অক্টোবর ২৩, ২০২৫, ০৬:৪৩ পিএম
সোনালী ধানের শীষে ভরে ওঠা মাঠ দেখে সোনালী স্বপ্ন বুনছিলেন দিনাজপুরের ফুলবাড়ী উপজেলার আমন চাষিরা। আর মাত্র কিছুদিন পরই শুরু হবে ধান কাটার মহোৎসব। কিন্তু মাঠের বাস্তবতা এখন ভিন্ন। মৌসুমের শেষ লগ্নে এসে বিস্তীর্ণ এলাকার আমন ক্ষেতে হানা দিয়েছে মাজরা ও কারেন্ট পোকার দল। এই দুইয়ের যুগপৎ আক্রমণে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন স্থানীয় কৃষকরা। বহু কষ্টে ফলানো সোনার ফসল চোখের সামনে নষ্ট হতে দেখে তাদের কপালে পড়েছে গভীর চিন্তার ভাঁজ।
একদিকে কীটনাশক ছিটিয়েও মিলছে না প্রতিকার, অন্যদিকে বাড়ছে উৎপাদন খরচ। কাঙ্ক্ষিত ফলন ঘরে তোলা নিয়েই দেখা দিয়েছে চরম অনিশ্চয়তা। উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নের ফসলের মাঠে এখন এমনই উদ্বেগজনক চিত্র।কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এবারের পোকার আক্রমণ বেশ তীব্র। বিশেষ করে কারেন্ট পোকা (বাদামী গাছফড়িং) ধানের গোড়ার দিকের অংশ কেটে ফেলায় রস শোষণ বন্ধ হয়ে যাচ্ছে, ফলে পুরো গাছটিই পাতা শুকিয়ে মারা যাচ্ছে।
এই পোকা খুব দ্রুত বংশবিস্তার করে এবং পুরো ক্ষেতে ছড়িয়ে পড়ে বিধায় কৃষকরা একে ‘কারেন্ট পোকা’ নামে ডাকেন। অন্যদিকে, মাজরা পোকার লার্ভা ধানের কাণ্ডের ভেতরে প্রবেশ করে কচি ডগা খেয়ে ফেলায় শীষ বের হতে পারছে না অথবা শীষ বের হলেও তা চিটা বা দানাহীন হয়ে যাচ্ছে। মাজরা পোকার আক্রমণে অনেক সময় ধানের শীষ পরিপক্ব হওয়ার আগেই দূর থেকে পাকা মনে হলেও কাছে গেলে দেখা যায় ভেতরে কোনো দানা নেই, সব ফাঁপা।
কৃষকরা আরও জানাচ্ছেন, কিছু কিছু জমিতে ধানের গোড়া পচে গিয়েও গাছ নষ্ট হয়ে যাচ্ছে, যা সম্ভবত ছত্রাকের আক্রমণ বা পোকার আক্রমণের ফলে সৃষ্ট ক্ষতের পরবর্তী সংক্রমণ। ফসলের এমন বহুমুখী আক্রমণে তারা এখন চরম হতাশায় দিন কাটাচ্ছেন। ধান কাটার ঠিক আগ মুহূর্তে এমন বিপর্যয় তাদের অর্থনৈতিক মেরুদণ্ড ভেঙে দেওয়ার উপক্রম করেছে।
উপজেলার মাদলিয়া হাট এলাকার কৃষক আবু সালেহ এবং আলাদীপুর এলাকার কৃষক মকবুল হোসেন তাদের অসহায়ত্বের কথা তুলে ধরেন। তারা বলেন, জমিতে পোকার আক্রমণে আমরা চরম সমস্যায় পড়েছি। এমন একটা সময়ে এই আক্রমণ হয়েছে যখন ধানের শীষ কেবল বের হচ্ছে বা দানা পুষ্ট হচ্ছে। এই অবস্থায় কীটনাশক প্রয়োগ করাটাও ঝুঁকিপূর্ণ, আবার না দিয়েও উপায় নেই। তারা জানান, প্রতিদিন নানা ধরনের কীটনাশক স্প্রে করেও পোকার উপদ্রব থেকে রেহাই মিলছে না।
স্থানীয় ডিলারদের পরামর্শে বিভিন্ন ওষুধ ব্যবহার করেও কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যাচ্ছে না। এতে একদিকে যেমন বিঘাপ্রতি উৎপাদন খরচ কয়েকগুণ বেড়ে যাচ্ছে, তেমনি ফসল আদৌ ঘরে তোলা যাবে কিনা, তা নিয়েই বড় দুশ্চিন্তায় পড়েছেন তারা। যদি শেষ পর্যন্ত ফলন ভালো না হয়, তবে ধারদেনা শোধ করে কীভাবে সংসার চালাবেন, সেই চিন্তাই এখন তাদের রাতের ঘুম কেড়ে নিয়েছে।
এই পরিস্থিতি সম্পর্কে জানতে চাইলে ফুলবাড়ী উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ মো. সাইফ আবদুল্লাহ জানান, আবহাওয়ার প্রভাব, বিশেষ করে মৌসুমের শেষে অনিয়মিত বৃষ্টিপাত ও আর্দ্রতার কারণে এবার মাজরা ও কারেন্ট পোকার আক্রমণ অন্যান্য বছরের তুলনায় কিছুটা বেশি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। তবে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কৃষি বিভাগ সচেষ্ট রয়েছে বলে তিনি দাবি করেন। তিনি বলেন, মাঠ পর্যায়ে উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তারা নিয়মিত উঠান বৈঠক করছেন এবং কৃষকদের পোকা দমনের সঠিক পদ্ধতি ও প্রয়োজনীয় পরামর্শ দিয়ে সচেতন করার চেষ্টা করছেন।
তিনি আরও জানান, ইতোমধ্যে উপজেলার অনেক এলাকায় আগাম জাতের আমন ধান কাটা শুরু হয়েছে এবং সেগুলোর ফলন মোটামুটি ভালো। তবে সুগন্ধি জাতের ধান, যেমন ব্রি-৩৪, যা তুলনামূলকভাবে দেরিতে পাকে, সেসব ক্ষেতে পোকার আক্রমণ নিয়ে কিছুটা উদ্বেগ রয়েছে, কারণ এই ধানগুলো এখনো মাঠে আছে এবং পোকার আক্রমণের জন্য সংবেদনশীল অবস্থায় রয়েছে।
কৃষি কর্মকর্তা আরও বলেন, কৃষি অফিসের পক্ষ থেকে মাঠকর্মীরা সার্বক্ষণিকভাবে কৃষকদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন এবং কাজ করছেন। তিনি নিজেও ব্যক্তিগতভাবে বিভিন্ন ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শন করে খোঁজখবর নিয়েছেন বলে জানান। কৃষকদের কীটনাশক কাজ না করার অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, অনেক সময় ভুল কীটনাশক নির্বাচন বা সঠিক মাত্রায় প্রয়োগ না করার কারণে এমনটা হতে পারে। তাই তারা কৃষকদের অনুমোদিত ডিলারদের কাছ থেকে ভালো মানের ও সঠিক গ্রুপের কীটনাশক সঠিক মাত্রায় ব্যবহারের পরামর্শ দিচ্ছেন।
বিশেষ করে কারেন্ট পোকা দমনের জন্য ধানের গোড়ায় স্প্রে করা এবং মাজরা পোকার জন্য দানাদার কীটনাশক ব্যবহারের সুপারিশ করা হচ্ছে।উপজেলা কৃষি অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, এ বছর ফুলবাড়ী উপজেলায় মোট ১৮ হাজার ১৪৮ হেক্টর জমিতে আমন ধান উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মধ্যে হাইব্রিড ও উফশী জাতের তেজগোল্ড, ব্রি-৯০, বিনা-১৭, সম্পাকাটারি, জাঁপাড়িসহ বিভিন্ন আগাম জাতের ধান প্রায় ৩ হাজার ২০০ হেক্টর জমিতে চাষ হয়েছে, যার কাটা-মাড়াই প্রায় শেষের দিকে।
বাকি প্রায় ১৫ হাজার হেক্টর জমিতে মূলত নাজিরশাইল, ব্রি-৩৪ এবং অন্যান্য স্থানীয় ও উফশী জাতের ধান রয়েছে, যা এখনো মাঠে এবং পোকার আক্রমণের ঝুঁকিতে। কৃষি বিভাগ আশা করছে, প্রাথমিক এই ধাক্কা সামলে শেষ পর্যন্ত হয়তো লক্ষ্যমাত্রা অর্জন সম্ভব হবে। কিন্তু মাঠের কৃষকরা বলছেন, দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে এবং পোকার আক্রমণ নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে ফলন বিপর্যয় ঠেকানো কঠিন হবে, যা এই অঞ্চলের হাজারো কৃষকের জীবনে চরম দুর্ভোগ বয়ে আনবে।




দিনাজপুর টিভির সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন