অক্টোবর ২৩, ২০২৫, ০৭:১৫ পিএম
একসময় শেরপুর অঞ্চলের খাল-বিল, ডোবা-নালায় প্রাকৃতিকভাবেই জন্মাতো পানিফল। অযত্ন-অবহেলায় বেড়ে ওঠা এই জলজ উদ্ভিদের ফল কুড়িয়ে খাওয়ার স্মৃতি হয়তো অনেকেরই আছে। কিন্তু সময়ের পরিবর্তনে এবং কৃষকদের বাণিজ্যিক চিন্তাধারার বিকাশে সেই পানিফলই এখন শেরপুরের বিভিন্ন স্থানে লাভজনক এক কৃষি পণ্যে পরিণত হয়েছে। অল্প শ্রম, কম খরচ আর পতিত জলাশয়কে কাজে লাগিয়ে অধিক মুনাফা পাওয়ায় জেলাজুড়ে দিন দিন বাড়ছে পানিফলের বাণিজ্যিক চাষাবাদ।
স্থানীয়ভাবে ‘শিঙাড়া ফল’ নামে পরিচিত এই ফলের চাষ অনেক প্রান্তিক কৃষকের সংসারে ফিরিয়ে এনেছে অর্থনৈতিক সচ্ছলতা। পুষ্টিগুণে ভরপুর এবং ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য উপকারী এই ফল এখন শেরপুরের কৃষি অর্থনীতিতে নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করেছে।
ফলটির নাম পানিফল হলেও এর আকৃতি অনেকটা পরিচিত মুখরোচক খাবার শিঙাড়ার মতো তিন কোনা হওয়ায় স্থানীয়ভাবে এটি ‘শিঙাড়া ফল’ নামেই বেশি পরিচিত। কচুরিপানার মতো দেখতে এর গাছ পানির ওপরে ভেসে থাকে। সাধারণত যেসব জলাশয়ে স্রোত কম, গভীরতা মাঝারি এবং যা পতিত বা জলাবদ্ধ অবস্থায় থাকে, সেখানেই এই ফলের চাষ ভালো হয়। তবে বর্তমানে কৃষকরা মাছের ঘের বা সুবিধাজনক যেকোনো বদ্ধ জলাশয়েও সফলভাবে এর চাষ করছেন।
পানিফল কচি অবস্থায় দেখতে লাল রঙের হয়, মাঝারি বয়সে সবুজ এবং সম্পূর্ণ পরিপক্ব হলে তা গাঢ় কালো বা খয়েরি বর্ণ ধারণ করে। ফলটির বাইরের কালো বা খয়েরি রঙের শক্ত খোসা ছাড়ালেই ভেতরে পাওয়া যায় হৃৎপিণ্ডাকার বা ত্রিভুজাকৃতির নরম সাদা বা হালকা লালচে শাস। এই শাসটি কাঁচা অবস্থাতেই খাওয়া যায়, এর জন্য আর কোনো রকম রান্নার বা প্রক্রিয়াজাত করার প্রয়োজন হয় না। হালকা মিষ্টি স্বাদের এই নরম শাসটি খেতে বেশ সুস্বাদু এবং পুষ্টিকর।
শেরপুর জেলার বিভিন্ন উপজেলাতেই এখন পানিফলের বাণিজ্যিক চাষ বা প্রাকৃতিক উৎপাদন লক্ষ্য করা যায়। এর মধ্যে শেরপুর সদর উপজেলার চরশেরপুর, বামনের চর বিল, পাকুড়িয়া এলাকার রৌহা ও গাওয়াৎ বিল, পৌর এলাকার আওড়াবাওড়া বিল ও ঈশলি বিল উল্লেখযোগ্য। শ্রীবরদী উপজেলার বৈশা বিল, খড়িয়া গাজির চর, কুড়িকাহনীয়া ও গরজরিপা এলাকাতেও এর চাষ হয়।
নকলা উপজেলার পাঠাকাটা, চরঅষ্টধর, চন্দ্রকোনা, উরফা, গণপদ্দী ও বানেশ্বরদী ইউনিয়নের বিভিন্ন জলাশয় পানিফল চাষের জন্য পরিচিতি পেয়েছে। এছাড়া নালিতাবাড়ী উপজেলার নয়াবিল, রাজনগর, বরুডুবি এবং ঝিনাইগাতী উপজেলার মালিঝিকান্দা, আসামপাড়া, ধলিবিল ও কালিনগরসহ জেলার আরও বহু এলাকায় এই ফলের বাণিজ্যিক চাষাবাদ হচ্ছে বা প্রাকৃতিকভাবে জন্মাচ্ছে।
পানিফল চাষের সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক হলো এর লাভজনকতা। স্থানীয় কৃষকদের কাছ থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, এই ফল চাষে খরচ তুলনামূলকভাবে অনেক কম। চরশেরপুরের কৃষক জলিল মিয়া ও সাবেদ আলী এবং পাকুড়িয়া এলাকার ফজলু ও আমেজ আলীসহ বেশ কয়েকজন চাষী জানান, পানিফল চাষে ছয় মাসের একটি মৌসুমে প্রতি বিঘা জমিতে আনুমানিক ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকা খরচ হয়। বিপরীতে, ফলন ভালো হলে এবং বাজারদর অনুকূলে থাকলে প্রতি বিঘা থেকে ৭০ থেকে ৮০ হাজার টাকার ফল বিক্রি করা সম্ভব।
এটি নিঃসন্দেহে একটি অত্যন্ত লাভজনক বিনিয়োগ। তারা আরও জানান, চারা লাগানোর মাত্র তিন মাস পরেই গাছে প্রথম ফলন আসতে শুরু করে এবং এরপর আরও প্রায় তিন মাস ধরে নিয়মিত ফল সংগ্রহ করা যায়। সাধারণত ভাদ্র-আশ্বিন মাসে (আগস্ট-সেপ্টেম্বর) পানিফলের চারা বা লতা লাগানো হয় এবং মাঘ-ফাল্গুন মাস (জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি) পর্যন্ত এর ফলন পাওয়া যায়। কৃষকরা মনে করেন, কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকে যদি উন্নত জাতের চারা সরবরাহ, আধুনিক চাষাবাদ পদ্ধতি বিষয়ে প্রশিক্ষণ এবং রোগবালাই দমনে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা বৃদ্ধি করা হয়, তবে আরও অনেক কৃষক এই ফল চাষে আকৃষ্ট হবেন।
অনেক কৃষি উদ্যোক্তা এবং সচেতন মহল মনে করেন, পানিফল চাষ শেরপুরসহ দেশের অন্যান্য অঞ্চলের জলাবদ্ধ ও অনাবাদি জমিকে কৃষির আওতায় আনার এক বিরাট সুযোগ তৈরি করেছে। সঠিক পরিকল্পনা, সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা বৃদ্ধি এবং সহজ শর্তে কৃষিঋণের ব্যবস্থা করা গেলে এই পানিফল চাষের মাধ্যমে গ্রামীণ অর্থনীতিতে নতুন গতি সঞ্চার হতে পারে এবং বহু মানুষের জন্য নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হতে পারে।
যদিও শেরপুর জেলায় ঠিক কতটুকু জমিতে পানিফলের আবাদ হচ্ছে, তার সঠিক পরিসংখ্যান এখনো কৃষি বিভাগের কাছে নেই, তবে বিভিন্ন কৃষক ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছর জেলায় প্রায় শত একর জমিতে পানিফলের চাষ করা হয়েছে।এই বিষয়ে শেরপুর জেলা কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের উপপরিচালক কৃষিবিদ মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেন, পানিফল চাষ যে লাভজনক, তা কৃষকরা বুঝতে পেরেছেন এবং সে কারণেই এর আবাদ ক্রমান্বয়ে বাড়ছে। তবে জেলায় মোট কত একর জমিতে এই ফলের আবাদ হয়, সে সম্পর্কিত সুনির্দিষ্ট তথ্য এখনো কৃষি বিভাগের ডেটাবেজে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি।
তিনি স্বীকার করেন, স্বাদে, গন্ধে ও পুষ্টিগুণে ভরা জলজ উদ্ভিদের এই ফলটি মানুষের কাছে দিন দিন প্রিয় হয়ে উঠছে। তিনি জানান, কৃষি বিভাগের কাছে এখন পর্যন্ত এটি একটি অপ্রধান বা ‘মাইনর’ ফসল হিসেবে বিবেচিত হলেও, এর ক্রমবর্ধমান জনপ্রিয়তা ও অর্থনৈতিক গুরুত্ব বিবেচনা করে আগামী মৌসুম থেকে এর আবাদের পরিমাণ, উন্নত চাষাবাদ পদ্ধতি এবং সার্বিক বিষয়ে শেরপুর কৃষি বিভাগ নিবিড়ভাবে খোঁজখবর রাখবে এবং কৃষকদের প্রয়োজনীয় সহযোগিতা প্রদান করবে।




দিনাজপুর টিভির সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন