অক্টোবর ২২, ২০২৫, ১০:৫৯ পিএম
অগ্রহায়ণ-পৌষ মাসে সোনালী ফসল ঘরে তোলার স্বপ্নে যখন বিভোর লালমনিরহাটের কৃষকরা, ঠিক তখনই তাদের কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলেছে রোপা-আমন ক্ষেতে পোকার আক্রমণ। জেলার বিভিন্ন উপজেলার বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে মাজরা ও পাতা মোড়ানো পোকার আক্রমণে ধানের কাঙ্ক্ষিত ফলন নিয়ে গভীর দুশ্চিন্তায় পড়েছেন হাজার হাজার কৃষক।
কৃষকদের অভিযোগ, বারবার কীটনাশক ছিটিয়েও কোনো ফল পাওয়া যাচ্ছে না, উল্টো বিঘাপ্রতি উৎপাদন খরচ বেড়ে যাচ্ছে। এমন বিপদ মুহূর্তে কৃষি বিভাগের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মাঠে এসে পরামর্শ দিতেও দেখা যাচ্ছে না বলে অভিযোগ তুলেছেন তারা। এই পরিস্থিতিতে ধানের উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা পূরণ নিয়ে বড় ধরনের শঙ্কা দেখা দিয়েছে, যদিও কৃষি বিভাগ এখনো লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে যাওয়ার ব্যাপারে আশাবাদী।
লালমনিরহাট জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, চলতি খরিপ-২ মৌসুমে জেলার পাঁচটি উপজেলায় (লালমনিরহাট সদর, আদিতমারী, কালীগঞ্জ, হাতীবান্ধা, পাটগ্রাম) মোট ৮৬ হাজার ৬৫০ হেক্টর জমিতে রোপা-আমন ধান রোপণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল। এর মধ্যে ৮৫ হাজার ৩৫০ হেক্টর জমিতে আবাদ সম্পন্ন হয়েছে, যা লক্ষ্যমাত্রার প্রায় কাছাকাছি। শ্রাবণ-ভাদ্র মাসে রোপণ করা এই ধান অগ্রহায়ণ-পৌষ মাসে কাটার কথা।
আর মাত্র কিছুদিন পরেই ধানের গাছে শীষ আসার কথা। ঠিক এই গুরুত্বপূর্ণ সময়েই পোকার আক্রমণ কৃষকদের সব স্বপ্ন ধূলিসাৎ করে দিচ্ছে।সরেজমিনে জেলার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, রোপা-আমন ধানের ক্ষেতে মাজরা পোকার আক্রমণ তীব্র আকার ধারণ করেছে। এই পোকা ধানের কাণ্ডের ভেতরে প্রবেশ করে ভেতর থেকে খাওয়া শুরু করে, যার ফলে গাছের ডগা শুকিয়ে মরে যাচ্ছে।
একইসাথে মোগলহাট ইউনিয়নের মতো অনেক এলাকায় পাতা মোড়ানো পোকার ব্যাপক আক্রমণও লক্ষ্য করা গেছে। এই পোকা ধানের পাতা লম্বালম্বিভাবে মুড়িয়ে ফেলে এবং পাতার সবুজ অংশ কুরে কুরে খেয়ে ফেলে। ফলে ক্ষতিগ্রস্ত পাতায় সাদা লম্বা দাগ দেখা যায় এবং দূর থেকে ধানের ক্ষেত দেখলে মনে হয় তা পুড়ে গেছে। এই দুই পোকার আক্রমণে ধানের চারার পাতা ছিদ্র হয়ে বাদামি রং ধারণ করছে এবং গাছ দুর্বল হয়ে পড়ছে।
মোগলহাট ইউনিয়নের ভুক্তভোগী কৃষক কমল কান্তি বর্মন, মো. রবিউল ইসলাম এবং হরিপদ রায় হরি জানান, তারা ধারদেনা করে এবার জমিতে রোপা-আমন রোপণ করেছেন। কিন্তু মাজরা ও পাতা মোড়ানো পোকার আক্রমণে তারা এখন দিশেহারা। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, প্রচলিত কীটনাশক ছিটিয়েও এই পোকা কার্যকরভাবে দমন করা যাচ্ছে না। কৃষকরা বলছেন, এক বিঘা জমিতে এক দফা কীটনাশক প্রয়োগ করতেই খরচ হচ্ছে প্রায় পাঁচশত টাকা। বারবার ওষুধ দিয়েও কাজ না হওয়ায় তাদের উৎপাদন খরচ লাগামহীনভাবে বাড়ছে।
একদিকে ফলন বিপর্যয়ের শঙ্কা, অন্যদিকে উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি—এই দ্বিমুখী চাপে পড়ে জেলার কৃষকরা বুঝতে পারছেন না তাদের কী করণীয়।একই চিত্র কালীগঞ্জ উপজেলার শিয়াল খোওয়া গ্রামেও। সেখানকার চাষী হাসিম, শাহ আলী, আব্দুস সালাম ও আবু সাঈদ জানান, তাদের সম্মিলিত প্রায় ১৬ বিঘা জমিতে মাজরা পোকা ও পাতা মোড়ানো রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে। একাধিকবার বিভিন্ন কোম্পানির দামি কীটনাশক প্রয়োগ করেও কোনো সুফল মিলছে না।
এই কৃষকরাও ধানের ফলন নিয়ে বড় দুশ্চিন্তায় পড়েছেন। তারা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ফসলের এমন দুর্দিনেও কৃষি বিভাগের কোনো মাঠ পর্যায়ের কর্মী তাদের ক্ষেত পরিদর্শনে আসেননি বা কার্যকর কোনো পরামর্শ দেননি। ফলে স্থানীয় ডিলারদের ওপর ভরসা করেই ওষুধ ছিটাতে হচ্ছে, যা কোনো কাজে আসছে না। দুশ্চিন্তায় দিন কাটছে তাদের।
কৃষকদের মাঠে না পাওয়ার অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে ফুলগাছ ব্লকের উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা অপূর্ব বলেন, এই সময়ে আবহাওয়ার কারণে মাজরা ও পাতা মোড়ানো পোকার কিছু আক্রমণ হয়। কৃষকদের প্রয়োজনীয় পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে বলে তিনি দাবি করেন।এদিকে, পুরো জেলাজুড়ে কৃষকদের এই উদ্বেগের বিষয়ে লালমনিরহাট কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক ড. মো. সাইখুল আরিফিনের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে তিনি জানান, বিষয়টি তারা অবগত আছেন এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তিনি বলেন, মাঠ পর্যায়ের কর্মীদের কৃষকদেরকে যথাযথ পরামর্শ দেওয়ার জন্য নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
যদিও কৃষি বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন তারা পরামর্শ দিচ্ছেন, কিন্তু মাঠের চিত্র ভিন্ন। কৃষকরা বলছেন পরামর্শ বা কার্যকর সমাধান কোনোটাই তারা পাচ্ছেন না। এমন পরিস্থিতিতেও কৃষি বিভাগ আশা করছে, জেলায় এবার ধানের উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা (৮ লক্ষ ৮৬ হাজার মেট্রিক টন) ছাড়িয়ে যাবে। তবে মাঠের কৃষকরা বলছেন, পোকার এই আক্রমণ দ্রুত নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হওয়াই কঠিন হয়ে পড়বে।




দিনাজপুর টিভির সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন