত পুষ্টিকর এবং পরিবেশবান্ধব খাবার হিসেবে বিশ্বব্যাপী সমাদৃত।
এই পোকা চাষের সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো, এটি জৈব বর্জ্য বা পচা আবর্জনা খেয়ে বড় হয়, ফলে একদিকে যেমন বর্জ্য ব্যবস্থাপনা হয়, অন্যদিকে সেই বর্জ্যই রূপান্তরিত হয় মূল্যবান প্রোটিনে। এই সম্ভাবনা দেখেই শিমুল সিদ্ধান্ত নেন, তিনি এই পোকা চাষ করবেন। তবে এবার আর হাঁসের খামারের মতো ভুল করেননি, আগে নিজেকে প্রশিক্ষিত করার সিদ্ধান্ত নেন। তিনি প্রথম বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় (বাকৃবি) থেকে এই পোকা চাষের ওপর বিশেষ প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন।
সেখান থেকে তিনি বৈজ্ঞানিক চাষপদ্ধতি, প্রজনন প্রক্রিয়া এবং এর বাজার ব্যবস্থা সম্পর্কে বিস্তারিত ধারণা লাভ করেন।বৈজ্ঞানিক জ্ঞান অর্জনের পর তিনি বাস্তবায়নের দিকে ঝোঁকেন। এই পর্যায়ে তাকে সহায়তার হাত বাড়িয়ে দেয় পাবনার স্থানীয় বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা প্রোগ্রাম ফর কমিউনিটি ডেভেলপমেন্ট (পিসিডি)। সংস্থাটি শিমুলকে নতুন করে প্রশিক্ষণ প্রদানের পাশাপাশি ঋণ সহায়তা, প্রযুক্তিগত সুবিধা এবং উৎপাদিত পণ্য বাজারে সংযুক্ত হওয়ার ক্ষেত্রেও কার্যকরী সহায়তা প্রদান করে।
প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ ও আর্থিক সংস্থান নিশ্চিত হওয়ার পর শিমুল তার সমস্ত পরিশ্রম ও অধ্যাবসায় বিনিয়োগ করেন এই নতুন প্রকল্পে। খুব দ্রুতই তার খামারে উৎপাদন শুরু হয়। ব্ল্যাক সোলজার ফ্লাই চাষে তার এই প্রচেষ্টা অনুকরণীয় এক উদ্যোগে পরিণত হয়। ভালো উৎপাদন এবং বাজারে ব্যাপক চাহিদা থাকায় তার আয় বাড়তে থাকে। মাত্র তিন বছরের মধ্যে শিমুল তার সেই বিপুল ঋণের প্রায় ১৬ লাখ টাকাই পরিশোধ করতে সক্ষম হন।
এক খামার থেকে শুরু করে তিনি এখন পাবনা ও পর্যটন নগরী কক্সবাজার মিলিয়ে মোট তিনটি খামারের মালিক হয়েছেন।শিমুল তার খামারের পোকা উৎপাদন প্রক্রিয়া সম্পর্কে জানান, এটি একটি নিয়ন্ত্রিত ও বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি। প্রথমে শক্ত খোলসযুক্ত মূল পোকা বা মাছিগুলোকে দিনের বেলা আলো-বাতাস আসে এমন একটি বিশেষ জালের ঘেরের মধ্যে রাখা হয়। সেখানে পোকাগুলো প্রজনন সম্পন্ন করার পর আগে থেকে পেতে রাখা কাঠের স্তরের মধ্যে ডিম পাড়ে।
সেই ডিম সংগ্রহ করে হ্যাচিং বা ফোটানোর জন্য আলাদা জায়গায় রাখা হয়। ৮ থেকে ১০ দিন পর ডিম ফুটে লার্ভা বের হয়, যেগুলোকে নির্দিষ্ট ট্রে-তে স্থানান্তর করা হয়। এই লার্ভার খাবার হিসেবে মুরগির নাড়িভুড়ি পচা, নষ্ট হয়ে যাওয়া মাছ বা যেকোনো ধরনের জৈব বর্জ্য দেওয়া হয়। এই বর্জ্য খেয়েই লার্ভাগুলো ২০ থেকে ৩০ দিনের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ আকার ধারণ করে এবং বিক্রির উপযোগী হয়। এই পোকা বা লার্ভা মাছ, হাঁস বা মুরগির উৎকৃষ্ট খাবার হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
যদি কোনো লার্ভা ৩০ দিন পার হয়ে যায়, তবে তা পিউপাতে এবং পরবর্তীতে মাছিতে পরিণত হয়, যা আবার প্রজনন চক্রে অংশ নেয়। একটি প্রাপ্তবয়স্ক মাছির জীবনকাল সাধারণত ৮ থেকে ১০ দিন হয়।শিমুলের এই উদ্যোগ এখন দেশের গণ্ডি পেরিয়ে বিদেশেও পৌঁছে গেছে। তিনি জানান, তার খামারে উৎপাদিত ‘ব্ল্যাক সোলজার মাদার পোকা’ (প্রজননের জন্য মূল পোকা) তিনি ভারত, নেপাল, ভুটান ও পাকিস্তানে রপ্তানি করেছেন। এ ছাড়া উৎপাদিত লার্ভা স্থানীয় খামারিদের কাছে এবং ঢাকার বিভিন্ন বড় ব্যবসায়ীর কাছে মাছ ও মুরগির খাবার হিসেবে নিয়মিত বিক্রি করছেন।
এই পোকা চাষের মাধ্যমে শিমুল এখন পুরোপুরি স্বাবলম্বী। সম্প্রতি তিনি কক্সবাজারে প্রায় ৩০ লাখ টাকা ব্যয়ে আরও একটি বড় আকারের ফার্ম স্থাপনের কাজ শুরু করেছেন। শিমুলের এই ঘুরে দাঁড়ানোর গল্প প্রমাণ করে, প্রচলিত চাকরির পেছনে না ছুটেও সঠিক পরিকল্পনা, আধুনিক প্রযুক্তি জ্ঞান এবং কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে কৃষিতেও অভাবনীয় সাফল্য অর্জন সম্ভব, যা কেবল নিজের ভাগ্যই বদলায় না, পরিবেশ রক্ষা এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টিতেও বড় ভূমিকা রাখে।




দিনাজপুর টিভির সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন